গাজীপুরে ছাত্রদের ডেকে নিয়ে ফাঁদে ফেলে হামলায় জড়িত মূল হোতারা এখনো গ্রেফতার না হওয়ায় নিরাপত্তাহীনতার আশঙ্কা করছেন আহত শিক্ষার্থীরা। গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দীন মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন শিক্ষার্থীরা জানান, তারা চিকিৎসা শেষে বাড়ি যেতে ভয় পাচ্ছেন। তাই তারা আপাতত হাসপাতালেই থাকতে চাচ্ছেন। বিভিন্ন সংগঠন ও জনপ্রতিনিধিরা হাসপাতালে তাদের দেখতে গেলে তারা এ আশঙ্কার কথা ব্যক্ত করেন।

আহত শিক্ষার্থীরা জানান, হামলায় নেতৃত্বদানকারী সাবেক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হকের ভাতিজা মনির মোল্লা, ভাগিনীর জামাতা চিহ্নিত সন্ত্রাসী ইব্রাহীম, ভাগিনা ইটালি বাবু, পিস্তল সুমন, ৩১ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের সভাপতি সেলিম আলদ্বীন, ৩১ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি নূরুল ইসলাম তিতুমীর, মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্মলীগের নেতা মনিরুজ্জামান মনির, রাহাপাড়া গ্রাম কমিটি আওয়ামী লীগের সভাপতি আঞ্জু, সাধারণ সম্পাদক মতিউর রহমান ওরফে ভান্ডারি মতিসহ মূল হোতারা এখনো ধরা ছোঁয়ার বাইরে।

এদিকে সোমবার আহত ছাত্রদের হাসপাতালে দেখতে যান ফ্যাসিবাদ বিরোধী তৃণমূল মঞ্চের কেন্দ্রীয় সভাপতি ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী নজরুল ইসলাম খান বিকি। তিনি সোমবার সকাল ১০টায় শহীদ তাজউদ্দীন আহমেদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসক ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলে ছাত্রদের সর্বশেষ অবস্থার খোঁজ খবর নেন। এ সময় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আহত ছাত্ররা তার কাছে নিরাপত্তহীনতার আশঙ্কা ব্যক্ত করে বলেন, মূল হোতারা এখনো গ্রেফতার না হওয়ায় তারা বাড়িতে যেতেও ভয় পাচ্ছেন। পরিবারের সদস্যরাও তাদের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত। ফলে আপাতত হাসপাতালেই তারা নিরাপদ বোধ কছেন।

ফ্যাসিবাদ বিরোধী তৃণমূল মঞ্চের কেন্দ্রীয় সভাপতি নজরুল ইসলাম খান বিকি আহত বিশাল ও সানিউল ইসলামের পাশে দাঁড়িয়ে বলেন, ঐতিহাসিক ৫ আগস্টে ছাত্র-জনতা নতুন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটিয়ে ৭১ সালের স্বাধীনতা ভারতকে ফেরত দিয়েছে। ভারত তাদের পুতুল সরকারের মাধ্যমে ইতোমধ্যে সুদে-আসলে সব নিয়ে গেছে। ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে পুতুল সরকারকেও ভারত ফেরত নিয়েছে।

তিনি বলেন, ৭১ সালে আমরা পিণ্ডি থেকে মুক্তি পেয়ে ছিলাম, ২৪ সালে দিল্লি থেকে মুক্তি পেলাম। কাজেই নতুন স্বাধীনতা, নতুন বাংলাদেশ নিয়ে ভারত ও তাদের দোসর আওয়ামী লীগের আর গর্বের কিছু নেই।

দ্বিতীয় দিনে গ্রেফতার ৯২

অপারেশন ডেভিল হান্টের দ্বিতীয় দিনে গাজীপুর মহানগরে ৭২ জন ও জেলায় ২১ জন মোট ৯২ জন গ্রেফতার হয়েছেন। গ্রেফতারদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যরা হলেন সিরাজগঞ্জের সাবেক সংসদ সদস্য চয়ন ইসলাম ও গাজীপুর মহানগর যুব মহিলা লীগের সাধারণ সম্পাদক আনোয়ারা সরকার আনু। সাবেক এমপি চয়নকে জেলার শ্রীপুর থেকে এবং যুব মহিলা লীগ নেত্রী আনুকে উত্তরা থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে। বাকি বেশির ভাগই গ্রেফতার হয়েছেন গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকা থেকে। তবে সাবেক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হকের বাড়িতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার ওপর হামলার মূল হোতারা এখনো ধরা ছোঁয়ার বাইরে।

