বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটক দিয়ে প্রবেশ করতেই প্রশাসনিক ভবনের সামনে চোখে পড়ে সুসজ্জিত ও সুশোভিত মাজারটি। যে স্থানটিতে তিনি শায়িত আছেন তার চারিদিকে আছে অসংখ্য ফুল গাছ। ফুলে ফুলে ভরা মাজারটি দেখতে দিনের চেয়ে রাতে আরও বেশি সুন্দর লাগে।
এছাড়া মৃত্যুর পরপরই বিশ্ববিদ্যালয় তৎকালীন প্রশাসন তার নামেই নামকরণ করা করেছে একটি আবাসিক হল। ১৯৬৯ এর গণঅভ্যুত্থানে দেশের প্রথম বুদ্ধিজীবী শহীদ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন প্রক্টর ও রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. শামসুজ্জোহার কথা বলছিলাম।
শুধু মাজার বা স্মৃতি ফলক নয়, হলের মূল ফটকের সামনেই আছে শহীদ শামসুজ্জোহার স্মৃতির অনন্য নিদর্শন স্মৃতি ভাস্কর্য ‘স্ফুলিঙ্গ’। শামসুজ্জোহার বুক পর্যন্ত ৩ ফুট উচ্চ প্রতিকৃতি ধারণ করে আছে এই ভাস্কর্যটি। বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের শিক্ষক শিল্পী কনক কুমার পাঠক এর হস্ত নৈপূন্যের অনন্য কারুকার্য হিসাবে দাড়িয়ে আছে এটি। অধ্যাপক জোহার প্রতিকৃতি সংবলিত এই স্মৃতি স্তম্ভটি ২০১২ সালে নির্মিত হয়। দৈর্ঘ্যে ৩৮ ফুট ও প্রস্থে ২৪ ফুট ভাস্কর্যটির উচ্চতা প্রায় ১৫ ফুট। ড. জোহার স্মৃতিকে চির অম্লান করে রাখার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় মেইন গেটে তার গুলিবিদ্ধ হওয়ার স্থানটিতে নির্মাণ করা হয়েছে জোহা স্মৃতি ফলক। গণ অভ্যুত্থানে বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের শিক্ষকের আত্মত্যাগের মাধ্যমে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গৌরবগাথা ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত ধারণা দেয় তার স্মৃতি স্তম্ভগুলো।
জোহার এমন স্মৃতি স্তম্ভগুলো দেখতে প্রতিদিনই অগণিত মানুষ ক্যাম্পাসে ভিড় জমায়। বিকেল হলেই ক্যাম্পাসের শিক্ষার্থীরা ও বাহিরের লোকজন এসে জোহার কবরের পাশে বসে থাকে। কেউ সেলফি উঠে, কেউ গান গায়, কেউবা শোনে। শুধু তাই নয় সন্ধ্যা হলেই যেন আড্ডা বেশি জমে। তবে সেখানে শুধু বিনোদন ও আড্ডার কেন্দ্রস্থল হয়ে উঠেছে। তাছাড়া তার স্মৃতিগুলো অবহেলায়ও পড়ে আছে বলেও বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ বিষয়ে নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী শাহিন আলম বলেন, ‘যে উদ্দেশ্যে জোহার স্মৃতিফলক ও মাজার হয়েছিল প্রকৃতপক্ষে আমরা যথার্থ মূল্যায়ন করতে পারছিনা না। সেখানে প্রতিনিয়ত দেখছি শিক্ষার্থীরা গান গাওয়া, সেলফি উঠানো, জুতা পায়ে উঠার মতো ঘটনা ঘটছে। যা কোনভাবেই আমাদের এগুলো কাম্য নয়’।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. লুৎফর রহমান বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের এমন করাটা কোনভাবেই শোভা পায়না। বিষয়টি কেউ আমাকে জানায়নি। তবে এরকম দেখলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেব’।
উল্লেখ্য, ১৯৬৯ এর গণঅভ্যুত্থানে ১৮ই ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হাতে শহীদ হন তিনি। তাকে স্মরণ রাখতে অবশেষে স্বাধীনতার ৪৪ বছরে ২০১৫ সালের ১১ সেপ্টেম্বরে একটি স্মৃতি ফলক নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করেন সে সময়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মুহম্মদ মিজানউদ্দিন। আর স্মৃতি ফলকটি নির্মাণে রাজশাহী সদর আসনের সংসদ সদস্য ফজলে হোসেন বাদশা সরকারি বিশেষ তহবিল থেকে এক কোটি টাকা বরাদ্দ দেন।
এরপর জোহা চত্বর সংস্কারে ও স্মৃতি ফলক নির্মাণের জন্য সিন্ডিকেটে নকশার অনুমোদন দেওয়া হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি প্রকল্পের অর্থায়নে ফলক নির্মাণে প্রায় ৩০ লাখ টাকার বাজেট ধরা হয়। নকশা অনুযায়ী ফলক নির্মাণের জন্য সেখানকার গাছ কাটার সিদ্ধান্ত নেয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। কিন্তু গাছ নিধন বন্ধের নামে নির্মাণ কাজে ছাত্রলীগের সভাপতি মিজানুর রহমান রানা সেখানে গিয়ে শ্রমিকদের অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে তাঁদের গাছ কাটা বন্ধ করতে হুমকি দিয়েছিল। তবে সংস্কার কাজ শেষ হওয়ার পর ওই বছরের ৩১ ডিসেম্বর উদ্বোধন করেন উপাচার্য অধ্যাপক ড. মুহম্মদ মিজানউদ্দিন। আর ২০১৬ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি জোহা দিবসে চত্বরটির উদ্বোধন করেন তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু।
যথার্থ মূল্যায়ন হচ্ছে না জোহার স্মৃতি
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটক দিয়ে প্রবেশ করতেই প্রশাসনিক ভবনের সামনে চোখে পড়ে সুসজ্জিত ও সুশোভিত মাজারটি। যে স্থানটিতে তিনি শায়িত আছেন তার চারিদিকে আছে অসংখ্য ফুল...





