গ্রামগঞ্জে শীত পড়েছে বেশ আগেই। খুব একটা অনুভূত না হলেও মৃদু শীত পড়তে শুরু করেছে রাজধানী ঢাকাতেও। আবহাওয়াবিদদের ধারণা, কুয়াশা কেটে গেলেই ভালোভাবে শীত পড়বে।
গত সপ্তাহে এক পশলা বৃষ্টি ইতোমধ্যেই রাজধানীবাসীকে শীতের আগমনী বার্তা জানান দিয়েছে।
ঢাকাবাসী সাদরেই গ্রহণ করেছে শীতের আগমনকে। বৃষ্টির পরের রাত ও সকালে বেশ ভালোই শীত অনুভব করেছেন নগরীর বাসিন্দারা। শীতের আগমনে পোশাক আর খাবারে এসেছে পরিবর্তন। সন্ধ্যা ও সকালের নাস্তায় যুক্ত হয়েছে শীতের পিঠা!গ্রামের মত খেজুরের রসের দেখা রাজধানীতে না মিললেও শীতের হরেক রকমের পিঠা এখন নগরীর অলিতে গলিতে। এরমধ্যে ভাপা পিঠাই সবচেয়ে জনপ্রিয়। দিনের শুরুতে বা দিনের শেষে ভাপা পিঠা পাওয়া যায় নগরীর রাস্তায় রাস্তায়। বিশেষ করে সন্ধ্যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি চত্বরে বন্ধুদের আড্ডায়ও বেশ জায়গা করে নিয়েছে শীতের এই পিঠা।
এখানকার ভ্রাম্যমাণ ফুটপাতের অনেক ব্যবসায়ী শীতের আগমনে তার ব্যবসায় এনেছেন পরিবর্তন। গরমে ফুটপাতে শরবত বিক্রি করার পরিবর্তে এখন বিক্রি হচ্ছে ভাপা পিঠা। এতে আয় বাড়ছে। আনন্দবাজার থেকে পিঠার গুড়া কিনে এনে গুর আর নারিকেল মিশিয়ে পিঠার সাজে গরম ভাপ এর মাধ্যমে তৈরি করা হয় এ পিঠা।
ফুটপাতের অন্যান্য খাবারের মান নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও ভাপা এবং শীতকালীন চিতই পিঠার মান নিয়ে ক্রেতাদের নেই কোনো দ্বিধাদ্বন্দ্ব। একাধিক ক্রেতার সাথে কথা বললে তারা জানান, এসকল পিঠায় ভেজাল করার কোনো সুযোগ থাকে না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি চত্বরে ভাপা পিঠা বিক্রেতা মোঃ ইব্রাহীমের সাথে কথা বলে জানা যায়, তিনি ১৯ বছর আগে চাঁদপুরের মতলব থেকে এসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এফ রহমান হলে চাকরি নেন। গরমের সময় তিনি দিনের একটা সময় শরবত বিক্রি করতেন। এখন শীতকালে ভাপা পিঠা বিক্রি করছেন। প্রতিদিন চার থেকে পাঁচ শ’ পিঠা বিক্রি করেন। শরবত বিক্রি করে দিনে ৬০০-৭০০ টাকা আয় হলেও, পিঠা বিক্রি করে তার দৈনন্দিন আয় দেড় থেকে দু'হাজার টাকা। স্ত্রী, ছোট শিশু দুই সন্তান ও মাকে নিয়ে ভলো আছেন বলেও জানান তিনি।
চাঁদপুর শহর থেকে আসা আরেক ফুটপাতে পিঠা বিক্রেতা ফারুক মিয়া বলেন, গরমে শরবত বিক্রি করতাম এখন পিঠা বিক্রি করি। এসময় মাঝেমধ্যে টিএসসি থেকে হঠাৎ দোকান উঠিয়ে দেয়ার অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, আমরা ফুটপাতে ব্যবসা করে কয়েক টাকা ইনকাম করি। কিন্তু প্রাই আমাদের এখান থেকে বাঁশি বাজিয়ে তুলে দেয়া হয়। যদি ঠিকঠাক মত ব্যবসাটা করতে পারি তবে দু'বেলা পরিবার নিয়ে খেয়ে বাঁচতে পারতাম।
রাজধানীর শনিরআখড়ায এলাকার পিঠা বিক্রেতা আবুল হোসেনের সাথে কথা বলে জানা যায়, শীতের আগে তিনি নিয়মিত আলুর চপ, পেঁয়াজু, বেগুনি দিয়ে মুড়ি বানিয়ে বিক্রি করতেন। এখন তিনি এসবের পাশাপাশি ভাপা পিঠা ও চিতই পিঠা বিক্রি করেন। তার এই কাজে তাকে সহযোগিতা করেন তার মা ও স্ত্রী। এই শীতের সময়ে পিঠা বিক্রি করে যে অতিরিক্ত টাকা আয় হবে, তা দিয়ে তিনি ঋণ পরিশোধ করবেন বলে জানান।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এর টিএসসি চত্বরে কৃষ্ণা সুকন্যা বণিক নামে এক পিঠা ক্রেতার সাথে কথা বলে জানা যায়, অনেকদিন পর শীতের আগমনে টিএসসি চত্বরে এসে বন্ধুরা একত্রিত হয়েছি। এখানে অনেক শীতের পিঠার দোকান বসেছে। আমাদের উদ্দেশ্য শীতের পিঠা খাওয়ার পাশাপাশি আড্ডা দেয়া।
আরেক ক্রেতা তানজিন আহসান মৌ বলেন, ছোটবেলা গ্রামে মাকে বাসায় পিঠা বানাতে দেখতাম। এখন তো সেভাবে গ্রামে যাওয়া হয় না আর মায়ের হাতের পিঠা খাওয়া হয় না। তাই শীতের পিঠা খাবার আনন্দটা এখানেই উপভোগ করছি।
প্রকৌশলী তানিয়া সুলতানা জানান, শীতের পিঠার মজাই আলাদা। সারাদিন অফিসে কাজকর্ম করে বাসায় এসে পিঠা বানানোর ধৈর্য থাকে না। তাই ছোট বোনকে নিয়ে পিঠা খেতে এখানে চলে এসেছি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মনসুরা আলম বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তির আগে যখন গ্রামে ছিলাম তখন মা এবং আমার চাচিরা পিঠা বানাতো। আমরা পাশে বসে গরম গরম পিঠা খেতাম। কিন্তু ব্যস্তময় জীবনে এখন আর মায়ের হাতে সেই পিঠা খাওয়া হয় না। তাই শীতের আগমনে টিএসসির পিঠা খেয়ে সেই স্বাদ পূরণের চেষ্টা করছি।





