নয়া দিগন্ত ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের সামরিক বাহিনীর অপরাধ বন্ধের আহ্বান জানিয়ে সরাসরি আমেরিকান জনগণের উদ্দেশে একটি বহু পৃষ্ঠার খোলা চিঠি পাঠ করেছে ইরানের ইসলামী বিপ্লবী গার্ড কোর (আইআরজিসি)। এক সংবাদ সম্মেলনে আইআরজিসির ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হোসেইন মোহেব্বি বলেন, মার্কিন সাধারণ নাগরিকরা তাদের বাহিনীর অন্যায্য কর্মকাণ্ড, যেমন- স্কুল, হাসপাতাল ও উপাসনালয়ে হামলার বিষয়ে অন্ধকারেই রয়ে গেছেন। আলজাজিরা, আনাদোলু এজেন্সি ও রয়টার্স।
তিনি উল্লেখ করেন, এসব কর্মকাণ্ড বিশ্বের দরবারে যুক্তরাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ করছে। আইআরজিসি জানায়, তাদের কোনো পরমাণু অস্ত্র তৈরির উদ্দেশ্য নেই এবং পশ্চিমাদের শোষণ ঠেকানোর কারণেই ওয়াশিংটন তাদের ‘সন্ত্রাসী সংগঠন’ আখ্যা দিয়েছে। মোহেব্বি মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি পরিবর্তনের প্রশ্ন তুলে বলেন, ওয়াশিংটন সামরিক খাতে বিপুল অর্থ অপচয় না করে তার ১০ শতাংশ বিশ্বজুড়ে দারিদ্র্যবিমোচনে ব্যয় করলে তারা একটি জনপ্রিয় দেশে পরিণত হতে পারত। সংবাদ সম্মেলনে তিনি আরো জানান, দুই দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে সংলাপের পথ উন্মুক্ত হওয়া উচিত। তিনি উল্লেখ করেন, বিশ্বজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের ৮০০ সামরিক ঘাঁটির কোনো যৌক্তিকতা নেই, এবং নিজ দেশের তিন কোটি ৯০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করলেও মার্কিন শাসকরা তাদের তোয়াক্কা করেন না। আইআরজিসি আরো দাবি করে, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অভিযানের মূল লক্ষ্য দেশটির সম্পদ লুটপাট ও ভৌগোলিক খণ্ড, পরমাণু কর্মসূচি রোখা নয়। একই সংবাদ সম্মেলনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ‘বড় মিথ্যুক’ আখ্যা দিয়ে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র এই সামরিক অভিযানে ব্যর্থ হয়েছে এবং তাদের মধ্যপ্রাচ্য ত্যাগ করা উচিত।
পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির অভিযোগ অস্বীকার
মার্কিন জনগণের উদ্দেশে দেয়া বক্তব্যে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়েও কথা বলেছেন আইআরজিসির মুখপাত্র। মোহেব্বি বলেন, ইরান কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করেনি এবং ভবিষ্যতেও সে পথে যাওয়ার কোনো অঙ্গীকার নেই। তিনি বলেন, ‘ইরান কখনো পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের চেষ্টা করেনি এবং এ বিষয়ে আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’ তবে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে দীর্ঘ দিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে তীব্র বিরোধ রয়েছে। ওয়াশিংটন ও তার মিত্ররা ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে। তেহরান অবশ্য বরাবরই বলে আসছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে পরিচালিত।
