নয়া দিগন্ত ডেস্ক

ভারত এক জটিল ভূরাজনৈতিক সঙ্কটের মুখোমুখি পড়েছে, যা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ‘হাসিনা ডিলেমা’ বা হাসিনা সঙ্কট হিসেবে পরিচিত। ঢাকাকে হাসিনাকে ফিরিয়ে দিলে নেপাল, ভুটান ও শ্রীলঙ্কার মতো মিত্রদের কাছে ভুল বার্তা যাবে যে রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলালেই ভারত তার ঘনিষ্ঠ অংশীদারদের পরিত্যাগ করে। হাসিনাকে ভারতে রাখলে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে ভারতবিরোধী মনোভাব স্থায়ী রূপ নিতে পারে। এর ফলে দুই দেশের মধ্যকার গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য ও ট্রানজিট পথগুলো ঝুঁকির মুখে পড়ছে।
এই অচলাবস্থার জেরে দুই দেশের সম্পর্কে শীতলতা ও কূটনৈতিক টানাপড়েন শুরু হয়েছে। সম্প্রতি ভারতের আমন্ত্রণে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ব্রিকস সম্মেলনে যোগ না দিয়ে জাতিসঙ্ঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দেন এবং সেখানে পাকিস্তানি নেতৃত্বের সাথে বৈঠক করেন। পাশাপাশি বেইজিংয়ের সাথে বড় বড় অবকাঠামোগত ঋণ নিয়ে আলোচনা জোরদার করেছে ঢাকা। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে যে, নয়াদিল্লির ওপর তাদের আগের অন্ধ নির্ভরতার দিন শেষ।
নয়াদিল্লি এতদিন ধরে এককভাবে একজন রাজনৈতিক নেতার ওপর নির্ভর করে ভুল করেছে। বাংলাদেশের বিরোধী দল, ছাত্রসমাজ ও সুশীলসমাজের সাথে গভীর প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে ভারত ব্যর্থ হয়েছিল। ফলে বর্তমান প্রশাসন ভারতের সাথে সাধারণ সীমান্ত ব্যবস্থাপনা বা বিদ্যুৎ সরবরাহ সংক্রান্ত বিষয়গুলোকেও সন্দেহের চোখে দেখছে।
তবে সম্পর্কের সম্পূর্ণ অবনতি এড়াতে উভয় দেশেই বাস্তবসম্মত সমঝোতার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্য বা ইউরোপের কোনো নিরাপদ দেশে শেখ হাসিনাকে পুনর্বাসনের জন্য কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালানো, যাতে ভারত সরাসরি প্রত্যর্পণের অসম্মান থেকে বেঁচে যায় এবং ঢাকাও রাজনৈতিক বিজয় দাবি করতে পারে। দুই দেশকেই আবেগপ্রবণ রাজনৈতিক অবস্থানের বাইরে এসে গঙ্গাপানি বণ্টন চুক্তির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোকে নিছক অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত প্রয়োজন হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। শেখ হাসিনার এই সঙ্কট বিশ্ব রাজনীতিকে একটি বড় শিক্ষা দেয়- কখনো কোনো একক রাজনৈতিক নেতাকে একটি পুরো দেশের সমতুল্য মনে করা উচিত নয়। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক হয়তো অতীতের মতো অতি-ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিগত জোটে আর ফিরবে না, তবে ভৌগোলিক বাস্তবতাকে স্বীকার করে উভয় দেশ যদি পারস্পরিক অন্তসারশূন্য রাজনৈতিক বক্তব্য এড়িয়ে চলে, তবে একটি সাময়িক কূটনৈতিক সঙ্কটকে দীর্ঘমেয়াদি আঞ্চলিক বিপর্যয়ে রূপ নেয়া থেকে রোধ করা সম্ভব।