এর আগে প্রথম দিনে গাজীপুর জেলা ও মহানগর এলাকায় অভিযান চালিয়ে আওয়ামী লীগ ও দলটির অঙ্গ সংগঠনের বিভিন্ন স্তরের ৮০ জনকে গ্রেফতার করা হয়। গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার নাজমুল করীম খান জানিয়েছেন, এই অভিযান অব্যাহত থাকবে। সাধারণ মানুষ চাচ্ছেন সন্ত্রাসী ও অপরাধীরা যে দলেরই হোক, তাদের গ্রেফতার অব্যাহত থাকুক।

পতিত ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হকের গাজীপুরের দাক্ষিণখান এলাকার বাড়িতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার ওপর হামলায় ১৮ জন আহত হন। ওই বাড়িতে ভাঙচুর ও লুটপাট হচ্ছে এমন মিথ্যা তথ্য দিয়ে ছাত্রদের সহযোগিতা চেয়ে সেখানে ডেকে নিয়ে তাদের ওপর পরিকল্পিত হামলা চালানো হয়। এ ঘটনায় পরদিন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও জাতীয় নাগরিক কমিটি হামলাকারীদের গ্রেফতারের দাবিতে গাজীপুরে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করে। সমাবেশ শেষে সন্ধ্যায় ছাত্রদের লক্ষ করে দৃবৃত্তরা গুলি বর্ষণ করলে একজন শিক্ষার্থী গুরুতর আহত হন। এ ঘটনার পর ছাত্রদের নিরাপত্তা প্রদানের দাবি জোরদার হয়। এরপরই ওই রাত থেকে শুরু হয় অপারেশন ডেভিল হান্ট। দ্বিতীয় দিনের মতো অভিযান চলে রোববার রাতে। এতে সাধারণ মানুষেরও স্বতঃস্ফূর্ত সারা মিলে। দেশের স্বার্থে, গণতন্ত্রের স্বার্থে দলমতের ঊর্ধে ওঠে এ অভিযান অব্যাহত রাখার দাবি উঠে। এ অভিযানে অংশ নেয়া আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদেরকে সাধারণ মানুষ স্বাগত জানাতেও দেখা যায়।

এদিকে চলমান অভিযানের দ্বিতীয় দিনে গাজীপুর জেলার পাঁচটি থানা থেকে সোমবার সকাল পর্যন্ত ২১ জন এবং মহানগর এলাকায় ৭২ জন গ্রেফতার হয়।

গাজীপুর মেট্রো সদর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মেহেদি হাসান জানান, অভিযানের দ্বিতীয় দিনে নগরীর ৮টি থানা এলাকা থেকে আটকদের যাচাই বাছাই শেষে ৭২ জনকে সোমবার সন্ধ্যায় আদালতের মাধ্যমে জেল হাজতে পাঠানো হয়। গত শুক্রবার আওয়ামী লীগের সাবেক মন্ত্রীর বাড়িতে কথিত হামলা ঠেকানোর কথা বলে ছাত্রদের ডেকে নিয়ে কুপিয়ে ও পিটিয়ে আহত করার ঘটনায় সদর থানায় দায়ের করা মামলায় ওই ৭২ জনকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে।

গাজীপুর জেলার পুলিশ সুপার ড. চৌধুরী মো: যাবের সাদেক জানান, অভিযানের দ্বিতীয় দিন জেলার শ্রীপুর থানা এলাকায় আত্মগোপনে থাকা সিরাজগঞ্জ-৬ আসনের আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য চয়ন ইসলামসহ জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে মোট ২১ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। সিরাজগঞ্জে চয়ন ইসলামের বিরুদ্ধে মামলা থাকায় এবং গাজীপুরে কোনো মামলা না থাকায় সেখানেই তাকে পাঠিয়ে দেয়া হচ্ছে। তিনি গ্রেফতার হওয়ার সময় ওই বাসায় থাকা তার স্ত্রীকেও থানায় আনা হয়েছিল। তাকেও সিরাজগঞ্জে পাঠিয়ে দেয়া হচ্ছে। গোয়েন্দা তৎপরতা চালিয়ে এ ধরনের আত্মগোপনকারী লোকজনসহ জেলার অপরাধীদের দ্রুত গ্রেফতার করা হবে বলে জানান তিনি।