রাবি সংবাদদাতা
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) সাংবাদিক ও শিক্ষার্থীদের ওপর রোববার রাতের হামলার ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের মুখ ভিডিও ফুটেজে স্পষ্ট দেখা গেলেও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে মামলা করেছে বলে জানিয়েছেন ক্যাম্পাস সাংবাদিকরা। গতকাল বিকেলে শহীদ জিয়াউর রহমান হলের উপ-রেজিস্ট্রার মনির হোসেন বাদি হয়ে মতিহার থানায় মামলাটি দায়ের করেন। সাংবাদিকরা হামলায় জড়িতদের দ্রুত গ্রেফতার এবং তাদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ও কার্যকর ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানিয়েছেন।
মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করে মতিহার থানার ওসি গোলাম কবির বলেন, ‘একটি অজ্ঞাতনামা মামলা দায়ের করা হয়েছে। আমরা মামলাটি গ্রহণ করেছি এবং তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেয়া শুরু করেছি।’
রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের মুখপাত্র গাজীউর রহমান জানান, রাবির কর্মকর্তা মনির হোসেন অজ্ঞাতনামা কয়েকজনকে আসামি করে মামলা করেছেন। তিনি বলেন, ‘যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, প্রাথমিক তদন্তে তাদের সংশ্লিষ্টতা প্রমাণিত হলে অবশ্যই আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে।’
তবে এই মামলায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিকরা। তাদের মতে, হামলায় জড়িতদের পরিচয় নিয়ে কোনো দ্ব্যর্থবোধক অবকাশ নেই। রাজশাহী ইউনিভার্সিটি জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের (রূজা) সাবেক সভাপতি ইরফান তামীম বলেন, ‘অভিযুক্তদের নাম, পদবি ও পরিচয় ইতোমধ্যে গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে এবং ঘটনার ভিডিও ফুটেজও সবার কাছে রয়েছে। অজ্ঞাতনামা মামলা করা অত্যন্ত হতাশাজনক। আমরা স্পষ্টভাবে বলতে চাই, অভিযুক্তদের নাম উল্লেখ করে মামলায় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে এবং অবিলম্বে গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনতে হবে।’
রাবি প্রেস ক্লাবের সভাপতি আশিকুল ইসলাম ধ্রুব বলেন, হামলাকারীদের পরিচয় ‘আয়নার মতো পরিষ্কার’।
তিনি বলেন, আমাদের কাছে হামলার সব ফুটেজ আছে এবং দেশের মানুষ তা দেখেছে। তাদের নাম, পদবি ও পরিচয় ইতোমধ্যে প্রতিবেদনে প্রকাশিত হয়েছে। তাই অজ্ঞাতনামা মামলা করার কোনো কারণ থাকতে পারে না। হামলায় জড়িত সবাইকে মামলায় আসামি করা হোক এবং যত দ্রুত সম্ভব তাদের গ্রেফতার করা হোক।
রোববার রাতে শহীদ জিয়াউর রহমান হলের সামনে দেশীয় অস্ত্র নিয়ে সাংবাদিক ও শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালায় বিশ্ববিদ্যালয় শাখা জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা। এতে চার সাংবাদিকসহ অন্তত ১০ জন আহত হন। আহত সাংবাদিকরা হলেন- দ্য ডেইলি স্টারের রাবি প্রতিনিধি ও রাজশাহী ইউনিভার্সিটি রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি নূর আহসান মৃদুল, আগামীর সময়ের জাহিদুল ইসলাম, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের আরিফুজ্জামান কোরবান এবং সমকালের মইনুল ইসলাম রাজু।
পরে রাত দেড়টার দিকে বিক্ষুব্ধ সাংবাদিক ও শিক্ষার্থীরা রাবির প্রোভিসি (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. মামুনুর রশিদ এবং অন্য কর্মকর্তাদের হল প্রভোস্টের কার্যালয়ে অবরুদ্ধ করে রাখেন এবং দুপুরের মধ্যে মামলা ও অভিযুক্তদের গ্রেফতারের আলটিমেটাম দেন। অধ্যাপক মামুনুর তাদের আশ্বস্ত করেন যে হল প্রশাসন মামলা করবে এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন পর্যায়ক্রমে তাদের অন্যান্য দাবিগুলোও বাস্তবায়ন করবে।
