বিশ্বের ধনী ব্যক্তিদের তালিকায় তার নাম উঠেছিল বছর দুয়েক আগেই। বাংলাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে তার প্রভাবের কথা অনেকেই জানেন। প্রধানমন্ত্রীর কাছের লোক হিসেবে বেশ পরিচিতি আছে। নিন্দুকেরা তাকে দরবেশ বাবা বলে ডেকে থাকেন। বাংলাদেশের শেয়ার মার্কেটের অন্যতম ক্রীড়ানক। অনেকে তাকে শেয়ার বাজারের খলনায়কও ডেকে থাকেন। ১৯৯৬ ও ২০১০ সালের শেয়ার মার্কেটের ধ্বসের পেছনে তার ভূমিকা ছিল বলে তদন্তে উঠে এসেছিল। ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে কারসাজি করেছেন বলে গণমাধ্যমে উঠে এসেছে। কিন্তু নির্বাচন কমিশনে দেয়া হলফ নামায় তিনি ব্যাংক থেকে ঋণ নেননি বলে উল্লেখ করেন।

নিজের নামে বাড়ি, ফ্যাট, আসবাবপত্র ও বিদেশী মুদ্রা কিছুই নেই বিশিষ্ট ব্যবসায়ী বেক্সিমকো গ্রুপের কর্ণধার ও প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি খাত উন্নয়নবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের। তবে স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত নয় এমন কোম্পানির প্রায় ২৫১ কোটি টাকার শেয়ার বা স্টক রয়েছে তার নামে। আছে ৩৪ লাখ টাকা মল্যের গাড়ি। আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হতে তার দেয়া হলফনামাতে এ সব তথ্য পাওয়া গেছে। ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ থেকে এবার ঢাকা-১ আসনে নির্বাচন করতে যাচ্ছেন তিনি। রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে ২৭ নভেম্বর মনোনয়নপত্র দাখিল করেন তিনি।

বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তিদের তালিকায় স্থান পেয়েছেন বেক্সিমকো গ্রুপের মালিক সালমান ফজলুর রহমান। সালমান এফ রহমান নামে তিনি বেশি পরিচিত। ২০১৭ সালের মার্চে প্রকাশিত চীনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান হুরুন গ্লোবাল এ তালিকা প্রকাশ করে। সেই তালিকা অনুযায়ী দুই হাজার ২৫৭ জন ব্যক্তির মধ্যে তার অবস্থান ছিল এক হাজার ৬৮৫তম।



এ দিকে, হলফনামায় দেয়া তথ্যে দেখা যায় তার কোনো ইলেকট্রনিক সামগ্রী নেই। নেই কোনো আসবাবপত্র, নেই বাড়ি বা অ্যাপার্টমেন্টও। তিনি ও তার স্ত্রী কোনো রকম সুদ ছাড়াই আত্মীয়-স্বজন ও বিভিন্ন কোম্পানিকে ঋণ দিয়েছেন ৩৩ কোটি ১৪ লাখ ৩৮ হাজার ১৯১ টাকা। অতীতে তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা হয়নি বলে উল্লেখ করেন সালমান এফ রহমান। যদিও ১৯৯৬ সালের শেয়ার কেলেঙ্কারির ঘটনায় বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস ও সালমান এফ রহমানের বিরুদ্ধে দু’টি মামলা হয়।

হলফনামায় তিনি উল্লেখ করেছেন, আমি একক বা যৌথভাবে আমার ওপর নির্ভরশীল কোনো সদস্য অথবা কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান, ম্যানেজিং ডিরেক্টর বা ডিরেক্টর হওয়ার সুবাদে আমি কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ গ্রহণ করিনি। যদিও তিনি হলফনামায় উল্লেখ করেছেন, তার নিজ নামে স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ ২৭৮ কোটি ৬০ লাখ পাঁচ হাজার ৫৬৪ টাকা। তার স্ত্রীর স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ ৪২ কোটি ৩৭ লাখ ২১ হাজার ৯২৭ টাকা।
হলফনামা অনুযায়ী, আলোচিত ব্যবসায়ী সালমান এফ রহমানের বার্ষিক মোট আয় ৯ কোটি ৩৪ লাখ ৭৭ হাজার ৬২৮ টাকা। এর মধ্যে বাড়ি-অ্যাপার্টমেন্ট-দোকান বা অন্যান্য ভাড়া থেকে আয় দেখানো হয় তিন লাখ ৯৯ হাজার টাকা। যদিও নিজ বা স্ত্রীর নামে কোনো বাড়ি-অ্যাপার্টমেন্ট নেই বলে প্রকাশ করা হয়েছে।

