কক্সবাজারের কতুপালংয়ে রোহিঙ্গাদের কাছে মিয়ানমার সেনাদের নিষ্ঠুর নিপীড়নের বর্ণনা শুনে হৃদয় ভেঙে গেছে জাতিসংঘ মহাসচিবের। আর রোহিঙ্গাদের করুণ অবস্থা দেখে নিজেকে রোহিঙ্গাদের অবস্থানে দাঁড় করিয়ে হতবাক হয়ে পড়েন বিশ্ব ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিম। রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করতে এসে জীবনের সবচেয়ে ভয়াবহ দৃশ্যের মুখোমুখী হয়েছেন বিশ্বব্যাংক প্রেসিডেন্ট। আর রোহিঙ্গা শিশুদের মাঝে নিজ সন্তান ও নাতিদের মুখছবি ভাসতে দেখেছে জাতিসংঘ মহাসচিব। রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে এভাবে নিজেদের অনুভূতি জানান তারা।
রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে মিয়ানমারের প্রতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চাপ সন্তোষজনক নয় উল্লেখ করে জাতিসংঘের মহাসচিব এন্তোনিও গুতেরেস বলেন, নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের অধিকার নিশ্চিত করতে বিশ্ব নেতৃবৃন্দকে আরো জোরালো ভুমিকা পালন করতে হবে। অপরদিকে জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেসের এক টুইট বার্তায় তিনি বলেন, “মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশের কক্সবাজারে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের কাছ থেকে হত্যা আর ধর্ষণের আমি যে বিবরণ আমি শুনেছি সেটা অকল্পনীয়।” তিনি আরো লিখেন, “নির্যাতনের বিচার চায় রোহিঙ্গারা । তারা নিরাপদে ফিরে যেতে চায় বাড়িতে” ।
সোমবার সকাল পৌনে ৮টায় ঢাকা থেকে বাংলাদেশ বিমানের এক বিশেষ ফ্লাইটে করে বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্টকে সাথে নিয়ে কক্সবাজারের উদ্দেশে রওনা দেন। সকাল সাড়ে ৮টা নাগাদ তাঁরা কক্সবাজার বিমানবন্দরে পৌঁছান।
সেখান থেকে দুই অতিথিকে নিয়ে যাওয়া হয় কক্সবাজারের অভিজাত হোটেল সায়মান বিচ রিসোর্টে। সেখানে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী রোহিঙ্গা পরিস্থিতি সম্পর্কে তাঁদের ব্রিফিং করেন।
এরপর ৯টা ৪০ মিনিটে তাঁরা হোটেল থেকে উখিয়ার কুতুপালং ট্রানজিট ক্যাম্পের উদ্দেশে রওনা হয়। সেখানে পৌঁছে সকাল সাড়ে ১০টার দিকে তাঁরা নতুন আসা রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কথা বলেন। পরে নতুন বর্ধিত রোহিঙ্গা শিবির ক্যাম্প-৪ পরিদর্শন করেন।
এরপর জাতিসংঘের মহাসচিব ও বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট ইউএনএফপিএ পরিচালিত মহিলাবান্ধব কেন্দ্রে যান। এরপর ১০-১৫ রোহিঙ্গা নারীর কাছ থেকে শুনেন মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর নির্যাতনের বর্ণনা। এরপর ডি-৪ ক্যাম্পে জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা আইওএম পরিচালিত প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা পরিদর্শন করেন। সেখান থেকে ডি-৫ ক্যাম্পে গিয়ে নির্যাতিত রোহিঙ্গা পুরুষ ও নারীদের সঙ্গে আলাপ করেন। রোহিঙ্গাদের দুঃখ দূর্দশা, পালিয়ে আসার কারন, বর্তমান অবস্থা ও চাওয়া-পাওয়ার ব্যাপারে জানতে চান।
এ বিশ্ব নেতাকে কাছে পেয়ে আবেগ আপ্লুত হয়ে পড়ে রোহিঙ্গাদের একটি অংশ । তারা মিয়ানমারের সেনাবাহিনী কর্তৃক গণহত্যা, গণধর্ষণ, ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগ, উচ্ছেদ, অগ্নিকুন্ডে জীবন্ত নিক্ষেপ করে শিশু হত্যার মতো বর্বর ঘটনার বর্ণনা দেন । রোহিঙ্গারা বলেন, এখনো হাজার হাজার রোহিঙ্গা কিশোর ও যবককে বিনাপরাধে কারাবন্দি করে রেখেছে মিয়ানমারের প্রশাসন।
রোহিঙ্গারা তাদের উপর সংগঠিত অপরাধে জড়িত মিয়ানমারের বিচার দাবি করেন । একই সাথে নাগরিক অধিকারসহ নিরাপত্তার নিশ্চয়তা নিয়ে স্বদেশে ফেরার আকুতি জানান।
এসময় রাষ্ট্রসংঘ মহাসচিবের সাথে ছিলেন বিশ্বব্যাংকে প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিম, জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থার প্রধান ফিলিপ্পো গ্রান্ডিসহ, জাতিসংঘের জনসংখ্যা তহবিল বিষয়ক নির্বাহী পরিচালক ড. নাতালিয়া খানেম।
কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. আফরুজুল হক টুটুল বলেন, জাতিসংঘের মহাসচিব ও বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্টের আগমনকে ঘিরে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। সাদা পোশাকে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার পাশাপাশি বাড়তি তিন হাজার পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।
গত বছরের ২৪ আগস্ট রাতে মিয়ানমারের রাখাইনে সহিংসতার মুখে আশ্রয়ের জন্য বাংলাদেশে পালিয়ে আসে সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী। এর আগে বিভিন্ন সময় সে দেশের সেনাবাহিনীর দমন-পীড়নের মুখে পালিয়ে আসা আরো চার লাখের মতো রোহিঙ্গা কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়ে আছে।
জাতিসংঘ ওই অভিযানকে ‘জাতিগত নির্মূল অভিযান’ বলে আসছে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এ রোহিঙ্গা সংকটকে এশিয়ার এ অঞ্চলে সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে বড় শরণার্থী সমস্যা হিসেবে দেখা হচ্ছে। রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমার সরকার গত বছরের ২৩ নভেম্বর বাংলাদেশের সঙ্গে একটি চুক্তি সই করলেও নানা জটিলতায় বিষয়টি এগোয়নি।
উল্লেখ্য, ২০০৮ সালের ‘ইউএনএইচসিআর’-এর শীর্ষ পদে থাকা অবস্থায় জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস কক্সবাজারে রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শনে এসেছিলেন। জাতিসংঘ মহাসচিবের দায়িত্ব নেওয়ার পর বাংলাদেশে এটাই তাঁর প্রথম সফর। তবে বিশ্বব্যাংক প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিম দুই বছর আগেই একবার বাংলাদেশ ঘুরে গেছেন।
‘নির্যাতনের বিচার ও নিরাপদে বাড়ি ফিরতে চায় রোহিঙ্গারা’
কক্সবাজারের কতুপালংয়ে রোহিঙ্গাদের কাছে মিয়ানমার সেনাদের নিষ্ঠুর নিপীড়নের বর্ণনা শুনে হৃদয় ভেঙে গেছে জাতিসংঘ মহাসচিবের। আর রোহিঙ্গাদের করুণ অবস্থা দেখে নিজেকে রোহিঙ্গাদের অবস্থানে দাঁড় করিয়ে...





