অষ্টগ্রাম (কিশোরগঞ্জ) থেকে সংবাদদাতা
একসময় মাটির থালা-বাসন, কলসি, হাঁড়ি-পাতিল, সানকি ও মটকার টুংটাং শব্দে মুখর থাকত কিশোরগঞ্জের হাওরবেষ্টিত অষ্টগ্রামের কুমোরপাড়া। দিনভর কাজ শেষে প্রদীপের আলোয় গভীর রাত পর্যন্ত চলত মাটির পাত্র তৈরির ব্যস্ততা। সময়ের পরিবর্তনে সেই চিত্র এখন অনেকটাই ম্লান। প্লাস্টিক, মেলামাইন ও স্টেইনলেস স্টিলের পণ্যের সহজলভ্যতায় কমেছে মাটির সামগ্রীর চাহিদা। এর সাথে কাঁচামাল ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিতে সঙ্কটে পড়েছে শত বছরের ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্প।
স্থানীয় কারিগরদের সাথে কথা বলে জানা যায়, একসময় গৃহস্থালির প্রয়োজনীয় অধিকাংশ পাত্রই মাটির তৈরি হতো। এখন তুলনামূলক কম দাম, স্থায়িত্ব ও সহজলভ্যতার কারণে মানুষ বিকল্প পণ্যের দিকে ঝুঁকেছেন। ফলে মাটির তৈরি পণ্যের বাজার সঙ্কুচিত হয়েছে। অন্যদিকে এঁটেলমাটি সংগ্রহ, পণ্য পোড়ানোর জ্বালানি ও পরিবহনসহ উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে। এতে শ্রমের তুলনায় আয় কমে যাওয়ায় অনেক কারিগর পেশা পরিবর্তনে বাধ্য হচ্ছেন।
অষ্টগ্রামের প্রদীপ রুদ্রপাল পৈতৃক মৃৎশিল্প ছেড়ে হবিগঞ্জের মাধবপুর বাজারে সাউন্ড সিস্টেমের ব্যবসা করছেন। তিনি বলেন, এ পেশায় ভবিষ্যৎ দেখতে না পেয়ে লোকসান থেকে বাঁচতে অন্য ব্যবসায় যেতে হয়েছে।
প্রবীণ কারিগরদের আশঙ্কা, বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে নতুন প্রজন্ম আর এ পেশায় আসবে না। ফলে কয়েক বছরের মধ্যে অষ্টগ্রাম থেকে মৃৎশিল্পের ঐতিহ্য হারিয়ে যেতে পারে।
হাওর অঞ্চলবাসীর পরিবেশ ও সামাজিক সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক কামরুল হাসান বাবু বলেন, মানুষের চাহিদা বদলালেও মৃৎশিল্পে আধুনিক নকশা ও প্রযুক্তির সংযোজন ঘটানো সম্ভব। তবে গ্রাম ও মফস্বলে এ শিল্পের আধুনিকায়ন হয়নি। কারিগরদের প্রশিক্ষণ, আধুনিক যন্ত্রপাতি এবং সরকারি ব্যবস্থাপনায় সহজ শর্তে পুঁজি সরবরাহ করা গেলে এ শিল্প টিকিয়ে রাখা সম্ভব।
স্থানীয় কারিগর ও বাসিন্দারা বলছেন, ঐতিহ্য রক্ষার পাশাপাশি কারিগরদের জীবিকা নিশ্চিত করতে সহজ শর্তে ঋণ, প্রশিক্ষণ, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং উৎপাদিত পণ্যের বাজারজাতকরণে কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। অন্যথায় হাওরাঞ্চলের এই লোকশিল্পটি শুধু স্মৃতিতেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।