আন্দোলনকারীদের অন্যান্য দাবির মধ্যে ছিল- অভিযুক্ত শিক্ষার্থীদের ছাত্রত্ব ও সনদ বাতিল, ক্যাম্পাসে বহিরাগত প্রবেশ নিষিদ্ধ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ও হল প্রভোস্টের পদত্যাগ।
ছাত্রদলের তদন্ত : এদিকে এই ঘটনার তদন্ত এবং ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেয়ার জন্য কেন্দ্রীয় সহসভাপতি এ বি এম ইজাজুল কবির রুয়েল ও মঞ্জুরুল আলম রিয়াদকে নিয়ে দুই সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে ছাত্রদল।
অভিযুক্তদের একজন, রাবি ছাত্রদলের সহসভাপতি আহসান হাবিব ‘কোনো নিরপেক্ষ সাংবাদিকের’ ওপর হামলার কথা অস্বীকার করেছেন। তিনি দাবি করেন, প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে কটূক্তি করার অভিযোগে সাবেক ছাত্রলীগ নেতা আরিফুল ইসলামকে ধরতে যখন ছাত্রদল নেতাকর্মীরা হলে যান, তখন সেখানে উপস্থিত সাংবাদিকরা ছিলেন ‘শিবিরকর্মী’, যারা ছাত্রদল নেতাদের ওপর হামলা চালাতে এসেছিলেন। তিনি দাবি করেন, তাদের কেবল ‘প্রতিরোধ করা হয়েছে’।
সিসিটিভি ফুটেজ ডিলিট করার অভিযোগ : এদিকে হামলাকারী ছাত্রদল নেতাকর্মীদের বাঁচাতে সিসিটিভি ফুটেজ ডিলিট করার অভিযোগ উঠেছে সংশ্লিষ্ট হল প্রভোস্ট অধ্যাপক মাহবুবুর রহমানের বিরুদ্ধে। তবে বিষয়টি অস্বীকার করেছেন তিনি।
জানা গেছে, পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে সাংবাদিকদের উপর অতর্কিত হামলা করে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা। হামলায় নেতৃত্ব দেন বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সহসভাপতি আহসান হাবিব, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হাসিবুল ইসলাম, সহসভাপতি শরিফুল ইসলাম এবং সহদফতর সম্পাদক শাহরিয়ার আলমসহ অনেকে।
এ ঘটনায় ক্যাম্পাসের ক্রিয়াশীল সাংবাদিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ হল প্রভোস্টের কাছে হামলার সময়কার সিসিটিভি ফুটেজ দাবি করলে তা দিতে অস্বীকৃতি জানান তিনি। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে সিসিটিভির হার্ডডিস্ক খুলে আনেন সাংবাদিকরা। ফুটেজ নিয়ে আবার ফিরিয়ে দেয়া হবে বলে জানান তারা।
তবে পরে সাংবাদিকরা দাবি করেন, হার্ডডিস্কে কোনো ফুটেজ পাওয়া যায়নি। হামলাকারীদের আড়াল করতে ঘটনা ঘটার পরপরই সব ফুটেজ ডিলিট করে দেন হল প্রভোস্ট।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি আশিকুল ইসলাম বলেন, হামলাকারীদের রক্ষা করতে হল প্রভোস্টের তত্ত্বাবধানে ইচ্ছাকৃতভাবে ফুটেজ মুছে ফেলা হয়েছে। বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক ও নিন্দনীয়।
তবে বিষয়টি অস্বীকার করে প্রাধ্যক্ষ মাহবুবুর রহমান বলেন, সংস্কারকাজ চলমান থাকায় তখন সিসিটিভির সংযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল। সেজন্য কোনো ফুটেজ নাই। ফুটেজ ডিলিট করার অভিযোগ পুরোপুরি মিথ্যা।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রোভিসি (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. আব্দুল আলিম বলেন, তথ্যগুলো সংরক্ষিত আছে। অভিযোগ যে কেউ করতে পারে। ডকুমেন্টসের কোনো অভাব নেই। তদন্ত কমিটি যেখান থেকে তথ্য সংগ্রহ করার সেখান থেকে করবে।
এদিকে সাংবাদিক ও শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার প্রতিবাদে এবং নিরপেক্ষ তদন্ত ও দোষীদের শাস্তির দাবিতে গতকাল ক্যাম্পাসে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করেন শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও সাবেক ক্যাম্পাস সাংবাদিকরা। ক্লাস বর্জন করে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শতাধিক শিক্ষক ও শিক্ষার্থী বিভাগের সামনে মানববন্ধনে অংশ নেন।
