স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতি প্রতিরোধে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এক বছর আগে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে ২৫টি সুপারিশ করে একটি প্রতিবেদন জমা দিয়েছিল। কিন্তু সে প্রতিবেদন আর আলোর মুখ দেখেনি। প্রতিবেদন জমা দেয়ার পর এক বছর পেরিয়ে গেলেও সে প্রতিবেদনের আলোকে ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।
দুদকের অনুসন্ধান ও তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেন, তাৎক্ষণিক কিছু পদক্ষেপ নেয়া হলেও দুর্নীতির প্রকৃত উৎস বন্ধে পদক্ষেপ এখন পর্যন্ত চোখে পড়েনি। ফলে ঘুরে-ফিরে একই ধরনের দুর্নীতি ও অনিয়মে জর্জরিত স্বাস্থ্য খাত। করোনাভাইরাসের মতো মহাদুর্যোগের মধ্যেও মাস্ক, পিপিই কেনা নিয়ে দুর্নীতি হয়েছে।
করোনা পরিস্থিতির মধ্যেও সম্প্রতি রাজধানীর মুগদা জেনারেল হাসপাতালসহ দেশের কয়েকটি সরকারি হাসপাতালে কেন্দ্রীয় ঔষধাগারের মাধ্যমে এন-৯৫ ব্র্যান্ডের মোড়কে সাধারণ ও নিম্নমানের মাস্ক সরবরাহ করেছিল জেএমআই গ্রুপ। কেলেঙ্কারির এই ঘটনায় তদন্ত এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে রিট দায়ের করা হয়। পরে এ ঘটনায় তদন্ত কমিটিও গঠন করেছিল স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। একই সাথে দুদকের পক্ষ থেকেও এ বিষয় একটি অনুসন্ধান টিম কাজ করছে।
২০১৯ সালের ৩১ জানুয়ারি দুদক স্বাস্থ্য খাতে যন্ত্রপাতি ক্রয়, নিয়োগ, বদলি, পদোন্নতি কিংবা ওষুধ সরবরাহের ১১ পর্যায়ে দুর্নীতি চিহ্নিত করে তা প্রতিরোধে ২৫টির মতো সুপারিশ জমা দিয়েছিল দুদক। স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেকের হাতে দুদকের এই প্রতিবেদন তুলে দিয়েছিলেন কমিশনার (অনুসন্ধান) মোজাম্মেল হক খান। এরপর কিছুদিন দুদকের এই সুপারিশ নিয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়সহ অধিদফতরে তোড়জোড় চললেও বাস্তবে এর কোনো সুফল আসেনি।
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ এ বিষয়ে সম্প্রতি গণমাধ্যমকে বলেন, স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম-দুর্নীতি প্রতিরোধে কমিশন কর্তৃক গঠিত প্রাতিষ্ঠানিক টিম কাজ করেছে। গত বছর কমিশনের প্রাতিষ্ঠানিক টিমের একটি প্রতিবেদন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে জমা দেয়া হয়েছে। প্রতিবেদনের সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন করা হলে স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতি-অনিয়ম প্রতিরোধ করা সহজ হবে।
দুদকের একজন কর্মকর্তা বলেন, দুদকের সুপারিশ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় আমলে নিয়েছে। তবে তারা এখনো দৃশ্যমান তেমন ব্যবস্থা নেয়নি। কর্মকর্তা বলেন, দুদকের সুপারিশ আমলে নিয়ে পদক্ষেপ নিলে অবশ্যই স্বাস্থ্য বিভাগে দুর্নীতি কমে যাবে। দুর্নীতি প্রতিরোধে একটি সহায়ক পরিবেশ তৈরি হবে বলে জানান তিনি।
