কক্সবাজার অফিস
কক্সবাজার শহরের প্রধান পর্যটন এলাকা কলাতলীতে কোটি কোটি টাকা মূল্যের সরকারি খাসজমি দখল করে অবৈধভাবে বাণিজ্যিক মার্কেট নির্মাণের মারাত্মক অভিযোগ উঠেছে। উচ্চ আদালতের স্থিতাবস্থা বজায় রাখার স্পষ্ট নির্দেশ তোয়াক্কা না করে কলাতলী প্রধান সড়কের পাশে উঁচু টিনের বেড়া দিয়ে রাতারাতি গড়ে তোলা হচ্ছে এসব অবৈধ স্থাপনা।
ইতোমধ্যে নির্মাণাধীন ও নির্মিত ১৯টি দোকান থেকে অগ্রিম বা সেলামি বাবদ কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে একটি শক্তিশালী দখলদার সিন্ডিকেট। কক্সবাজারের অন্যতম ব্যস্ততম পর্যটন এলাকায় এমন প্রকাশ্য দখলের ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
গত বুধবার বিকেলে সরেজমিন দেখা যায়, কলাতলী পুলিশ বক্স থেকে উত্তর দিকে ওশান প্যারাডাইস হোটেল পর্যন্ত দীর্ঘ সড়কের পাশে প্রায় ১৫ ফুট উঁচু টিনের বেড়া দেয়া হয়েছে। ভেতরে চলছে বিশাল নির্মাণযজ্ঞ। পরিকল্পিত ১৯টি দোকানের মধ্যে ১০টির নির্মাণকাজের শেষ পর্যায়। প্রায় অর্ধশতাধিক শ্রমিক কাজ করছেন। চুক্তিতে কাজ করা এসব শ্রমিকরা জানান, এক সরদারের অধীনে তারা কাজ করছেন, তবে মূল মালিক কেÑ তা তারা জানেন না।
সেখানে দায়িত্বপ্রাপ্ত নিরাপত্তাকর্মী রাকিব জানায়, মান্নান নামের এক সিকিউরিটি ইনচার্জের অধীনে সে কর্মরত। তবে কার নির্দেশে বা কার মালিকানায় এই বিশাল স্থাপনা তৈরি হচ্ছে, সে বিষয়ে কোনো কথা বলতে রাজি হয়নি তিনি। ঘেরাও করা টিনের মাঝখানে প্রশাসনের তথ্যসংবলিত তিনটি সাইনবোর্ড টাঙানো রয়েছে। তাতে লেখা বিএস খতিয়ান নম্বর ১, দাগ নম্বর ২০০০৩ (৩০ নম্বর প্লট)। সাইনবোর্ডে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে, জমিটি নিয়ে আদালতে মামলা বিচারাধীন এবং উচ্চ আদালত উভয় পকে স্থিতাবস্থা বজায় রাখার আদেশ দিয়েছেন। কিন্তু সেই নির্দেশ অমান্য করেই বহাল তবিয়তে চলছে খাসজমি দখলের উৎসব।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, অতীতে ‘প্রাসাদ প্যারাডাইস’-এর মালিক ইউসুফ আবদুল্লাহর নামে দেয়া ৩০ নম্বর প্লটের বরাদ্দ বাতিল করে তা ১ নম্বর সরকারি খাস খতিয়ানে অন্তর্ভুক্ত করে জেলা প্রশাসন। বর্তমানে ইউসুফ আবদুল্লাহর নাম ভাঙিয়ে স্থানীয় একটি প্রভাবশালী চক্র পুরো দখল প্রক্রিয়া পরিচালনা করছে। দখলদার চক্রটি নির্মাণাধীন প্রতিটি দোকান থেকে অবস্থানভেদে ৫ থেকে ১২ লাখ টাকা পর্যন্ত অগ্রিম সেলামি এবং মাসভিত্তিক ২০ হাজার টাকা ভাড়া নির্ধারণ করে পজিশন বিক্রি করছে। টিনের বেড়ার বাইরে ইতোমধ্যে বৈশাখী রেস্তোরাঁ, হানিফ এন্টারপ্রাইজ, ফরিদ ট্রাভেলস, বৈশাখী বাস কাউন্টার, এস আই এন্টারপ্রাইজ, গ্রিন সেন্টমার্টিন এক্সপ্রেস ও বেঙ্গল পরিবহনসহ অন্তত ১১টি বাস কাউন্টার, ট্রাভেল এজেন্সি এবং তিনটি কফি শপ বসিয়ে নিয়মিত ভাড়া আদায় করা হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীরা জানান, গত মে মাসে কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপ (কউক) ডলফিন মোড়ে উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে বেশ কিছু অবৈধ স্থাপনা গুঁড়িয়ে দিয়েছিল। তবে রহস্যজনক কারণে বৈশাখী রেস্তোরাঁ ও সংলগ্ন এলাকা উচ্ছেদের বাইরে থেকে যায়। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে এখন পুরো প্লটটি গ্রাস করতে মেতেছে সিন্ডিকেট।
কক্সবাজার সদর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মশিয়ুর রহমান বলেন, জেলা প্রশাসকের নির্দেশে ইতোমধ্যে ঘটনাস্থলে প্রতিনিধি পাঠানো হয়েছে। আদালতের আদেশের সুযোগ নিয়ে বা মতার প্রভাব দেখিয়ে সরকারি খাস জমি দখল করার কোনো সুযোগ নেই। খাস জমিতে কোনো অবৈধ স্থাপনা নির্মিত হয়ে থাকলে তা দ্রুত উচ্ছেদ করে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে।
কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট তাসনীম জাহান জানান, উচ্চ আদালতের স্থিতাবস্থার আদেশের পর সেখানে নতুন কোনো অবকাঠামো তৈরির সুযোগ নেই। অবৈধ দখলদারদের মালামাল সরিয়ে নেয়ার জন্য ২৪ ঘণ্টার নোটিশ দেয়া হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তা না সরালে আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে।