সৈয়দ সামসুজ্জামান নীপু
সরকারি নিয়ন্ত্রণাধীন আশুগঞ্জ পাওয়ার স্টেশন কোম্পানি লিমিটেডের (এপিএসসিএল) মালিকানাধীন ২২৫ মেগাওয়াট কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিদ্যুতের দাম বা ট্যারিফ পুনর্নির্ধারণ করা হচ্ছে। বিদ্যুৎ বিভাগের পর্যালোচনার পর যৌথ ও সরকারি মালিকানাধীন কেন্দ্রগুলোর ক্ষেত্রে রিটার্ন অন ইকুইটি (আরওই) কমানোর সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে এই পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। এর ফলে প্রতি বছর সরকারের প্রায় ৩০ কোটি ৯ লাখ টাকা সাশ্রয় হবে। চুক্তির অবশিষ্ট প্রায় সাড়ে ১৪ বছরের মেয়াদে মোট সাশ্রয়ের পরিমাণ দাঁড়াবে ৪৩১ কোটি ৭৯ লাখ টাকায়। পুনর্নির্ধারিত এই ট্যারিফ গত ২০২৫ সালের ১ আগস্ট থেকে কার্যকর ধরা হবে। বিদ্যুৎ ও জ¦ালানি মন্ত্রণালয় সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
সংক্রান্ত একটি বিস্তারিত সারসংক্ষেপ সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির অনুমোদনের জন্য মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠানো হয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, ট্যারিফ সংশোধন ও নতুন হিসাব সূত্র জানায়, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বাবিউবো) ও এপিএসসিএলের মধ্যে ২০১২ সালের ১৮ নভেম্বর ২৫ বছর মেয়াদি বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি (পিপিএ) স্বাক্ষরিত হয়েছিল। বিদ্যুৎকেন্দ্রটি ২০১৫ সালের ১০ ডিসেম্বর বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন (সিওডি) শুরু করে।
বিদ্যুৎ বিভাগের গঠিত কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে এপিএসসিএলের শেয়ারহোল্ডারদের ইক্যুইটির ওপর মুনাফার হার বা রিটার্ন অন ইক্যুইটি (আরওই) ১২ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৬ শতাংশ করা হয়েছে। এর ওপর ভিত্তি করেই বিদ্যুতের প্রতি ইউনিটের দাম (লেভেলাইজড ট্যারিফ) সংশোধন করা হয়।
বিদ্যমান পিপিএ অনুযায়ী প্রতি কিলোওয়াট-ঘণ্টা বা ইউনিটের গড় লেভেলাইজড ট্যারিফ চার্জ ছিল ৪.৭৩৪৯ ইউএস সেন্ট বা সমতুল্য ৫.৮১৪৪ টাকা। নতুন সংশোধিত কাঠামো অনুযায়ী তা কমে দাঁড়িয়েছে ৪.৬৯৭১ ইউএস সেন্ট বা সমতুল্য ৫.৭৬৮০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থাৎ প্রতি ইউনিটে বিদ্যুতের দাম কমছে ০.০৪৬৪ টাকা।
ট্যারিফের এই নতুন হার হিসাব করার ক্ষেত্রে প্রতি এক হাজার ঘনফুট গ্যাসের ভিত্তি মূল্য ৪৩৮.৯১ টাকা এবং প্রতি ইউএস ডলারের বিনিময় হার ১২২.৮০ টাকা ধরে হিসাব করা হয়েছে। এ ছাড়া প্ল্যান্ট লোড ফ্যাক্টর বা উৎপাদন সক্ষমতা ধরা হয়েছে ৮৪.৬ শতাংশ। তবে মাসিক ইনভয়েসের অর্থ পরিশোধের ক্ষেত্রে সোনালী ব্যাংকের তৎকালীন প্রকৃত ডলার বিনিময় হার এবং জ্বালানির প্রকৃত দর বিবেচিত হবে।
বাবিউবোরের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, নতুন ট্যারিফ কার্যকর হলে প্রতি বছর বিদ্যুৎ কেনা বাবদ ব্যয় হবে আনুমানিক ৯৫৩ কোটি ২৫ লাখ টাকা। চুক্তি অনুযায়ী কেন্দ্রটির অবশিষ্ট মেয়াদ রয়েছে ১৪ বছর চার মাস ৯ দিন। এই মেয়াদে মোট বিদ্যুৎ ক্রয় ব্যয় ধরা হয়েছে ১৩ হাজার ৬৭৯ কোটি টাকা। প্রতি ইউনিটিতে ট্যারিফ কমার কারণে চুক্তি মেয়াদের অবশিষ্ট সময়ে সরকারি তহবিলের সাশ্রয় হবে বিপুল পরিমাণ অর্থ, যা সার্বিক বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক চাপ কমাতে কিছুটা সহায়ক হবে।
তিনি জানান, এর পাশাপাশি এপিএসসিএল একটি সরকারি প্রতিষ্ঠান হওয়ায় উৎপাদিত বিদ্যুৎ বিক্রয় থেকে প্রাপ্ত মুনাফার বড় অংশই শেষ পর্যন্ত সরকারি কোষাগারে জমা হবে। বর্তমানে কোম্পানিটির ৯১.০১ শতাংশ শেয়ারের মালিকানা বাবিউবোর এবং ৮.৯৮ শতাংশের মালিকানা বিদ্যুৎ বিভাগের অধীনে রয়েছে।
জানা গেছে, দুই হাজার ১১৬ কোটি ৫২ লাখ টাকা ব্যয়ে আশুগঞ্জে ২২৫ মেগাওয়াটের এই কম্বাইন্ড সাইকেল প্ল্যান্টটি গড়ে তোলা হয়। মোট ব্যয়ের মধ্যে এক হাজার ৫৪৩ কোটি ৫৫ লাখ টাকা এসেছে ইসিএ (এক্সপোর্ট ক্রেডিট এজেন্সিজ) ঋণ হিসেবে এবং এপিএসসিএল নিজস্ব তহবিল থেকে ৫৭২ কোটি ৯৭ লাখ টাকা অর্থায়ন করা হয়।
ইসিএ ঋণের আওতায় স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের (এসসিবি) মাধ্যমে ১৩ বছর মেয়াদে ২০১.৮০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ঋণ গ্রহণ করা হয়েছিল। ওই ঋণের সুদের হার ছিল ৬ মাসের লাইবর (লন্ডন ইন্টার ব্যাংকিং লেন্ডিং রেইট) যোগ ৩.৬৯ শতাংশ, যার অনুকূলে অর্থ বিভাগ থেকে সার্বভৌম গ্যারান্টি প্রদান করা হয়েছিল।
সূত্র জানায়, পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা অনুযায়ী ১০০ কোটি টাকার বেশি অর্থমূল্যের যেকোনো সরকারি ক্রয় প্রস্তাবের জন্য ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির অনুমোদনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তবে সরকারি এই কেন্দ্রটির পিপিএ গ্রহণের ক্ষেত্রে পূর্বে কিছু প্রশাসনিক ত্রুটি ছিল। ২০১২ সালে মূল পিপিএ স্বাক্ষরের সময় বিদ্যুৎ বিভাগের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন নেয়া হয়নি, যদিও পরবর্তীতে পিপিএ-এর ১ম সংশোধনীর ক্ষেত্রে নিয়ম মেনে বিদ্যুৎ বিভাগের অনুমোদন নেয়া হয়েছিল। এ জন্য আগামী ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে এই প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য উত্থাপন করা হচ্ছে।