দুদকের সুপারিশকৃত প্রতিবেদনে দুর্নীতির ১১ উৎস চিহ্নিত করা হয়েছিল। এর মধ্যে রয়েছে-সরকারি হাসপাতালে নিয়োগ, বদলি, পদোন্নতি ও প্রশিক্ষণার্থী বাছাইয়ে কোনো নীতিমালা মানা হয় না। বিভিন্ন হাসপাতাল ও ক্লিনিকের কর্মচারীরা একই কর্মস্থলে দীর্ঘ দিন কর্মরত থাকার কারণে স্থানীয় দালালদের সমন্বয়ে সংঘবদ্ধ চক্রে পরিণত হয়। যারা রোগীদের অসহায়ত্বের সুযোগে অতিরিক্ত অর্থ হাতিয়ে নেয়। সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা সরঞ্জাম চালানোর জন্য দক্ষ জনবল নিয়োগ না দিয়েই যন্ত্রপাতি সরবরাহ করা হয়, ফলে দীর্ঘকাল অব্যবহৃত থেকে তা নষ্ট হয়। একই সাথে কোথাও কোথাও যন্ত্রপাতি মেরামতের নামে অর্থ আত্মসাৎ হয়।
অন্য দিকে হাসপাতালে একটি সঙ্ঘবদ্ধ দালাল চক্র দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের অসহায় গরিব রোগীদের উন্নত চিকিৎসার প্রলোভন দেখিয়ে প্রাইভেট হাসপাতালে নিয়ে যায়। বিনিময়ে ওই সব হাসপাতালে চলে কমিশন বাণিজ্য। হাসপাতালের ওষুধ রোগীদের না দিয়ে কালোবাজারে বিক্রি করা হয়। কেনাকাটার ক্ষেত্রে অনৈতিক প্রভাবে নিম্নমানের বা অপ্রয়োজনীয় চিকিৎসা যন্ত্রপাতি কেনা হয়। এ ক্ষেত্রে অনিয়ম, দুর্নীতির মাধ্যমে নির্দিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেয়া হয়। একটি চক্রের আঁতাতে নিম্নমানের ও নকল ওষুধ বিভিন্ন কোম্পানির বিক্রয় প্রতিনিধি ও চিকিৎসকদের মাধ্যমে বিক্রির ব্যবস্থা করা হয়। প্রভাবশালী চক্র হাসপাতালের চিকিৎসক- কর্মচারীদের প্রভাবিত করে অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে রোগীদের অর্থ হাতিয়ে নেয়। এমনকি বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজ স্থাপন করে মেধা যাচাই না করে ছাত্রছাত্রী ভর্তি করারও প্রমাণ রয়েছে।
অন্য দিকে স্বাস্থ্য খাতের ওই দুর্নীতি প্রতিরোধে সুপারিশগুলোর মধ্যে ছিল, প্রতিটি সরকারি হাসপাতালের উন্মুক্ত স্থানে সিটিজেন চার্টার ও হাসপাতালে কী কী ওষুধ স্টকে আছে, তা প্রদর্শন করা। ওষুধ ও মেডিক্যাল যন্ত্রপাতি কেনাকাটায় দুর্নীতি বন্ধে ক্রয় কমিটিতে বিশেষজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত করা ও ইজিপিতে টেন্ডার আহ্বান করা। দক্ষ জনবল নিয়োগ দিয়ে যন্ত্রপাতি সরবরাহ করার বিধান করা। সরকার নির্ধারিত ডায়াগনস্টিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার মূল্য তালিকা জনসমক্ষে প্রদর্শন করার ব্যবস্থা করা ও ই-রেজিস্টার চালু করা। জেলা উপজেলাসহ প্রত্যন্ত অঞ্চলে অনুমোদনহীন ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার বন্ধে শক্তিশালী নজরদারি কমিটি গঠন করা। নকল ওষুধ ও কারখানার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিয়ে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে শাস্তি নিশ্চিত করা।
এ ছাড়া সুপারিশে আরো উল্লেখ করা হয়, কোনো চিকিৎসক একই কর্মস্থলে তিন বছর চাকরি করার পর স্বয়ংক্রিয়ভাবে তার বদলি কার্যকর হবে, এমন নীতিমালা করা। প্রত্যন্ত এলাকায় পদায়নকৃত চিকিৎসকদের প্রণোদনার বিধান করে কর্মক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক উপস্থিতি নিশ্চিত করা। চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্রে ওষুধের নাম না লিখে জেনেরিক নাম লেখা বাধ্যতামূলক করা ও সব নাগরিকের জন্য স্বাস্থ্যবিমা চালু করার সুপারিশ করা হয়।
তবে দুদকের এই ২৫টি সুপারিশের কোনোটিরই আজো বাস্তবায়ন হয়নি বলে জানা গেছে।








