মিয়ানমারের রাখাইনে প্রধানত মুসলিম রোহিঙ্গাদের আবাসস্থল। প্রদেশটির মংডু শহর বিদ্রোহী আরাকান আর্মির দখলে চলে যাওয়ায় বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের দুই পারে রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তাঝুঁকি বেড়েছে। তাদের সাথে আরাকান আর্মির বিরোধ আছে। এ অবস্থায় রাখাইনে থাকা পাঁচ লাখ রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশে ঠেলে দেয়া হতে পারে। এমন আশঙ্কা থেকে কক্সবাজার-বান্দরবান সীমান্তে টহল জোরদার করেছে বাংলাদেশ কোস্টগার্ড ও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)।
মিয়ানমারে অং সান সু চির নেতৃত্বাধীন নির্বাচিত সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে দেশটির নিয়ন্ত্রণ নেয় সামরিক বাহিনী। তার পর থেকেই মিয়ানমারজুড়ে অস্থিরতা চলছে। সেনা অভ্যুত্থানবিরোধী বিক্ষোভ রক্তপাতের মধ্য দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করার পর জান্তা বিরোধীরা হাতে অস্ত্র তুলে নিয়ে সশস্ত্র বিদ্রোহ শুরু করে। বাংলাদেশের সাথে সীমান্তবর্তী রাখাইন রাজ্যের মংডু শহরও শতভাগ নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী আরাকান আর্মি। এ ছাড়া রাখাইন প্রদেশের শান শহরও পুরোপুরি দখলে নিয়েছে বিদ্রোহীগোষ্ঠী। এই শান শহরেই জান্তা সরকারের আঞ্চলিক সেনা সদর দফতর ছিল। এ নিয়ে দ্বিতীয় কোনো আঞ্চলিক সামরিক দফতরের নিয়ন্ত্রণ হারাল ক্ষমতাসীন জান্তা। এর আগে গত আগস্টে শান প্রদেশের রাজধানী লাশিওতে অবস্থিত উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সামরিক কমান্ডের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছিল বিদ্রোহীরা।
উল্লেখ্য, ২০২৩ সালের নভেম্বর থেকে রাখাইনে জান্তা বাহিনীর ঘাঁটি নিশানা করে হামলা শুরু করেছিল আরাকান আর্মি। এক রোহিঙ্গা তরুণ জানান, আমি আমার বন্ধুদের সাথে যুদ্ধ করতে মিয়ানমারে গিয়েছিলাম। জান্তা বাহিনী আমাদের অস্ত্র দিয়ে প্রশিক্ষণ দিয়েছিল। আরাকান আর্মির বিরুদ্ধে চলা জান্তা বাহিনীর যুদ্ধ থেকে কৌশলে রাতের আঁধারে অন্যদের সাথে আমি পালিয়ে এসেছি। তিনি বলেন, রাখাইন প্রদেশের ১৭টি শহরের মধ্যে ১২টিরই দখল নিয়েছে আরাকান আর্মি। জান্তা সরকারের সাথে কাজ করা অনেকেই আবার গোপনে আরাকান আর্মির সাথে যোগাযোগ রেখে তথ্য ফাঁস করছেন।
এ দিকে মিয়ানমার ও বাংলাদেশের ২৭০ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত আছে। মংডু শহর দখলের সাথে সাথেই সেই ২৭০ কিলোমিটার পুরোটাই দখলে চলে গেছে আরাকান আর্মির। ফিরে আসা আরেক রোহিঙ্গা কলিম উল্লাহ জানান, বর্তমানে রাখাইন প্রদেশের সিত্তে শহরটি জান্তার দখলে রয়েছে। তবে প্রদেশের অধিকাংশের ওপর জান্তার কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। এ দিকে রাখাইন প্রদেশে এখনো প্রায় পাঁচ লাখ রোহিঙ্গা আছে বলে তিনি দাবি করেন। ওখানকার রোহিঙ্গারা এ কারণেই আপাতত জান্তাকে সমর্থন করছে। জানা যায়, উখিয়া-টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে অনেক রোহিঙ্গা দেশে ফিরে আরাকান আর্মির বিরুদ্ধে অস্ত্র তুলে নিয়েছে। আবার আরাকান আর্মিও নাফ নদের তীরে রোহিঙ্গাদের ওপর অত্যাচার চালাচ্ছে বলে অভিযোগ করেন রোহিঙ্গারা। গত কয়েক মাসে বাংলাদেশে ৮০ হাজার রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ করেছে বলে দাবি করেছে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার। এ পরিস্থিতিতে টেকনাফ প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সীমান্তে বাংলাদেশ উপকূল রক্ষীবাহিনী এবং বিজিবির নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। উখিয়া ১১ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের সোলতান আহমেদ বলেন, আমরা নাগরিক অধিকার ও নিরাপত্তা পেলেই স্বদেশে ফিরব। আরাকান আর্মির শক্তিশালী অবস্থানের বিষয়ে রোহিঙ্গা নেতা ডাক্তার জুবায়ের বলেন, মিয়ানমারের জান্তা সরকার রোহিঙ্গাদের ওপর যে গণহত্যা চালিয়েছিল আমরা তা ভুলিনি। গণহত্যার সঠিক ন্যায়বিচার ও রোহিঙ্গাদের নাগরিক অধিকার ফিরিয়ে দিলে আমরা যেকোনো সময় আমাদের দেশ মিয়ানমারে ফিরে যেতে প্রস্তুত রয়েছি। অধিকার ও নিরাপত্তা এবং মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের ব্যবস্থা হলে তবেই ফিরব দেশে।





