হামিদুল ইসলাম সরকার
- ৬৫১ কোটি টাকার প্রকল্প সমাপ্তে আরো ১৮ মাস
- চার বছরের প্রকল্প, ১০ বছরে কাজ ৬৮.৩৯ শতাংশ
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ভারতীয় ঋণে নেয়া হয়েছিল প্রকল্পটি। কিন্তু সেই ভারতীয় ঋণ এখন আর নেই প্রকল্পে। তবে ১০ বছর অতিক্রমের পরও হাসপাতাল নির্মাণ শেষ হয়নি। বাধ্যতামূলক হলেও সম্ভাব্যতা যাচাই ছাড়াই এত বড় প্রকল্প নেয়া হয়। একদশকে প্রকল্পের অগ্রগতি মাত্র ৬৮.৩৯ শতাংশ। ৪ বছরের পটুয়াখালী মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল স্থাপন প্রকল্পটি শেষ করতে এখন সাড়ে ১১ বছর লাগছে স্বাস্থ্য অধিদফতরের। মূল অনুমোদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুনে শেষ হওয়ার কথা থাকা প্রকল্পের মেয়াদ বাড়িয়ে ডিসেম্বর ২০২৭ পর্যন্ত করা হলো। ভারতের টাকা না থাকায় বাংলাদেশ সরকারকে নিজের টাকাতেই শেষ করতে হবে বাকি কাজ। প্রকল্প প্রস্তাবনার সংশোধিত দলিল গতকাল মঙ্গলবার একনেক থেকে অনুমোদন দেয়া হয়েছে।
স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের প্রকল্প দলিল থেকে জানা গেছে, প্রকল্পটির গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হয়েছে অর্থায়নে। মূল অনুমোদনে মোট ব্যয় ছিল প্রায় ৫৮৪ কোটি ৪৬ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারের অর্থায়ন ছিল প্রায় ৩১৬ কোটি ৩৮ লাখ টাকা এবং ভারতের লাইন অব ক্রেডিট বা এলওসি থেকে প্রায় ২৬৮ কোটি ৮ লাখ টাকা। প্রথম সংশোধিত প্রকল্পে সেই ভারতীয় ঋণের অংশ আর রাখা হয়নি। বর্তমান ৬৫১ কোটি ১ লাখ ৬০ হাজার টাকার পুরো অর্থই জিওবি বা সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন। অর্থাৎ বিদেশী ঋণের অংশ বাদ গেলেও প্রকল্পের মোট ব্যয় মূল অনুমোদিত ব্যয়ের তুলনায় প্রায় ৬৬ কোটি ৫৫ লাখ টাকা বেশি। তবে বর্তমান প্রস্তাবে নতুন করে ব্যয় বৃদ্ধির কথা বলা হয়নি। মূলত অসমাপ্ত কাজ শেষ করতেই সময় বাড়ানোর আবেদন করা হয়েছে।
১১ বছরেরও বেশি সময় ধরে প্রকল্প
প্রকল্প নথির তথ্য অনুযায়ী, পটুয়াখালী সদর উপজেলায় বাস্তবায়নাধীন এই প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছিল জুলাই ২০১৬ সালে। মূল মেয়াদ করা হয় ছিল জুন ২০২০ পর্যন্ত। পরে এক দফা সময় বাড়িয়ে করা হয় জুন ২০২১ সাল। প্রথম সংশোধনের মাধ্যমে জুন ২০২৪ সাল। এরপর আরো কয়েক দফা ব্যয় না বাড়িয়ে মেয়াদ বাড়ানো হয়। সর্বশেষ অনুমোদিত মেয়াদ ছিল জুন ২০২৬। এবার সেটিই আরো ১৮ মাস বাড়িয়ে ডিসেম্বর ২০২৭ করার অনুমোদন দেয়া হয়েছে।
