শাহেদ মতিউর রহমান

* পদ না থাকলেও নিয়মবহির্ভূতভাবে পদায়নের অভিযোগ
* ফ্যাসিস্ট আমলে নিয়োগ পেয়ে এখনো বহাল সচিব মাসুদ করিম

নানা অনিয়ম আর সীমাহীন স্বেচ্ছাচারিতায় ডুবতে বসেছে একসময়ের সুনামের অধিকারী কারিগরি শিক্ষা বোর্ড। আর্থিক অনিয়ম এবং পদ না থাকলেও ডেপুটেশনে নিয়ে এসে নিজস্ব লোকজনকে পদায়নের কারণে ঘুরেই দাঁড়াতে পারছে না দেশের একমাত্র এই কারিগরি শিক্ষা বোর্ডটি। সাম্প্রতিক বছরগুলোর পরিসংখ্যানই বলছে কারিগরি বোর্ডের অধীনে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ক্রমেই কমতে শুরু করেছে শিক্ষার্থীর সংখ্যা। সারা দেশের কারিগরি শিক্ষার একমাত্র অভিভাবক এই বোর্ড এখন নিজেই অস্তিত্ব সঙ্কটে পড়েছে। বোর্ডের বর্তমান চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো: রুহুল আমিন এবং সচিব মো: আল মাসুদ করিম দু’জনে মিলে বোর্ডের সুনাম আর অতীত ঐতিহ্য যেন ম্লান করে দেয়ার প্রতিযোগিতায় নেমেছেন। 
সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে জানা যায়, সাম্প্রতিক সময়ে বোর্ডের ভেতরে বাইরে সর্বত্রই এখন চরম ক্ষোভ আর অসন্তোষ দানা বাঁধছে। গত আড়াই বছরের বেশি সময় ধরেই আওয়ামী ফ্যাসিস্ট আমলের বেশ কিছু কর্মকর্তার হম্বিতম্বিতে কোণঠাসা অন্য কর্মকর্তারা। বিশেষ করে মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন থাকার পরেও বোর্ডের সিনিয়র কর্মকর্তাদের ন্যায্য পদোন্নতি না দিয়ে বাইরে থেকে লোকজন নিয়ে আসছেন চেয়ারম্যান তার পছন্দমতো। অভিযোগ রয়েছে নিজের অপকর্ম আর দুর্র্নীতি প্রকাশ হওয়ার ভয়েই বোর্ডের সিনিয়র বেশ কিছু কর্মকর্তাকে কোণঠাসা করে রাখার কৌশল নিয়েছেন চেয়ারম্যান নিজেই। 
সূত্র জানায়, বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে সিস্টেম অ্যানালিস্ট পদ দুইটা থাকলেও নিয়মবহির্ভূতভাবে ডেপুটেশনে নিয়োগবিধি না মেনে অতিরিক্ত আরো একজনকে সিস্টেম অ্যানালিস্ট পদে বসিয়ে রেখে অতিরিক্ত বেতনভাতা প্রদান করছেন।  শুধু তাই নয় ওই পদে একজন মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারকে সিস্টেম এনালিস্ট পদে বসানো হয়েছে। আবার সরকারি টিএসসি থেকে নিয়োগবিধি অনুসারে বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে সরাসরি প্রেষণে আসার কোনো সুযোগ না থাকলেও তাকে নিয়মবহির্ভূতভাবে আনা হয়েছে। উপ পরিচালক প্রকাশনা পদে নিয়োগবিধি অমান্য করে/নিয়োগবিধি অনুসরণ না করে সরকারের টিএসসি থেকে আরো একজন উপ পরিচালককে মন্ত্রণালয় এবং অধিদফতরের কিছু অসাধু অফিসারের মাধ্যমে অর্ডার করে এনে বসিয়ে বসিয়ে  বেতন দিচ্ছেন। অন্য দিকে অনেক যোগ্য অফিসার থাকা সত্ত্বেও তাদেরকে প্রমোশন না দিয়ে বা তাদের যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও সেই পদে না বসিয়ে অর্থের বিনিময়ে মন্ত্রণালয়ের কিছু অসাধু অফিসারের মাধ্যমে ডেপুটেশনে অযোগ্য লোক এনে বোর্ডের অর্থ অপচয় করা হচ্ছে, যাতে চেয়ারম্যানের স্বেচ্ছাচারিতার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। বিষয়টি নিয়ে বোর্ডের অনেক কর্মকর্তার ভেতরে ক্ষোভ বিরাজ করছে। কিন্তু চেয়ারম্যানের স্বেচ্ছাচারিতার এবং তার প্রভাবের কারণে তারা মুখ খুলতে ভয় পাচ্ছেন। সুবিধাবাদী এই চেয়ারম্যান আওয়ামী লীগের আমলে নিজেকে আওয়ামী লীগ বলে সুবিধা নিয়েছেন এখন আবার বিএনপির নাম  ভাঙিয়ে নিজেকে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের এলাকার লোক বলে পরিচয় দিয়ে বাড়তি  সুবিধা নেয়ার কৌশল নিয়েছেন। 
সূত্র আরো জানায়, বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে উপ পরিচালক পদ চারটি থাকলেও নিয়মবহির্ভূতভাবে অর্থের বিনিময়ে আরো একজনকে ডেপুটেশনে এনে অহেতুক বসিয়ে বেতন দিচ্ছে যা বোর্ডের অর্থের অপচয় এবং চেয়ারম্যান এ বিষয়ে কোনো ভ্রƒক্ষেপই করছেন না। কারণ তাদেরকে অর্থের বিনিময়ে বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে প্রেষণে এনেছেন এবং গত ৮/৯/২০২৬ তারিখে  মো: শাহজাহান কবিরকে অর্ডার করিয়ে এনে  ১০/৯/২০২৬ তারিখে তাকে জয়েন করিয়েছেন এবং এই ব্যক্তিকে ও সরকারি টিএসসি থেকে  নিয়মবহির্ভূতভাবে বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে পদায়ন দিয়েছেন। অনুরূপভাবে বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে উপ পরিদর্শক পদ চারটি থাকলেও  আর্থিক সুবিধা নিয়ে মোহাম্মদ কামাল হোসেন নামে আরো একজনকে ডেপুটেশনে নিয়ে আসা হয়েছে।  
কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে নবগঠিত এনটিভি এনটিভিকিউএর সেল (সিভিটি)-এর কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ থাকা সত্ত্বেও পরিচালক আইটিসি পদে চেয়ারম্যানের একজন ঘনিষ্ঠভাজন লোককে এনে বসিয়ে বসিয়ে অহেতুক বেতনভাতা প্রদান করছেন যা বোর্ডের অর্থ অপচয় এবং নিয়মিত চেয়ারম্যানের স্বেচ্ছাচারিতা। গত এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা, কর্মচারী, আগত সেবাপ্রত্যাশী এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সাথে কথা  বলে জানা গেছে এসব অজানা তথ্য। বাড়তি কিছু সুবিধার বিনিময়ে সবকিছু জেনেও না জানার ভান করে থাকেন  বোর্ডের সচিব মো: আল মাসুদ করিম। অবশ্য সচিব নিজেও আওয়ামী ফ্যাসিস্ট আমল থেকেই কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে বহাল তবিয়তেই আছেন। আওয়ামী আমলের পরিচয় গোপন করে এখন নিজেকে জাতীয়তাবাদী হিসেবে জাহির করছেন সবার কাছে। 
সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে জানা গেছে,  মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন থাকা সত্ত্বেও বোর্ডের  বেশ কয়েকজন সিনিয়র কর্মকর্তাকে চতুর্থ গ্রেডে পদোন্নতি বা পদায়ন না দিয়ে চেয়ারম্যান নিজেই ওনার কাছের  পছন্দের লোকজন এনে বোর্ডে বিভিন্ন শাখা বন্ধ থাকা সত্ত্বেও কর্মকর্তা পদে বসিয়ে রেখে বেতন দিচ্ছেন।  সূত্র জানায়, সিভিটি সেল বন্ধ থাকা সত্ত্বেও একজন ডিরেক্টর এনে তাকে  বসিয়ে রেখেই মাসে মাসে মোটা  অঙ্কের বেতন দিচ্ছেন। অনুরূপভাবে বোর্ডের মূল্যায়ন কর্মকর্তা মাজেদা বেগম অসুস্থ,  হাঁটাচলা করতে পারেন না  তা সত্ত্বেও বিকল্প কাউকে দায়িত্ব না দিয়ে চেয়ারম্যানের নির্দেশে তাকে বাসায় রেখেই বেতনভাতা দিচ্ছেন। অপর দিকে পরিদর্শক বি এম আমিনুল ইসলাম উনিও আইনবহির্ভূত পরিদর্শন কাজ করছেন; কিন্তু উনি পরিদর্শন কমিটির সদস্য না হওয়ায়  নিয়মমতো  তিনি এসব পরিদর্শন করতে পারেন না।
সূত্র জানায়, গত মাসে বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো: রুহুল আমিন ও সচিব মো: আল মাসুদ করিমের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) লিখিত অভিযোগ দেয়া হয়েছে। গত ৩০ আগস্ট ২০২৬ তারিখের ওই অভিযোগপত্রে বোর্ডের প্রশাসন, পরিদর্শন, সভা-সেমিনার, নিয়োগ-বদলি, প্রকল্প এবং ক্রয় কার্যক্রমে নানা অনিয়মের কথা তুলে ধরা হয়েছে। তারা বিভিন্ন মিটিংকে সভা সেমিনার ওয়ার্কশপ বানিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন।    
কারিগরি বোর্ডের নানা অনিয়মের বিষয়ে গতকাল সোমবার কথা হয় বোর্ডের সচিব মো: আল মাসুদ করিমের সাথে। তিনি নয়া দিগন্তকে বলেন, আমার জানা মতে বোর্ডে কোনো অনিয়ম হচ্ছে না। সচিবের নিজের নিয়োগ আওয়ামী ফ্যাসিস্ট আমলে হওয়ার পরেও তিনি কিভাবে এখনো এই পদে রয়েছেন- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমার নিয়োগ আওয়ামী আমলে হলেও আমি  আওয়ামী লীগের কোনো বিশেষ সুবিধা বা আস্থাভাজন ছিলাম না। আমি যখন এই কারিগরি বোর্ডে আসি তখন কেউই এখানে পোস্টিং নিতে আগ্রহী ছিলেন না। ফলে বাধ্য হয়ে আমি এই বোর্ডের সচিবের দায়িত্ব্ নিয়েছি। এ ছাড়া বোর্ডের জন্য নিম্নমানের কাগজ কেনা এবং এই অনিয়মের বিষয়ে জানতে  চাইলে সচিব বলেন, বোর্ডের কেনাকাটা সবসময় নিয়ম মেনে ইজিপি অনুসারেই হয়। এ ছাড়া এ সংক্রান্ত একটি কমিটিও আছে। তারাই মূলত সবকিছু দেখভাল করেন। ওই কমিটির আপনিও একজন সদস্য কি না এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এই মুহূর্তে মনে নেই। ফাইল দেখে বলতে হবে। আনিত অভিযোগের বিষয়ে প্রকৌশলী মো: রুহুল আমিনের দফতরে গিয়ে তাকে পাওয়া  যায়নি। তার মুঠোফোনে একাধিকবার ফোন করলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।