ওমর ফারুক চট্টগ্রাম ব্যুরো

এক দিকে দিন-দুপুরে ছিনতাই, অন্য দিকে প্রকাশ্যে খুন। কোথাও চাঁদা না দেয়ায় হত্যার হুমকি, কোথাও চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে হত্যাকাণ্ড। মাদকের বিস্তার, অপহরণ, ধর্ষণ, কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতার পাশাপাশি এবার পুলিশের ওপর হামলা করেও তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসীকে ছিনিয়ে নেয়ার ঘটনা ঘটেছে। গত কয়েক সপ্তাহের ঘটনাগুলোতে চট্টগ্রাম নগরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে খুলশীতে পুলিশের ওপর হামলা এবং চান্দগাঁওয়ে চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে হত্যাকাণ্ড, কোতোয়ালি থানার পেছনে দিন-দুপুরে ছিনতাই- তিনটি ঘটনা নগরবাসীর নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন আরো জোরালো করেছে।
সিএমপির জুলাই মাসের অপরাধ পরিসংখ্যানে নগরের ১৬ থানায় মোট ৪৮০টি মামলার কথা হয়। এর মধ্যে খুনের মামলা ৯টি, ছিনতাই চারটি, অপহরণ ছয়টি এবং ধর্ষণের মামলা ১৬টি। এ ছাড়া রাহাজানি বা দস্যুতার আটটি, চুরি ৪৪টি, নারী ও শিশু নির্যাতনের ৩৯টি এবং মাদক আইনে ১৫৬টি মামলা হয়েছিল।
২৯ আগস্ট নগরের চান্দগাঁওয়ে চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে যুবদল নেতা ফজলুল আমিন হত্যার অভিযোগ ওঠে। সড়কে ভ্যান বসানো ও সেখান থেকে চাঁদা আদায় নিয়ে বিরোধের জেরে তাকে মারধর করা হয়। পরে তার মৃত্যু হয়। এর মাত্র কয়েক দিন আগে, ২১ আগস্টের দিকে চান্দগাঁওয়ে মোহাম্মদ সাকিব (২২) নামে এক যুবককে প্রকাশ্যে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়। একই এলাকায় অল্প সময়ের ব্যবধানে প্রকাশ্য হত্যাকাণ্ড নগরীর অপরাধ পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
৪ সেপ্টেম্বর খুলশীর ওয়্যারলেস মোড় এলাকায় তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী ওয়াকিল হোসেন ওরফে বগাকে গ্রেফতার করতে গিয়ে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, বগাকে ধরতে অভিযান চালানোর সময় তার অনুসারীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে এবং হামলা চালায়। এতে খুলশী থানার ওসিসহ অন্তত ছয় পুলিশ সদস্য আহত হন। পুলিশের গাড়ি ভাঙচুর করা হয়। পরে বগা একটি গোপন সুড়ঙ্গপথ দিয়ে পালিয়ে যান। এ ঘটনায় পুলিশ ও বগার পরিবার পাল্টাপাল্টি মামসা করেছে। 
চট্টগ্রাম নগরে আরো একটি ঘটনা নগরবাসীর মনে ভীতি ছড়িয়েছে। ১৯ সেপ্টেম্বর কোতোয়ালি থানার পেছনে পাথরঘাটার সতীশ বাবু লেনে রিকশা থামিয়ে এক যাত্রীর কাছ থেকে ছুরি দেখিয়ে টাকা ও মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেয়া হয়। ঘটনাটি বাড়ির ওপর থেকে ভিডিও করা হয়। পরে ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়- ঘটনাস্থলটি কোতোয়ালি থানা থেকে প্রায় ১০০ গজ দূরে। পুলিশ পরে এ ঘটনায় মনির হোসেন ও সাদ্দাম হোসেন নামে দু’জনকে গ্রেফতার করে। 
সেপ্টেম্বরের আরেক ঘটনায় নগরের কদমতলী বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজের এক কর্মকর্তার কাছ থেকে সরকারি ল্যাপটপ, মোবাইল ফোন, মানিব্যাগ ও গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র ছিনিয়ে নেয়ার অভিযোগ ওঠে। ওই কর্মকর্তা ছিনতাইয়ের মামলা করতে কোতোয়ালি থানায় গেলেও পুলিশ মামলা না নিয়ে ‘হারানো’ হিসেবে সাধারণ ডায়েরি নেয়। এ ঘটনা প্রকাশ্য ছিনতাইয়ের পাশাপাশি ছিনতাইয়ের পর মামলা গ্রহণ নিয়েও প্রশ্ন সৃষ্টি করেছে।
নগরে নিউমার্কেট, রিয়াজউদ্দিন বাজার, কদমতলী, টাইগারপাস, সিআরবি, লাভ লেন, ডিসি হিল, আসকারদীঘির পাড়, রহমতগঞ্জ, অক্সিজেন, বহদ্দারহাট, মুরাদপুর, আগ্রাবাদ, দেওয়ানহাট ও বিভিন্ন বাসস্ট্যান্ড এলাকা ছিনতাইপ্রবণ এলাকায় পরিণত হয়েছে। এসব এলাকায় প্রতিদিন কেউ না কেউ ছিনতাইকারীর কবলে পড়ে সবকিছু হারাচ্ছে। ভুক্তভোগীদের অনেকে হয়রানি বা মামলা করে লাভ না হওয়ার আশঙ্কায় থানায় অভিযোগ করেন না। 
সেপ্টেম্বরে পাঁচলাইশে ব্যবসায়িক পাওনা টাকা নিয়ে বিরোধের জেরে ব্যবসায়ী হেলাল উদ্দিনকে অপহরণ করে ৫০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করার অভিযোগে আটজনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। চান্দগাঁওয়ে ২১ মাস বয়সী এক শিশুকে অপহরণের কয়েক ঘণ্টার মধ্যে উদ্ধার করা হয়। জুলাই,আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে বেশ কয়েকটি অপহরণের ঘটনা ঘটে নগরে। এ ছাড়া চট্টগ্রাম নগরে মাদককে কেন্দ্র করে ছিনতাই, কিশোর গ্যাং, অস্ত্রের ব্যবহার এবং সঙ্ঘবদ্ধ অপরাধ বেড়েছে।
সেপ্টেম্বরে চাঁদাবাজির অভিযোগও সামনে এসেছে। এক চিকিৎসকের কাছে প্রথমে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি এবং পরে ২০ লাখ টাকা চাওয়ার অভিযোগ ওঠে। চাঁদা না দিলে গুলি করে হত্যার হুমকি দেয়া হয় বলে অভিযোগ। পুলিশ এ ঘটনায় সাতজনকে গ্রেফতারের কথা জানিয়েছে। এ ছাড়া হালিশহরে সাংবাদিক ও পুলিশ পরিচয়ে একটি বাসায় ঢুকে চাঁদাবাজি ও শ্লীলতাহানির অভিযোগে মামলা হয়েছে।
১৬ সেপ্টেম্বর সিএমপির আগস্ট মাসের অপরাধ পর্যালোচনা সভায় কমিশনার হাসান মো: শওকত আলী নগরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সব থানা ও গোয়েন্দা বিভাগকে সর্বোচ্চ পেশাদারিত্বের সাথে দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দেন। মাদক, চুরি, ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে তৎপরতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়।
চট্টগ্রাম নগরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) মুহাম্মদ ফয়সাল আহম্মেদ বলেন, আগের সময়ের চেয়ে এখন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো রয়েছে। দুই-একটি ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। পুলিশ অল্প সময়ের মধ্যে অপরাধীদের গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়েছে।