সংসদ প্রতিবেদক
- আশুগঞ্জে ১৯ মাস ধরে বন্ধ
- আমদানিনির্ভরতা কমাতে উৎপাদন বাড়ানোর সুপারিশ
গ্যাসসঙ্কটে দেশের সার উৎপাদন কার্যত বড় ধাক্কা খাচ্ছে। গত দুই বছরে গ্যাসের অভাবে যমুনা ফার্টিলাইজার কারখানায় সার উৎপাদন হয়েছে মাত্র তিন দিন। আর আশুগঞ্জ সার কারখানায় টানা ১৯ মাস ধরে উৎপাদন বন্ধ। কৃষির গুরুত্বপূর্ণ এই উপকরণের দুই বড় উৎপাদনকেন্দ্রে দীর্ঘদিন উৎপাদন বন্ধ থাকায় দেশে সার উৎপাদনের সক্ষমতা কাজে লাগানো যাচ্ছে না। এতে আমদানিনির্ভরতা ও উৎপাদন ব্যয় বাড়ার চাপ তৈরি হয়েছে। এ অবস্থায় বন্ধ কারখানা আবার চালু, পুরনো কারখানা আধুনিকায়ন এবং দেশে সার উৎপাদন বাড়িয়ে আমদানিনির্ভরতা কমানোর সুপারিশ করেছে জাতীয় সংসদের সরকারি প্রতিষ্ঠান কমিটি।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সরকারি প্রতিষ্ঠান কমিটির দ্বিতীয় বৈঠকে সার উৎপাদন, মজুদ ও বিতরণ পরিস্থিতি পর্যালোচনায় এসব তথ্য উঠে আসে।
গতকাল বুধবার জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত বৈঠকে কমিটির সভাপতি ও জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি সভাপতিত্ব করেন। বৈঠকে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি) ও এর আওতাধীন কোম্পানিগুলোর কার্যক্রম এবং বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) কার্যক্রম নিয়ে আলোচনা ও পর্যালোচনা করা হয়। বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয় রাসায়নিক সারের উৎপাদন, মজুদ ও বিতরণ ব্যবস্থাপনার ওপর। বৈঠকে শিল্প মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়, গ্যাসসঙ্কটের কারণে গত দুই বছরে যমুনা ফার্টিলাইজার কারখানায় মাত্র তিন দিন সার উৎপাদন হয়েছে। অপরদিকে আশুগঞ্জ সার কারখানায় গত ১৯ মাস ধরে উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। দেশের অভ্যন্তরীণ সার উৎপাদনের গুরুত্বপূর্ণ দু’টি কারখানায় দীর্ঘ সময় ধরে উৎপাদন বন্ধ থাকায় পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়।
এ অবস্থায় সারসঙ্কট মোকাবেলা ও ব্যয় কমাতে আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে দেশে সার উৎপাদন বাড়ানোর জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের সুপারিশ করেছে কমিটি। একই সাথে দেশে বিদ্যমান সার উৎপাদন সক্ষমতা কিভাবে সর্বোচ্চ কাজে লাগানো যায়, সে বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ নেয়ার ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়। বৈঠকে পে-অফকৃত সার কারখানাগুলোর বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা জানতে চাওয়া হয়। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা সার কারখানাগুলো আবার চালুর বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনাও জানতে চায় কমিটি। একই সাথে পুরনো সার কারখানাগুলো আধুনিকায়নের মাধ্যমে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হয়।
সার উৎপাদনের পাশাপাশি বীজের উৎপাদন ও সরবরাহ নিয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়। বীজ উৎপাদনে দেশকে স্বয়ংসম্পূর্ণ করতে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুসরণ করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের সুপারিশ করা হয়েছে। কৃষকের চাহিদা অনুযায়ী মানসম্মত বীজের সরবরাহ নিশ্চিত করতে বিএডিসির সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়টিও গুরুত্ব পায়।
সার বিতরণব্যবস্থায় কৃত্রিম সঙ্কট সৃষ্টিকারী ডিলারদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
এ ধরনের ডিলারদের লাইসেন্স বাতিলের ক্ষেত্রে কী কী ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায়, তা পর্যালোচনার জন্য বলা হয়েছে। কমিটি মনে করে, ডিলার পর্যায়ে অনিয়ম বা কৃত্রিম সঙ্কটের সুযোগ থাকলে সার সরবরাহের পুরো ব্যবস্থাপনা ব্যাহত হতে পারে।
সার সরবরাহ ব্যবস্থার সাপ্লাই চেইন স্বচ্ছ ও কার্যকর রাখতে ডিজিটাল রিয়েল-টাইম মনিটরিং ব্যবস্থা চালুর জন্য প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা গ্রহণের সুপারিশও করেছে কমিটি। উৎপাদন ও আমদানি থেকে শুরু করে মজুদ এবং ডিলার পর্যায়ে বিতরণ পর্যন্ত পুরো ব্যবস্থাকে ডিজিটাল নজরদারির আওতায় আনা গেলে সরবরাহ পরিস্থিতি তাৎক্ষণিকভাবে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে বলে বৈঠকে গুরুত্ব দেয়া হয়।
এদিকে, দেশের খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধির বিষয়টিও বৈঠকে গুরুত্ব পেয়েছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সামঞ্জস্য রেখে খাদ্য উৎপাদন বাড়াতে বিএডিসির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী- পরবর্তী বৈঠকে সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য উপস্থাপনের সুপারিশ করা হয়েছে। দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির সাথে বিএডিসির ভূমিকা ও ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা পর্যালোচনা করতে চায় কমিটি।
বৈঠকে কমিটির সদস্য ও হুইপ মিয়া নূরুদ্দিন আহাম্মেদ অপু, হুইপ মো: আখতারুজ্জামান মিয়া, মোছা: তাহসিনা রুশদীর, খোন্দকার আবু আশফাক, মোহাম্মদ কয়ছর আহমেদ, মো: মুস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া এবং মোহাম্মদ নাজিবুর রহমান অংশগ্রহণ করেন।
এ ছাড়া শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব, অতিরিক্ত সচিব, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগের কর্মকর্তারা, বিসিআইসি, বিএডিসি এবং এর আওতাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মকর্তারা এবং জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন।





