- মোটরসাইকেল চালক থেকে কোটিপতি
- সরকারি সম্পত্তি দখল করে আবাসন নির্মাণ ও ইজারা
খুলনার কয়রা উপজেলার সুন্দরবন মোটরচালক সমবায় সমিতির সদস্য থেকে উপজেলা যুবলীগের নেতা হয়েছিলেন এস এম মাসুম বিল্লাহ। নিজেকে পরিচয় দিতেন চেয়ারম্যান ভাগ্নে পরিচয় দিয়ে দখল, চাঁদাবাজি, বালু মহাল দখল, মামলা দিয়ে হয়রানি ও সুন্দরবনে হরিণ শিকারসহ একাধিক অপরাধচক্র গড়ে তুলে হয়েছেন কোটিপতি। গত ৫ আগষ্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে স্বৈরাচার হাসিনা সরকারের পতনের পরে আত্মগোপনে চলে যান। তবে গা ঢাকা দিয়েও নিজের ফেসবুক টাইমলাইনে বর্তমান সরকারের উপদেষ্টা ও সমন্বয়কদের নিয়ে কুরুচিপূর্ণ ও উসকানিমূলক একাধিক পোস্ট দিচ্ছেন। এমনকি উপজেলা পরিষদের প্রাচীর ভেঙে নিজ বাড়ির যাতায়াতের পথ নির্মাণ করেছেন।
কয়রা উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও উপজেলা যুবলীগের সভাপতি এস এম শফিকুল ইসলাম এবং কয়রা সদর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এস এম বাহারুল ইসলামের আপন ভাগ্নে তিনি। আরেক মামা সুন্দরবন মোটরচালক সমবায় সমিতি সভাপতি খোকন মৃত্যুবরণ করলে পদটি নিজের দখলে নেন। তারপর আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি মাসুম বিল্লাহকে। সমিতির সদস্যদের নিয়ে গুন্ডা বাহিনী গঠন করে নিজেকে ডন বলে পরিচয় দিতেন। বিরোধীদলের নেতাকর্মীদের বাড়ি ও জায়গা দখল, মিথ্যা মামলা, চাঁদাবাজি, মৎস্য ঘের দখলসহ বিভিন্ন অনৈতিক কর্মকাণ্ডের মাষ্টারমাইন্ড এ মাসুম। দুই চেয়ারম্যান মামার ছত্রছায়ায় গত ১৫ বছরে এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে অঢেল সম্পত্তির মালিক হয়েছেন।
স্থানীয় দলীয় নেতাকর্মীদের মতে, ২০১৪ সালে এস এম মাসুম বিল্লাহ একজন মোটর সাইকেল চালক ছিলেন। তার মামা খোকন সুন্দরবন মোটর সাইকেল চালক সমবায় সমিতির সভাপতি থাকাকালে মৃত্যুবরণ করলে সেই পদ নিজের দখলে নেন। আরেক মামা আওয়ামী যুবলীগের সভাপতি এস এস শফিকুল ইসলাম ২০১১ সালে কয়রা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হলে তিনি সুন্দরবনের একাংশের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে অবৈধ বালুর ব্যবসা শুরু করেন। একই সাথে শ্রমিকলীগ নেতা আমিনুর রহমান, জাহাঙ্গীর ও মাষ্টার হাবিবুর রহমানের সহযোগিতায় সুন্দরবনের দস্যু বাহিনী নিয়ন্ত্রণে নিয়ে সুন্দরবনে খাল বিক্রি ও খালে অবৈধভাবে বিষ প্রয়োগে মাছ ও হরিণ শিকার সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন। ২০২৩ সালে দক্ষিণ বেদকাশী ইউনিয়নের খাল দখলকে কেন্দ্র করে যুবলীগ থেকে তাকে বহিষ্কার করা হয়।
এ ছাড়া মাসুম বিল্লাহ দুই মামার সহযোগিতায় সরকারি খাল দখল ও ভরাট করে ৪টি প্লটে আবাসন প্রকল্প গড়ে তুলেছেন। একই সাথে কয়েক বিঘা জমিতে আবাদ করে নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যক্তি বলেন, তিনি জাতীয় পার্টির স্থানীয় নেতাদের সহযোগিতায় এখনো সুন্দরবনের একাংশের নিয়ন্ত্রণ করছেন। বন বিভাগের কয়েকজন অসাধু কর্মকর্তাকে ম্যানেজ করে গভীর রাতে সুন্দরবনের বিভিন্ন চর থেকে ড্রেজার মেশিন দিয়ে বালু উত্তোলন করে বিক্রি করেন। এ কাজে তার নিজের কোটি টাকা মূল্যের বাল্কহেড ব্যবহার করে থাকেন। এ ছাড়া গত ১৫ বছর ধরে কয়রা সদরে মদিনাবাদ মৌজার বিআরএস ১৭৪৫ ও ১৭৪৭ হাল দাগের ৬ বিঘা সরকারি জমি অন্যের কাছে বার্ষিক ৭০ হাজার টাকায় ইজারা দিয়ে বড় অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন।
কয়রা সদরের বাসিন্দা কামরুল ইসলাম বলেন, আমার জমি দখল করে সেখানে বহুতল ভবন গড়ে তুলছেন। তার গুন্ডা বাহিনীর ভয়ে এখনো এলাকাবাসী কিছু বলতে সাহস পায় না।
খুলনা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থী ও কয়রা গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল কাদের বলেন, আমি একজন এতিম। ২০২১ সালে মাসুম তার বাহিনী নিয়ে আমার বাড়িঘর ভাঙচুর করে। চেয়ারম্যান ভাগ্নে হওয়ায় পুলিশ প্রশাসন কোনো সহযোগিতা করতে রাজি হয়নি। বর্তমানে আমার মা-কে নিয়ে পথে পথে ঘুরছি।
কয়রা উপজেলা পরিষদ মসজিদের ইমাম আইয়ুব আলী বলেন, উপজেলা পরিষদ মসজিদের ৩টি পুকুরের ইজারা অর্থ দিয়ে ইমাম, মুয়াজ্জিন ও খাদেমের বেতন দেয়া হয়েছে। কিন্তু ২০২২ সাল থেকে মাসুম মসজিদ ফান্ডে কোনো অর্থ জমা দেননি।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রুলি বিশ্বাস বলেন, গত ৫ আগষ্টের পর মাসুম বিল্লাহর যাতায়াত পথ বন্ধ করা হয়েছে এবং উপজেলা পরিষদের পুকুর এখন প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।