মোহেব্বি মার্কিন নাগরিকদের প্রতি তাদের সরকারের কাছে আইআরজিসিকে ‘সন্ত্রাসী সংগঠন’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করার কারণ জানতে চাওয়ার আহ্বান জানান। তার দাবি, ইরান ও এ অঞ্চলে ‘লুটপাট’ ঠেকানোর কারণেই আইআরজিসিকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তিনি মার্কিন সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগও তোলেন। তার দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী স্কুল, হাসপাতাল, বিশ্ববিদ্যালয়, মসজিদ ও গির্জায় বোমা হামলার মতো কর্মকাণ্ডে জড়িত হয়েছে, অথচ এসব বিষয়ে অনেক মার্কিন নাগরিক অবগত নন। তবে এসব অভিযোগের ক্ষেত্রে আইআরজিসির বক্তব্য ও দাবিকে আলাদাভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। মার্কিন সরকার এসব অভিযোগের বিষয়ে কী অবস্থান নেয়, তা এই বক্তব্যে উল্লেখ করা হয়নি।
বিশ্বজুড়ে ৮০০ মার্কিন ঘাঁটির প্রয়োজন নেই
মার্কিন সামরিক উপস্থিতি নিয়েও প্রশ্ন তোলেন আইআরজিসির মুখপাত্র। তিনি বলেন, বিশ্বজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৮০০ সামরিক ঘাঁটি থাকার কোনো প্রয়োজন নেই। মোহেবির দাবি, ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর বার্ষিক বাজেট যুক্তরাষ্ট্রের সশস্ত্র বাহিনীর বাজেটের মাত্র ১ শতাংশ। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কথাও তুলে ধরেন। তার দাবি, মার্কিন শাসকেরা নিজেদের জনগণের কথা যথেষ্ট বিবেচনা করেন না এবং দেশটির প্রায় তিন কোটি ৯০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছেন। মোহেব্বি প্রশ্ন তোলেন, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি পরিবর্তনের সময় এসেছে কি না। তার যুক্তি, মার্কিন সরকার সামরিক হামলায় যে অর্থ ব্যয় করে তার মাত্র ১০ শতাংশ যদি বিশ্বের দরিদ্র দেশগুলোর সহায়তায় ব্যয় করত, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিকভাবে আরো জনপ্রিয় দেশ হয়ে উঠত।
ইরানকে ছাড় দেয়ার খবর ট্রাম্পের অস্বীকার
এ দিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে এবং দেশটির জব্দ অর্থ ছাড় করতে রাজি আছেন। বিনিময়ে তেহরানকে পরমাণু ইস্যুতে ‘বাস্তব ও দৃশ্যমান অগ্রগতি’ দেখাতে হবে। সোমবার মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনকে এক মার্কিন কর্মকর্তা এ কথা জানিয়েছেন। তবে, এই খবর প্রকাশের পর ট্রাম্প নিজেই জানিয়েছেন- এই খবর ‘অসত্য।’
বর্তমানে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে আবার আলোচনার টেবিলে ফেরানোর চেষ্টা চলছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, যুক্তরাষ্ট্র মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে ইরানের সাথে ‘ইতিবাচক ও গঠনমূলক আলোচনা’ চালাচ্ছে। তবে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, পরমাণু ইস্যুগুলোর সমাধান না হলে কোনো চুক্তি হবে না। শনিবার ট্রাম্প ইরানের সর্বশেষ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। ওই প্রস্তাবে হরমুজ প্রণালী আবার খুলে দেয়ার কথা বলা হয়েছিল। ট্রাম্প সেটিকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে মন্তব্য করেন।
এর আগে, গত রোববার ট্রাম্প আরেক মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসকে বলেন, চলতি সপ্তাহেই ইরানের সাথে আরো আলোচনা হতে পারে বলে তিনি আশা করছেন। ওই মার্কিন কর্মকর্তা জানান, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আলোচনায় নেতৃত্ব দিচ্ছেন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ, জ্যারেড কুশনার, ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। তবে সোমবার ট্রাম্প এমন ধারণাও অস্বীকার করেন যে তিনি ইরানকে কোনো ছাড় দেয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন। নিজের ট্রুথ সোশ্যাল অ্যাকাউন্টে তিনি লিখেছেন, ‘আমি তাদের দেয়ার জন্য কিছুই প্রস্তাব করিনি!’ গত রোববার ট্রাম্প বলেন, ‘তারা একটি চুক্তি করতে চায়; কিন্তু আমি যে ধরনের চুক্তি করতে চাই, সেটি নয়। এটা এমন একটি চুক্তি, যেটিতে হয়তো আমরা এক বছর আগে রাজি হয়ে যেতাম। তারা নিজেদের অবস্থান নিয়ে বেশি বাড়াবাড়ি করেছে।’ ওই মার্কিন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, ইরান জানিয়েছে যে- তারা পরমাণু ইস্যুতে কিছুটা নমনীয় অবস্থান নিতে প্রস্তুত। তবে কোন পক্ষ কখন কী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করবে, সেই সময়সূচি নিয়ে এখনো দুই পক্ষের মধ্যে কোনো সমঝোতা হয়নি। গত রোববার সিএনএনের জেক ট্যাপারকে দেয়া সাক্ষাৎকারে জাতিসঙ্ঘে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক ওয়াল্টজ বলেন, ট্রাম্প ওই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন, কারণ তিনি মনে করেন ইরান আন্তরিকভাবে আলোচনা করছে না। ওয়াল্টজের যুক্তি ছিল, তেহরান ‘আগেই সবকিছু চাইছে’, যা গ্রহণযোগ্য নয়। ওয়াল্টজ সিএনএনের ‘স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন’ অনুষ্ঠানে বলেন, ‘মূল কথা হলো, তারা সবকিছু আগে চাইছিল এবং তারপর আলোচনা করবে বলে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছিল।’
পরে এনবিসির ‘মিট দ্য প্রেস’ অনুষ্ঠানে ওয়াল্টজ বলেন, ইরানের প্রস্তাবের বিষয়ে ট্রাম্পের খুব বেশি আস্থা না থাকার বিষয়টি ‘সাধারণ বুদ্ধির ব্যাপার।’ তিনি তেহরানের সর্বশেষ প্রস্তাবকে এমন একটি উদ্যোগ হিসেবে বর্ণনা করেন, যা ইরান জানতই যে যুক্তরাষ্ট্র গ্রহণ করবে না। তার ভাষায়, এটি ছিল ‘একটি বেশ কৌশলী ও সন্দেহজনক চেষ্টা।’
ওই মার্কিন কর্মকর্তাও ওয়াল্টজের বক্তব্যের সাথে একমত হয়ে বলেন, ইরানের প্রতিশ্রুতিগুলো নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র সন্দিহান। এর কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন, গত জুলাইয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যে সমঝোতা স্মারক হয়েছিল, ইরান সেটি লঙ্ঘন করেছে। ওই সমঝোতার পর ইরান বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালিয়েছিল বলে তিনি দাবি করেন।
তবে সোমবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এমন একটি প্রতিবেদন অস্বীকার করেন, যেখানে বলা হয়েছিল যে ইরান পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে কিছু ছাড় দিলে যুক্তরাষ্ট্র দেশটির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া এবং ইরানের জব্দ থাকা অর্থ ছাড় করে দিতে প্রস্তুত। অ্যাক্সিওসের ওয়েবসাইটে ইংরেজিতে এবং ইসরাইলের চ্যানেল ১২-তে হিব্রু ভাষায় ওই খবর প্রকাশিত হয়। এরপর ট্রাম্প নিজের ট্রুথ সোশ্যাল অ্যাকাউন্টে সেটিকে ‘অসত্য’ বলে দাবি করেন। অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ‘ইরান তার পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে বাস্তব পদক্ষেপ নিলে ট্রাম্প দেশটির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং ইরানের জব্দ থাকা অর্থ ছাড় করে দিতে রাজি আছেন।’ প্রতিবেদনে নাম প্রকাশ না করা কয়েকজন মার্কিন কর্মকর্তার বক্তব্য উদ্ধৃত করা হয়।
৮০ বছর বয়সী রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট ওই খবরকে ‘প্রতারণামূলক মিথ্যা খবর’ বলে অভিহিত করেন এবং অ্যাক্সিওসকে প্রতিবেদনটি প্রত্যাহার করে নেয়ার আহ্বান জানান। ট্রাম্প লিখেছেন, ‘আমি তাদের দেয়ার জন্য কিছুই প্রস্তাব করিনি!’