নয়াদিল্লির এই কঠিন সিদ্ধান্তটি একটি বড় শক্তিকে ব্যক্তিগত কূটনীতি কিভাবে ফাঁদে ফেলতে পারে, তার একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ। ২০২৪ সালের আগস্টে যে গণ-অভ্যুত্থান বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করেছিল, তা কেবল একটি দেশের রাজনীতিকেই নতুন করে সাজিয়ে দেয়নি বরং এটি পূর্ব দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা কাঠামোকে পুরোপুরি ভেঙে দিয়েছে। বিগত ১৫ বছর ধরে, ভারতের নিকটবর্তী প্রতিবেশী দেশগুলোতে দেশটির পররাষ্ট্রনীতি একটি মাত্র অটল নীতির ওপর নির্ভরশীল ছিল : হাসিনাকে স্থিতিশীল রাখা, তাহলে ভারতের পূর্ব সীমান্ত সুরক্ষিত থাকবে।
আজ, সেই কৌশলই একটি বড় সঙ্কট সৃষ্টি করেছে। হাসিনা ভারতীয় মাটিতে নির্বাসনে জীবনযাপন করছেন, আর অন্য দিকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) নেতৃত্বাধীন নবনির্বাচিত সরকার ঢাকা শাসন করছে। ‘হাসিনা সঙ্কট’ এমন একটি সমস্যা যা কেবল কোনো পক্ষ বেছে নিয়ে সমাধান করা যায় না। বরং এটি একটি বড় উদাহরণ যে কিভাবে ব্যক্তিগত কূটনীতি একটি পরাশক্তিকে ফাঁদে ফেলতে পারে, যা এই আঞ্চলিক সঙ্কট মোকাবেলায় ভারতকে কঠিন যুক্তির ভারসাম্য রক্ষার এক কঠিন পরিস্থিতিতে ফেলে দিয়েছে।
ভারতের এই উভয় সঙ্কটের মূলে রয়েছে বিশ্ব রাষ্ট্র পরিচালনার একটি মৌলিক নীতি : বিশ্বাসযোগ্যতা। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে, হাসিনা ভারতের মূল জাতীয় নিরাপত্তার দাবিগুলো পূরণ করতে গিয়ে নিজের দেশের অভ্যন্তরীণ জনপ্রিয়তাকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছেন। তার সরকার বাংলাদেশে লুকিয়ে থাকা ভারতবিরোধী বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিয়েছে, তাদের নেতাদের গ্রেফতার করে নয়াদিল্লির হাতে তুলে দিয়েছে। তিনি গুরুত্বপূর্ণ ট্রানজিট রুটগুলো খুলে দিয়েছেন, যার ফলে ভারতীয় পণ্যবাহী জাহাজ ও ট্রাকগুলো বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে ভারতের স্থলবেষ্টিত উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে পৌঁছাতে পেরেছে।
হাসিনাকে ভারতের অভ্যন্তরে সুরক্ষিত রাখার জন্যও সমান চড়া মূল্য দিতে হচ্ছে। এটি বাংলাদেশের সুশীলসমাজের মধ্যে ভারতবিরোধী মনোভাবকে স্থায়ীভাবে উসকে দেয়। ভারত যত বেশি দিন তার ঢাল হিসেবে কাজ করবে, বিএনপি সরকারের পক্ষে নয়াদিল্লিকে বাংলাদেশের গণতন্ত্রের শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করা তত সহজ হবে। এই ক্ষোভ ভারতের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক সংযোগ ও ট্রানজিট করিডোরগুলোকে একটি প্রতিকূল জনতার দ্বারা বন্ধ হয়ে যাওয়ার তাৎক্ষণিক ঝুঁকিতে ফেলে দেয়। সম্পর্কের এই টানাপড়েন এখন আর শুধু নীরব, পর্দার আড়ালের ঘর্ষণে সীমাবদ্ধ নেই; এটি প্রকাশ্য কূটনৈতিক বয়কটে রূপ নিয়েছে। নয়াদিল্লিতে ভারতের আয়োজিত উচ্চপর্যায়ের ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন এড়িয়ে যাওয়ার তারেক রহমানের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তটি এই পরিবর্তনের একটি স্পষ্ট উদাহরণ হিসেবে কাজ করেছে।
শীর্ষ সম্মেলনের আমন্ত্রণটিকে- যা প্রধানমন্ত্রীকে সরাসরি, স্বতন্ত্র আমন্ত্রণ হিসেবে না পাঠিয়ে একটি আঞ্চলিক গোষ্ঠীর (বিমস্টেক) সভাপতি হিসেবে তারেক রহমানকে দেয়া হয়েছিল এটাকে ঢাকা ভারতের পক্ষ থেকে একটি ইচ্ছাকৃত কূটনৈতিক অপমান হিসেবে দেখেছে। ঢাকা দেখাচ্ছে যে, ভারতের প্রভাবকে ভারসাম্য দিতে এটি তার কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থানকে পুরোপুরি ব্যবহার করতে ইচ্ছুক। ইসলামাবাদ ও বেইজিংয়ের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে এটি দেখাতে চায় যে, বাংলাদেশ আর নয়াদিল্লির অনুমোদনের ওপর নির্ভরশীল নয়।