ঢাকা-১ আসনের মনোনয়নপত্র দাখিলকারী সালমান এফ রহমানের ব্যবসায় থেকে বার্ষিক আয় দেখানো হয়েছে ছয় লাখ টাকা। এ ছাড়া শেয়ার-সঞ্চয়পত্র-ব্যাংক আমানত ডিভিডেন্ট থেকে চার কোটি ২৫ লাখ ৮৭ হাজার ৭৭৮ টাকা, চাকরি (সম্মানী ভাতা) থেকে ৪১ লাখ ৯২ হাজার ২০০ টাকা, বাংলাদেশ এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট কোম্পানির বোনাস শেয়ার ও আইএফআইসি ব্যাংকের বোনাস শেয়ার বাবদ চার কোটি ৫৬ লাখ ৯৮ হাজার ৬৫০ টাকা আয় দেখানো হয়। তবে তার ওপর নির্ভরশীলদের কোনো আয় নেই বলে হলফনামায় উল্লেখ করা হয়েছে।

হলফনামার তথ্য অনুযায়ী, সালমান এফ রহমানের স্থাবর সম্পদ রয়েছে ২৭৬ কোটি ৪৮ লাখ ৩৯ হাজার ৬৯৪ টাকার। এর মধ্যে রয়েছে নগদ অর্থ দুই কোটি ১০ লাখ টাকা, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে জমা দুই কোটি ৮৬ লাখ ৭০ হাজার ১২৮ টাকা। বন্ড-ঋণপত্র-স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত ও তালিকাভুক্ত নয় এমন কোম্পানির শেয়ার ৭৫ হাজার ও ২৫০ কোটি ৮৪ লাখ ৭৪ হাজার ১৩৬ টাকা। বাস-ট্রাক-মোটরগাড়ি-লঞ্চ-স্টিমার-বিমান ও মোটরসাইকেল ইত্যাদির মল্য ৩৪ লাখ টাকা, স্বর্ণ ও অন্যান্য মল্যবান ধাতু ও পাথর নির্মিত অলঙ্কারাদি ১৫ লাখ পাঁচ হাজার টাকা।

অন্য দিকে, আত্মীয়-স্বজন ও বিভিন্ন কোম্পানিকে দেয়া সুদমুক্ত ঋণের পরিমাণ দেখানো হয়েছে ২০ কোটি ১৭ লাখ ৮২ হাজার ৯৩০ টাকা।

হলফনামায় আরো উল্লেখ করা হয়, সালমানের স্ত্রীর স্থাবর সম্পদ রয়েছে ১৩ কোটি ৪৪ লাখ ৪৬ হাজার ৩৭০ টাকা। এর মধ্যে রয়েছে নগদ অর্থ ৬০ হাজার টাকা, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে জমা করা অর্থের পরিমাণ ৪৫ লাখ ৫১ হাজার ১০৯ টাকা। স্বর্ণ, অন্যান্য মল্যবান ধাতু ও পাথর নির্মিত অলঙ্কারাদি এক লাখ ৮০ হাজার টাকা; আত্মীয়-স্বজন ও বিভিন্ন কোম্পানিকে দেয়া সুদমুক্ত ঋণের পরিমাণ ১২ কোটি ৯৬ লাখ ৫৫ হাজার ২৬১ টাকা। এই প্রার্থীর অস্থাবর সম্পদ দুই কোটি ১১ লাখ ৬৫ হাজার ৮৬৬ টাকার। এর মধ্যে রয়েছে অকৃষি জমি দুই কোটি তিন লাখ ১২ হাজার ৬৮৭ টাকার। এ ছাড়া, আট লাখ ৫৩ হাজার ১৭৯ টাকা মল্যের দালান, আবাসিক-বাণিজ্যিক সম্পদ।

হলফনামার তথ্য অনুযায়ী, সালমান এফ রহমানের স্ত্রীর অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ ২৮ কোটি ৯২ লাখ ৭৫ হাজার ৫৫৭ টাকা। এর মধ্যে রয়েছে তিন কোটি ৭৩ লাখ ৩ হাজার ৭০৮ টাকা মূল্যের অকৃষি জমি ও বিল্ডিং কনস্ট্রাকশন বাবদ ২৫ কোটি ১৯ লাখ ৭১ হাজার ৮৪৯ টাকা। চলতি বছরের ৩০ জুলাই পর্যন্ত সালমান এফ রহমানের দায়-দেনার মধ্যে রয়েছে ৬৮ কোটি ৫১ লাখ ৫৭ হাজার ২৭০ টাকা ও ১৫ কোটি ২৭ লাখ ৯৬ হাজার ১৪০ টাকা।

ফজলুর রহমান ও সৈয়দা ফাতিনা রহমানের সন্তান সালমান ফজলুর রহমান। তার বাড়ি ঢাকার দোহার উপজেলার মুকসুদপুরের বেথুয়া গ্রামে।

হলফনামায় ম্যাজিস্ট্রেট-নোটারি পাবলিক এ এ এম মনিরুজ্জামান বলেন, এর মাধ্যমে শনাক্তকৃত হয়ে অদ্য ২৭ নভেম্বর আমার সম্মুখে শপথপূর্বক ওপরে বর্ণিত হলফনামা প্রদান করেছেন। ২ ডিসেম্বর প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই করা হবে।