নিজস্ব প্রতিবেদক 

রাজধানীর মিরপুরে (মিরপুর-১) বৃহস্পতিবার গভীর রাতে মুখোশধারীদের হামলায় বেসরকারি সংস্থা রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার নামে স্বাস্থ কেন্দ্র গুঁড়িয়ে দেয়া হয়েছে। সংস্থাটি ৫০ বছর ধরে দরিদ্র ও অসহায় মানুষকে বিনামূল্যে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, প্রসূতি সেবা, পরিবার পরিকল্পনা ও শিশুদের টিকাদান সেবা দিয়ে আসছে। 
সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ডা. নাসরিন আখতার অভিযোগ করেন, নিরাপত্তাকর্মীদের জিম্মি করে একটি পাকা ও তিনটি সেমিপাকা ভবন ভাঙচুর ও লুটপাটের পর একটি দোকানদার সমিতির সাইনবোর্ডও টাঙিয়ে দেয়া হয়েছে। এ ঘটনায় শাহ আলী থানায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। 
তিনি বলেন, প্রায় ২৫০ জনের মুখোশ পরা একটি দল ‘সম্মাননা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড’-এর ব্যানারে ক্লিনিকে হামলা চালায়। তারা কর্তব্যরত দু’জন নিরাপত্তাকর্মীকে জিম্মি করে ভেতরে ঢুকে ভাঙচুর ও লুটপাট করে। পরে ক্লিনিকের দখল নিয়ে স্থানীয় সাধারণ মানুষকে সেখানে প্রবেশে বাধা দেয়। 
ডা. নাসরিনের দাবি, হামলাকারীরা সরকারি ইপিআই টিকা, টিকা দেয়ার রেজিস্টার ও নথি, পরিবার পরিকল্পনার বিভিন্ন সরঞ্জাম ও পদ্ধতি, ওষুধ ও ভ্যাকসিন, নগদ প্রায় ১১ লাখ ৪০ হাজার টাকা এবং প্রায় ৪৫ লাখ টাকা মূল্যের একটি আলট্রাসনোগ্রাম মেশিন নিয়ে গেছে। 
এ ছাড়া একটি জেনারেটর, তিনটি ফ্রিজ, তিনটি এসি, সিসিটিভি ক্যামেরা, তিনটি স্টিলের আলমারি, পাঁচটি স্টিলের ফাইল কেবিনেট, ল্যাবরেটরির সরঞ্জাম ও রিএজেন্ট, দু’টি টিভি, দু’টি কম্পিউটার, দু’টি ল্যাপটপ, দু’টি প্রিন্টার এবং বিভিন্ন আসবাবপত্রও লুটের অভিযোগ রয়েছে। 
তিনি আরো অভিযোগ করেন, হামলাকারীরা ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে একটি পাকা ও তিনটি সেমিপাকা ভবনসহ কেন্দ্রটির স্থাপনায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি করে। পরে সেখানে ‘সম্মাননা দোকানদার সমিতি লিমিটেড’-এর একটি সাইনবোর্ড লাগিয়ে দেয়া হয়। 
ডা. নাসরিন বলেন, শুধু যন্ত্রপাতি ও মালামালের আর্থিক ক্ষতির পরিমাণই আনুমানিক দেড় কোটি টাকা। রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারটি সরকারের সাথে অংশীদারত্বের ভিত্তিতে প্রায় ৫০ বছর ধরে মিরপুর এলাকার দরিদ্র ও অসহায় মানুষকে বিনামূল্যে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, প্রসূতি সেবা, পরিবার পরিকল্পনা ও শিশুদের টিকাদান সেবা দিয়ে আসছে। 
তিনি বলেন, আগামীকাল (শনিবার) থেকে সরকারি হাম-রুবেলা ক্যাম্পেইন শুরু হওয়ার কথা ছিল। কেন্দ্রটি দখল ও ভাঙচুরের কারণে হাম-রুবেলা ক্যাম্পেইনসহ সব ধরনের স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে। 
ঘটনার পর কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে বলেও জানান প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক। তিনি বলেন, এটি শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের ওপর হামলা নয়, দেশের দরিদ্র, শিশু ও অসহায় মানুষের স্বাস্থ্যসেবার অধিকারের ওপরও আঘাত। 
ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত করে দ্রুত বিচার ও শাস্তির দাবি জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। একই সাথে ক্ষতিগ্রস্ত কেন্দ্রটির সম্পূর্ণ ক্ষতিপূরণ দিয়ে দ্রুত স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম চালুর দাবি জানানো হয়েছে। এ ঘটনায় শাহ আলী থানায় মামলা হয়েছে। 
শাহ আলী থানার ওসি জাহাঙ্গীর আলম বলেন, মামলায় হানিফ মিয়ার নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতপরিচয় ২০০ থেকে ২৫০ জনকে আসামি করা হয়েছে। তিনি বলেন, আসামিদের বিরুদ্ধে অনধিকার প্রবেশ, চুরি, হুমকি এবং দেড় কোটি টাকার বেশি ক্ষতির অভিযোগ আনা হয়েছে। বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
মিরপুরে টিকাদান কেন্দ্রে হামলা
জানা গেছে, স্থানীয় বিএনপির দু’টি পক্ষ দীর্ঘদিন ধরে জায়গাটি দখল করার চেষ্টা করে আসছিল। স্থানীয় দোকানি ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় বিএনপির দু’টি পক্ষ জায়গাটি দখলের চেষ্টা করছিল। জায়গাটি নিয়ে মামলাও হয়। ফলে এত দিন কেউ দখল করতে পারছিল না। ২০২৬ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর থেকে সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতির ব্যানারে আবার দখলের চেষ্টা হচ্ছিল। সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য বিএনপি নেতা ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি এই পক্ষের নেতৃত্বে রয়েছেন। সর্বশেষ বৃহস্পতিবার রাতে প্রতিষ্ঠানটি ভেঙে জায়গাটি দখল করে নিয়েছে তারা। 
তবে এ বিষয়ে ফেরদৌসী আহমেদ গণমাধ্যমকে বলেন, ভাঙচুরের ঘটনা তিনিও শুনেছেন। ব্যস্ততার কারণে যেতে পারেননি। সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতির সাথে তার নাম থাকলেও ভাঙচুরের সাথে তিনি জড়িত নন। যেহেতু ভাঙচুরের মামলা হয়েছে, আইনগতভাবেই পুলিশ ঘটনার তদন্ত করে দেখুক। 
জানা গেছে, রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার ১৯৭৪ সালে মিরপুরের সুবিধাবঞ্চিত ও নিম্ন আয়ের মানুষের মাতৃ ও শিশুসেবা দেয়ার উদ্দেশ্যে কার্যক্রম শুরু করে। তৎকালীন সুইডিশ সেভ দ্য চিলড্রেনের প্রতিষ্ঠান রাড্ডা বার্নেনের উদ্যোগে কেন্দ্রটির যাত্রা শুরু হয়। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি প্রজনন স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা সেবা, গর্ভকালীন ও প্রসবোত্তর সেবা, শিশুদের টিকাদান, শিশু স্বাস্থ্যসেবা এবং কমিউনিটি স্বাস্থ্য কার্যক্রম পরিচালনা করে। কেন্দ্রটির তিনটি স্থায়ী ক্লিনিকে রোগীদের প্রয়োজন অনুযায়ী প্যাথলজি, বায়োকেমিস্ট্রি, হেমাটোলজি-সহ বিভিন্ন পরীক্ষার সুবিধাও রয়েছে। মিরপুর ১০ এলাকায় প্রতিষ্ঠানটির প্রধান কেন্দ্র হলেও মিরপুর ১, বাউনিয়া বাঁধ, উত্তরা, ভাসানটেক বস্তি ও পুরান ঢাকায় প্রতিষ্ঠানটির সেবা কার্যক্রম বিস্তৃত রয়েছে।