পরিকল্পনা কমিশনের নথিতে বলা হয়েছে, প্রকল্পের আওতায় মেডিক্যাল কলেজের অ্যাকাডেমিক ভবন, হাসপাতাল ভবন, ছাত্রছাত্রীদের হোস্টেল, বিভিন্ন আবাসিক ভবন, প্রশাসনিক ভবনের সম্প্রসারণ, এক্স-রে ও প্যাথলজি ভবন, গেস্ট হাউজ, নিরাপত্তা পোস্ট, ড্রেনেজ, পানির ব্যবস্থা, গভীর নলকূপ, পানি সরবরাহ লাইন, পয়ঃশোধনাগার, কম্পাউন্ড ও নিরাপত্তা আলোর মতো বেশ কিছু কাজ শেষ হয়েছে।
তবে এখনো একাধিক কাজ বাকি। জিমনেসিয়াম ভবন, মসজিদ, অধ্যক্ষ ও পরিচালকের বাসভবন, পাম্প হাউজ, পাবলিক টয়লেট, টিচিং মর্গ, সাইকেল শেড, কালভার্ট, গোডাউন, লিংক করিডোর, মেডিক্যাল ওয়েস্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট, লিফট, সাবস্টেশন ভবন, মেডিক্যাল গ্যাস সিস্টেম ও বিতরণ লাইনের পূর্তকাজ পুরোপুরি শেষ হয়নি। পাশাপাশি মেডিক্যাল যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য সরঞ্জাম কেনার কাজও চলমান।
নথি অনুযায়ী, প্রকল্পের মোট ৪৬টি ক্রয় প্যাকেজের মধ্যে ৪৩টির কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে। স্থান নির্বাচন, ভূমি অধিগ্রহণে জটিলতা, সময়ক্ষেপণ এবং নিচুজমি ভরাটের মতো কারণে কিছু কাজ নির্ধারিত সময়ের পরে শুরু হয়েছে। বিশেষ করে জিমনেসিয়াম ভবনের কাজ শুরু হয়েছে দেরিতে।
৮১ শতাংশ কাজে, খরচ ৬৪ শতাংশ
বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে শারীরিক ও আর্থিক অগ্রগতির মধ্যেও ফারাক রয়েছে। আইএমইডির তথ্য উদ্ধৃত করে পরিকল্পনা কমিশনের নথিতে বলা হয়েছে, প্রকল্পের ক্রমপুঞ্জিত বাস্তব অগ্রগতি ৮১ দশমিক ৩৯ শতাংশ। বিপরীতে আর্থিক অগ্রগতি ৬৪ দশমিক ১৪ শতাংশ। অর্থাৎ অবকাঠামোগত কাজের বড় অংশ এগোলেও পুরো অর্থ ব্যয় হয়নি।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের এডিপিতেও প্রকল্পটির জন্য ২৩ কোটি ৬ লাখ টাকা বরাদ্দ রয়েছে। এই অর্থ মূলত অসমাপ্ত কাজ ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম কেনার কাজে ব্যবহার করার কথা।
শেষ হবে কবে?
পরিকল্পনা কমিশনের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, যেহেতু প্রকল্পটি সেবামূলক, তাই প্রচলিত অর্থে আয়-ব্যয়ের লাভজনকতা বিশ্লেষণ করা হয়নি। তবে বাকি পূর্তকাজ, যন্ত্রপাতি কেনা ও হাসপাতাল গণপূর্ত বিভাগের কাছ থেকে বুঝে নেয়ার জন্য ডিসেম্বর ২০২৭ পর্যন্ত সময় বাড়ানো প্রয়োজন বলে সুপারিশ করা হয়েছে। একই সাথে এটিই প্রকল্পের শেষ সময় বৃদ্ধি হবে এবং এর পরে আর মেয়াদ বাড়ানো যাবে না- এমন শর্তও রাখা হয়েছে।
ফলে প্রশ্নটা এখন অর্থের নয়, শেষ করার। ভারতীয় ঋণের অংশ বাদ পড়েছে, ব্যয় বৃদ্ধির প্রস্তাবও নেই- কিন্তু ২০১৬ সালে শুরু হওয়া একটি মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল প্রকল্প শেষ করতে সময় গড়াচ্ছে ২০২৭ সালের শেষ পর্যন্ত।





