নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশকদের তীব্র প্রতিবাদের মুখে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের একটি নির্ধারিত আলোচনা ও মতবিনিময় সভা স্থগিত করা হয়েছে। গতকাল বেলা ১১টায় জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র মিলনায়তনে বেসরকারি গ্রন্থাগারে অনুদান হিসেবে বই প্রদান ও সরবরাহের লক্ষ্যে প্রস্তুতকৃত ‘বই সংগ্রহ ও বিতরণ সফটওয়্যার’-এর পরিচিতি, পর্যালোচনা ও মতামত সংগ্রহের জন্য সভাটির আয়োজন করা হয়েছিল।
সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকার কথা ছিল প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা (প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদা) ডা. জাহেদ উর রহমানের। তবে প্রকাশকদের প্রবল আন্দোলনের মুখে শেষ পর্যন্ত অনুষ্ঠানটি স্থগিত করতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ।
কেন এই স্থগিতাদেশ ও প্রকাশকদের ক্ষোভ?
প্রকাশকদের অভিযোগ, জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের পরিচালক আফসানা বেগমের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড ও ভূমিকা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই তাদের মধ্যে অসন্তোষ বিরাজ করছে। মূলত তাকে ঘিরেই প্রকাশকদের প্রতিবাদের মুখে সভাটি পণ্ড হয়ে যায়।
সরকারি ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, আফসানা বেগম ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে প্রথমবার পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব নেন এবং ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে মেয়াদের আগেই অপসারিত হন। পরবর্তীতে মে মাসে তিনি পুনরায় ওই পদে আসীন হন। চলতি বছরের জানুয়ারিতে অপসারণের কারণ নিয়ে সে সময় নানা গুঞ্জন শোনা গেলেও, বই ক্রয়ের প্রচলিত ২০ শতাংশ ‘মন্ত্রী-সচিব কোটা’ বাতিলের উদ্যোগ এবং তৎকালীন সংস্কৃতি বিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর সাথে মতপার্থক্যের জেরেই তাকে সরানো হয়েছিল বলে সংবাদমাধ্যমে তার বক্তব্য প্রকাশিত হয়েছিল।
পরিচালকের বিরুদ্ধে প্রকাশকদের দীর্ঘ অভিযোগের তালিকা
সৃজনশীল প্রকাশকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, পরিচালকের বিরুদ্ধে তাদের প্রধান অসন্তোষের বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে : জুলাই আন্দোলনের প্রশ্নে নিষ্ক্রিয়তা : জুলাইয়ের গণ-আন্দোলনের বিরোধিতাকারী বা ‘আওয়ামী লীগপন্থী’ হিসেবে চিহ্নিত প্রকাশকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানানো হলেও গ্রন্থকেন্দ্র কর্তৃপক্ষ কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি, বরং তাদের বিভিন্ন জেলায় বইমেলায় সুযোগ দেয়া হচ্ছে। যেমন-
একপাক্ষিক সিদ্ধান্ত : প্রকাশকদের সাথে পর্যাপ্ত আলোচনা না করে মুষ্টিমেয় কিছু কর্মকর্তার ওপর নির্ভর করে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নেয়া এবং প্রতিষ্ঠানের কর্মকাণ্ডে প্রকাশকদের অংশগ্রহণ কমিয়ে দেয়া।
বই ক্রয় ও আর্থিক স্বচ্ছতার অভাব : গত অর্থবছরের বই ক্রয়ের পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ, কোন বই কত কপি কেনা হয়েছে তার যৌক্তিক ব্যাখ্যা এবং বই ক্রয় কমিটির সদস্যদের পরিচয় জনসমক্ষে আনার দাবি জানিয়েছেন প্রকাশকরা। এ ছাড়া পরিচালকের নিজের ও সংশ্লিষ্টদের বই ক্রয়ে কোনো অনিয়ম হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখার দাবিও উঠেছে।
অনলাইন গ্রুপ থেকে বহিষ্কার : জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের কার্যক্রম নিয়ে পরিচালিত প্রকাশকদের একটি অনলাইন গ্রুপে প্রশ্ন বা মতামত দেয়ায় কর্তৃপক্ষের নির্দেশনায় কয়েকজনকে বাদ দেয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় সহকারী পরিচালক এনামুল হক ও সুপ্তির ভূমিকা তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তারা।
প্রশিক্ষণ ও ‘বই’ পত্রিকা নিয়ে অসন্তোষ : প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে ‘ফ্যাসিবাদী ঘরানার’ লোকজনকে যুক্ত করা এবং জাতীয়তাবাদী ঘরানার লেখক-প্রকাশকদের উপেক্ষার অভিযোগ তুলেছেন প্রকাশকরা। বিশেষ করে, সম্প্রতি গ্রন্থকেন্দ্র থেকে প্রকাশিত ‘বই’ পত্রিকায় জাতীয়তাবাদী লেখকদের লেখা বাদ দিয়ে আওয়ামী ঘরানার লেখকের লেখা ছাপানোর তীব্র সমালোচনা করা হয়েছে।
বইমেলার অব্যবস্থাপনা : বিভাগীয় বইমেলায় অব্যবস্থাপনার কারণে প্রকাশকদের আর্থিক ক্ষতির শিকার হওয়া এবং বিগত একুশে বইমেলায় প্যাভিলিয়ন বরাদ্দ বাতিলের দাবিতে পরিচালকের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ ছিল বলে অভিযোগ প্রকাশকদের।
পরবর্তী কর্মসূচি ও আলটিমেটাম
বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রকাশকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আগামী তিন দিনের মধ্যে এসব অভিযোগের বিষয়ে দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা না নেয়া হলে তারা কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করবেন। পাশাপাশি সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে স্মারকলিপি প্রদান ও লিখিত অভিযোগ দাখিলের প্রস্তুতিও নিচ্ছেন তারা। জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের বই ক্রয় কমিটি, বই সরবরাহ, প্রশিক্ষণ ও প্রকাশনা খাতে স্বচ্ছতা ফেরাতে এবং অভিযোগের নিরপেক্ষ ও স্বাধীন তদন্তের দাবি জানিয়েছেন বিক্ষুব্ধ প্রকাশকেরা।