আরইউজের নিন্দা ও প্রতিবাদ
রাজশাহী ব্যুরো জানায়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ, তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন রাজশাহী সাংবাদিক ইউনিয়নের (আরইউজে) নেতৃবৃন্দ।
সোমবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক যৌথ বিবৃতিতে আরইউজের সভাপতি মুহা: আবদুল আউয়াল, সাধারণ সম্পাদক ডালিম হোসেন শান্ত, সহসভাপতি মঈন উদ্দিন, যুগ্ম সম্পাদক ওমর ফারুক, কোষাধ্যক্ষ হাবিল উদ্দিন হাবিব, প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক আশিকুর রহমান এবং নির্বাহী সদস্য সোহেল মাহবুব এ প্রতিবাদ জানান।
বিবৃতিতে সাংবাদিক নেতৃবৃন্দ বলেন, রোববার রাতে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে সাংবাদিকদের ওপর ছাত্রদল নামধারী শিক্ষার্থীদের হামলার ঘটনা স্বাধীন সাংবাদিকতার জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এ ধরনের হামলা শুধু সাংবাদিকদের নিরাপত্তার জন্য হুমকি নয়; এটি মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, মুক্ত গণমাধ্যম ও গণতান্ত্রিক পরিবেশের জন্যও গুরুতর উদ্বেগের সৃষ্টি করে। তারা হামলার ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত শনাক্ত করে গ্রেফতার এবং নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে ঘটনায় কারও দায় প্রমাণিত হলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানান। তারা আরো বলেন, হামলাটি পূর্বপরিকল্পিত ছিল কি না, এর সাথে কারা জড়িত এবং কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা মহলের ইন্ধন, সহযোগিতা কিংবা সংশ্লিষ্টতা ছিল কি না- তা নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য তদন্তের মাধ্যমে দ্রুত উদঘাটন করতে হবে।
ইবিতে চোখ বেঁধে প্রতিবাদ
ইবি সংবাদদাতা জানান, রাবিতে সাংবাদিকদের ওপর ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের হামলার প্রতিবাদে ব্যতিক্রমী প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করেছেন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকরা। চোখে কালো কাপড় বেঁধে ও হাতে বিভিন্ন প্রতিবাদী প্ল্যাকার্ড নিয়ে মানববন্ধনে দাঁড়ান তারা।
সোমবার বিকেল সাড়ে ৩টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে এ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় সাংবাদিকরা রাবিতে হামলার ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া এবং ক্যাম্পাসগুলোতে সাংবাদিকদের নিরাপদে কাজের পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবি জানান।
কর্মসূচিতে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির সভাপতি নিয়ামতুল্লাহ মুনিম, সাধারণ সম্পাদক জুয়েল রানা, প্রেস ক্লাবের সভাপতি আবির হোসেন, সাধারণ সম্পাদক নাজমুল হোসেন, রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি সাকিব আসলাম ও সাধারণ সম্পাদক রবিউল ইসলামসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে কর্মরত সাংবাদিকরা অংশ নেন।
এর আগে ইবির সাংবাদিক সংগঠনগুলোর সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক যৌথ বিবৃতিতে রাবিতে সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনায় নিন্দা জানান। একই সাথে হামলার ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত করে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িতদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানান তারা।





