রূপগঞ্জ (নারায়ণগঞ্জ) সংবাদদাতা
নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার মুড়াপাড়া ইউনিয়নের মঙ্গলখালী এলাকায় অবস্থিত ওয়াটা কেমিক্যাল কারখানা থেকে নির্গত বিষাক্ত গ্যাসে চরম স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছেন সাতটি গ্রামের অর্ধলক্ষাধিক বাসিন্দা। প্রতিনিয়ত নির্গত গ্যাসে মারা যাচ্ছে গবাদিপশু ও পুকুরের মাছ, নষ্ট হচ্ছে ঘরবাড়ির টিন ও আশপাশের ফসলি জমি। ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা থেকে কারখানাটি সরানোর দাবিতে স্থানীয় বাসিন্দারা একাধিকবার মানবববন্ধন ও বিক্ষোভ করলেও কোনো ফল মেলেনি। উল্টো প্রতিবাদ করতে গিয়ে কারখানার মালিকপক্ষের করা চাঁদাবাজি মামলার শিকার হয়েছেন স্থানীয়রা। এমন ভীতিকর পরিস্থিতির মধ্যেই ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে ওই কারখানায় আনা হয়েছে চট্টগ্রাম বন্দরে দীর্ঘ ২৪ বছর ধরে পড়ে থাকা ১৫০ দশমিক ৮৯ মেট্রিক টন বিপজ্জনক ও মেয়াদোত্তীর্ণ রাসায়নিক পদার্থ।
স্থানীয়দের অভিযোগ, গত দেড় দশক ধরে কারখানাটি কোনো রকম পরিবেশগত সুরক্ষা ছাড়াই বিষাক্ত গ্যাস নির্গত করে আসছে। বিশেষ করে রাতের আঁধারে যখন মানুষ ঘুমিয়ে পড়ে, তখন এসব কেমিক্যাল ছাড়া হয়। ২০১৭ সালের ৫ জুলাই, ২০১৯ সালের ৫ জুলাই, ২০২০ সালের ৭ জুলাই এবং ২০২২ সালের ৭ আগস্ট কারখানাটির গ্যাস ছড়িয়ে পড়ে নারী ও শিশুসহ অন্তত শতাধিক মানুষ গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। বিষাক্ত গ্যাসের প্রভাবে মঙ্গলখালী, কাটাখালী, মোকিবনগর, পাবই, ঠাকুরবাড়ীরটেক ও বানিয়াদি এলাকার মানুষ প্রতিনিয়ত শ্বাসকষ্ট, নিউমোনিয়া ও ক্যানসারের মতো জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন।
মঙ্গলখালী এলাকার বাসিন্দা সুলতানা বেগম জানান, গ্যাসে প্রায়ই এলাকার মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়ে, গাছের ফল ও ফসল মরে যায়। প্রতিবাদ করলে কারখানা কর্তৃপক্ষের লোকজন হুমকি দেয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বাসিন্দা আক্ষেপ করে বলেন, বিষাক্ত গ্যাসের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করায় কয়েক বছর আগে তারসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে দুই কোটি টাকার মিথ্যা চাঁদাবাজি মামলা দেয়া হয়। মামলার ভয়ে কেউ প্রকাশ্যে মুখ খুলতে সাহস পান না।
এই পরিবেশগত সঙ্কটের মধ্যেই গত ৩ অক্টোবর চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ১৫০ দশমিক ৮৯ টন ব্যবহার অনুপযোগী বিপজ্জনক রাসায়নিকবাহী ৯টি কনটেইনার পুলিশি পাহারায় নারায়ণগঞ্জের ওয়াটা কেমিক্যালসে পাঠানো হয়। এসব রাসায়নিকের মধ্যে ২৫ দশমিক ৫৫ টন সালফিউরিক অ্যাসিড, ৫০০ কেজি নাইট্রিক অ্যাসিড, ৯২ দশমিক ৫৪ টন মিথানল এবং ৩২ দশমিক ৩০ টন থিনার রয়েছে।
চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউজের সহকারী কমিশনার মোহাম্মদ রাসেল আহমেদ জানান, বাংলাদেশ ন্যাশনাল অথরিটি ফর কেমিক্যাল উইপনস কনভেনশনের (বিএনএসিডব্লিউসি) সুপারিশে বন্দরের নিরাপত্তা নিশ্চিত ও কনটেইনার জট কমাতে এসব রাসায়নিক পরিবেশবান্ধব উপায়ে ধ্বংসের জন্য রূপগঞ্জে পাঠানো হয়েছে।
তবে চট্টগ্রাম থেকে এসব রাসায়নিক পরিবহনের সময় গত ৪ অক্টোবর কাঁচপুর এলাকায় একটি কাভার্ডভ্যানে আগুন লাগার ঘটনা ঘটে। কাঁচপুর হাইওয়ে থানার ওসি জুয়েল মিয়া জানান, গাড়ির ইঞ্জিন থেকে আগুনের সূত্রপাত হলেও ভেতরের খালি ড্রামগুলোতে আগুন ছড়ায়নি এবং কেউ হতাহত হননি। বর্তমানে চট্টগ্রাম থেকে পাঠানো কনটেইনারগুলো কারখানায় খালাস করার প্রক্রিয়া চলছে বলে জানান কাস্টমসের সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা সোহেল আহমেদ।
বিষাক্ত গ্যাসের অভিযোগ অস্বীকার করে ওয়াটা কেমিক্যালসের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার (ডিজিএম) বাবলু দাস বলেন, পরিত্যক্ত রাসায়নিক বর্জ্য ধ্বংস করার পূর্ব অভিজ্ঞতা ও প্রয়োজনীয় ইটিপি প্ল্যান্ট আমাদের রয়েছে। এতে স্থানীয়দের স্বাস্থ্যঝুঁকির কোনো কারণ নেই। স্বার্থান্বেষী একটি মহল সুবিধা নিতে আমাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ করছে।
নারায়ণগঞ্জ পরিবেশ অধিদফতরের উপপরিচালক এ এইচ এম রাশেদ জানান, চট্টগ্রাম বন্দরের শর্ত মেনে ওয়াটা কেমিক্যালসে রাসায়নিকগুলো আনা হয়েছে এবং প্রতিনিধি দলের উপস্থিতিতে তা ধ্বংস করা হবে। রূপগঞ্জ ইউএনও এস এম আবদুল্লাহ বিন শফিক বলেন, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ পরিবেশ ও কারখানার ইটিপি পরিদর্শন করেই বিপজ্জনক রাসায়নিক ধ্বংসের অনুমতি দিয়েছে। তবে এখনো ধ্বংসের নির্দিষ্ট তারিখ নির্ধারণ করা হয়নি।