হাসিনা সঙ্কট বিশ্বজুড়ে পররাষ্ট্রনীতি পরিকল্পনাকারীদের জন্য একটি পদ্ধতিগত সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করে : কখনো একজন রাজনৈতিক নেতাকে একটি পুরো দেশের সাথে গুলিয়ে ফেলবেন না। পরপর দু’টি অত্যন্ত বিতর্কিত বাংলাদেশী নির্বাচনের সময় নয়াদিল্লি চোখ বন্ধ করে ছিল, তার শাসনের বিরুদ্ধে দেশে ক্রমবর্ধমান ক্ষোভের চেয়ে তাৎক্ষণিক সীমান্ত নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিয়েছিল। নিজের জাতীয় স্বার্থকে একজন ব্যক্তির সাথে এতটা ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করার ফলে, ভারত বাংলাদেশের বিরোধী দল, ছাত্র আন্দোলন ও বৃহত্তর নাগরিক সমাজের সাথে গভীর প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছে।
হাসিনার পতন হওয়ায়, এই নীতির জন্য এখন ভারতকে একটি বড় মূল্য দিতে হচ্ছে। ঢাকার নতুন নেতৃত্ব প্রায় প্রতিটি নিয়মিত, প্রযুক্তিগত দ্বিপক্ষীয় বিষয়কে- নিয়মিত সীমান্ত ব্যবস্থাপনা থেকে শুরু করে দৈনন্দিন বিদ্যুৎ গ্রিড ভাগাভাগি পর্যন্ত গভীর সন্দেহের চোখে দেখে। সুযোগ থাকা সত্ত্বেও ভারত বৃহত্তর রাজনৈতিক পরিমণ্ডলের সাথে যুক্ত না হওয়ায়, এখন তাকে একটি সন্দেহপ্রবণ প্রশাসনের সাথে শূন্য থেকে কূটনৈতিক পুঁজি গড়ে তুলতে হচ্ছে এবং একই সাথে প্রাক্তন নেত্রীকে আতিথ্য দেয়ার রাজনৈতিক দায়ও সামলাতে হচ্ছে।
ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যকার সম্পর্ক চিরকাল এই রক্ষণাত্মক অবস্থানে আটকে থাকতে পারে না। নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্য আমদানি, চিকিৎসা-ভ্রমণ ও বিদ্যুতের জন্য বাংলাদেশ ভারতের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। অন্য দিকে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর বিচ্ছিন্নতা বা নিরাপত্তা ঝুঁকি এড়াতে ঢাকার সাথে সহযোগিতামূলক সম্পর্ক বজায় রাখা ভারতের জন্যও জরুরি।
এখন এমন একটি তৃতীয় দেশ খুঁজে বের করতে হবে যারা শেখ হাসিনাকে স্থায়ী আশ্রয় দিতে ইচ্ছুক। দক্ষিণ এশিয়ার বাইরে- মধ্যপ্রাচ্য বা ইউরোপের কোনো অঞ্চলে- হাসিনাকে নিরাপদ কোনো দেশে স্থানান্তরের জন্য ভারতকে নীরবে কাজ করতে হবে। এই পদক্ষেপটি ঢাকাকে তার দেশের ভোটারদের কাছে একটি রাজনৈতিক বিজয় দাবি করার সুযোগ করে দেবে; একইসাথে সরাসরি প্রত্যর্পণের ফলে ভারতের যে ব্যাপক ভাবমর্যাদা সঙ্কটের আশঙ্কা ছিল তা-ও এড়ানো সম্ভব হবে।
দ্বিতীয়ত, ভারত ও বাংলাদেশকে ‘লেনদেন-ভিত্তিক প্রাতিষ্ঠানিকতার দিকে সরে এসে কারিগরি ও অপরিহার্য অর্থনৈতিক প্রয়োজনীয়তা হিসেবে বিবেচনা করতে সম্মত হতে হবে। ‘হাসিনা-সঙ্কট’ প্রমাণ করে যে আধুনিক ভূ-রাজনীতিতে গতকালের অটুট স্থিতিশীলতা সহজেই আগামী দিনের সবচেয়ে বড় কৌশলগত ফাঁদে পরিণত হতে পারে। নয়াদিল্লি ও ঢাকা যদি তাদের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বক্তব্যকে যৌথ ভৌগোলিক বাস্তবতা থেকে সফলভাবে আলাদা রাখতে পারে, তবে তারা কেবল একজন ক্ষমতাচ্যুত নেতার উপস্থিতির কারণে সৃষ্ট সাময়িক কূটনৈতিক সঙ্কটকে দীর্ঘমেয়াদি আঞ্চলিক বিপর্যয়ে রূপ নেয়া থেকে আটকাতে পারবে।