মনির হোসেন
শুধু বন্দী পালানো নয়, মানবিক কারণেও কারা বন্দীদের জন্য প্রিজন ভ্যানে টয়লেট স্থাপন করা জরুরি বলে মনে করছেন কারা বিশ্লেষকরা। বিশেষ করে নারী বন্দীদের এক কারাগার থেকে আরেক কারাগারে আনা নেয়া করার সময় তাদেরকে দীর্ঘক্ষণ প্রিজন ভ্যানে অবস্থান করতে হয়। এ কারণে টয়লেটের বিষয়টির ওপর তারা জোর দিচ্ছেন বেশি। এরপরও সরকার যত দিন পর্যন্ত কারাবন্দীদের জন্য প্রিজন ভ্যানে টয়লেট স্থাপন না করতে পারবে তত দিন পর্যন্ত কোনো বন্দীকেই যেন আনা নেয়ার সময় স্থানীয় থানা পুলিশকে অবহিত না করে প্রাকৃতিক ডাকে সাড়া দেয়া নেয়ার জন্য কারাগারে প্রিজন ভ্যান থেকে না নামানো হয়। দাগি আসামিদের মাথায় সব সময় পালানোসহ নানা পরিকল্পনাই থাকে।
সর্বশেষ গত ২৭ সেপ্টেম্বর রাতে আদালতে হাজিরা শেষে প্রিজন ভ্যানে কাশিমপুর কারাগার-১ এ নেয়ার পথে ওই ভ্যানে থাকা মোহাম্মদপুরের দাগি সন্ত্রাসী পিচ্চি রাজা ওরফে বাদশা পুলিশকে প্রাকৃতিক ডাকে সাড়া দেয়ার কথা বলেন। এক পর্যায়ে তাকে নামানো হলে বাদশা পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়েই লাপাত্তা হয়ে যায়। এ ঘটনার তিন দিন অতিবাহিত হওয়ার পরও পুলিশ তার টিকিট এখনো ছুতে পারেননি। পরে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে ডিউটিরত ৫ পুলিশ সদস্যকে গাফিলতির অভিযোগে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। শুরু হয় এ ঘটনার নেপথ্যে কি আছে উদঘাটনে তদন্ত।
গতকাল কারা অধিদফতরের সাবেক ডিআইজি প্রিজন ও কারা বিশ্লেষক মেজর (অব:) সামছুল হায়দার সিদ্দিকী নয়া দিগন্তকে এই প্রসঙ্গে বলেন, দীর্ঘদিন ধরেই আদালতে হাজিরার সময় আবার কারা কর্তৃপক্ষ এক কারাগার থেকে আরেক কারাগারে বন্দী স্থানান্তরের সময় নারী-পুরুষ বন্দীদের প্রিজন ভ্যানেই আনা নেয়া করানো হয়। অনেক সময় রাস্তায় যানজটের কারণে বেশি সময় লাগায় অনেক বন্দীর টয়লেটের সমস্যায় পড়েন। তিনি বলেন, বিশেষ করে কাশিমপুর মহিলা কারাগার থেকে নারী বন্দীদের যখন ঢাকার সিএমএম আদালতে আনা হয় তখন তাদেরকে রাস্তার জ্যামসহ নানা কারণে দীর্ঘক্ষণ প্রিজন ভ্যানেই অবস্থান করতে হয়। এতে তাদের প্রাকৃতিক ডাকের বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে পড়ে। উপায় না পেয়ে পুলিশ সদস্যরা আসামিদের প্রাকৃতিক ডাকে সাড়া দেয়ানোর জন্য প্রিজন ভ্যান থেকে মাঝে মধ্যে রাস্তার আশপাশের কোথাও বন্দীকে নামানোর প্রয়োজন মনে করেন। আর এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে কোন কোন সময় বন্দী পালানোর মতো অনাকাক্সিক্ষত ঘটনাও ঘটে যায়। সর্বশেষ মোহাম্মদপুরের সন্ত্রাসী বাদশা প্রিজন ভ্যান থেকে পালিয়ে যায়। এই প্রসঙ্গে কারা বিশ্লেষক মেজর সামছুল হায়দার সিদ্দিকী নয়া দিগন্তকে এই বিষয়ে পরামর্শ দিয়ে বলেন, আমি মনে করি কারাবন্দীদের (বিশেষ করে নারী) টয়লেটের সমস্যাটিকে অবশ্যই আমাদেরকে মানবিকভাবে দেখতে হবে। একজন বন্দী যখন কাশিমপুর কারাগার থেকে ঢাকায় আসেন তখন তার শুধু আসার সময় ৬ থেকে ৭ ঘণ্টা প্রিজন ভ্যানেই আটকে থাকতে হয়। এই সময়ে একজনের টয়লেট প্রয়োজন হওয়া স্বাভাবিক ঘটনা। তাই আমার পরামর্শ হচ্ছে প্রিজন ভ্যানের ভেতরেই টয়লেট স্থাপনের ব্যবস্থা করা জরুরি হয়ে পড়েছে। সরকার এটি করতে পারলে অবশ্যই শুধু বন্দীদের জন্য নয়, কারা কর্তৃপক্ষ ও পুলিশের সদস্যদের জন্যও অনেক ভালো এবং নিরাপদ হবে। বন্দীদের এক কারাগার থেকে আরেক কারাগারে টেনশন ছাড়াই তখন স্থানান্তর করা সহজ হবে। এক প্রশ্নের উত্তরে মেজর হায়দার বলেন, যতদিন পর্যন্ত প্রিজন ভ্যানে টয়লেট স্থাপনের ব্যবস্থা করা সম্ভব না হবে, ততদিন পর্যন্ত কোন বন্দীর যদি পথে টয়লেটের প্রয়োজন পড়বে তারপরও তাকে নামানো ঠিক হবে না। তবে ওই এলাকায় যে কয়টা থানা পড়বে সেই থানার ক্লিয়ারেন্স আগে নিতে হবে। থানার ক্লিয়ারেন্স পেলেই কেবল বন্দীকে সিকিউরিটি দিয়ে প্রিজন ভ্যান থেকে নামানোর ব্যবস্থা করানো হবে। সে ক্ষেত্রে অবশ্যই বন্দীকে ডান্ডাবেড়ি পরাতে হবে। ডান্ডাবেড়ি পরানো থাকলে মোহাম্মদপুরের ওই দাগী আসামি টয়লেটের কথা বলে কোনোভাবেই নামলেও অন্তত পালানোর সাহস দেখাতে পারত না।
উল্লেখ্য, ওই রাতে প্রিজন ভ্যানটি যখন গাজীপুর মহানগরীর কোনাবাড়ি থানাধীন নওজোড় হাইওয়ে এলাকা অতিক্রম করছিল তখন আসামি বাদশা হঠাৎ পুলিশ সদস্যকে আকুতি জানিয়ে বলেছেন, তার টয়লেটে যাওয়া খুবই জরুরি। পুলিশ বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে আসামিকে প্রাকৃতিক ডাকে সাড়া দেয়ার জন্য প্রিজন ভ্যান থেকে নামানোর ব্যবস্থা করেন। এরপরই ঘটে বিপত্তি।





