ফেনী ১ ( ছাগলনাইয়া-পরশুরাম-ফুলগাজী) আসনে মহাজোটের প্রার্থী জাসদের কেন্দ্রিয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক বর্তমান এমপি শিরীন আখতারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী, ঢাকাস্থ ফেনী সমিতির সভাপতি ও হাব এর সাবেক সভাপতি শেখ আবদুল্লাহর আপেল প্রতীকের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা।
অপরদিকে, আওয়ামী লীগের মধ্যে দ্বিধাবিভক্তক্তি থাকলেও শেখ হাসিনার নৌকা প্রতীক নিয়ে নির্বাচনী মাঠে থাকার কথা জানিয়েছেন জাসদ নেত্রী শিরীন আক্তার।
শুক্রবার বিকেলে নয়া দিগন্তের প্রশ্নে জবাবে তিনি আরো বলেন, বিষয়টি তিনি জোটের উর্ধ্বতন নেতৃবৃন্দকে জানিয়েছেন। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা মহাজোট প্রার্থীর বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়ায় ভিআইপি আসন হিসেবে পরিচিত ফেনী-১ আসনে আগামী নির্বাচনে ধানের শীষ ও আপেলের দ্বিমুখী প্রতিদ্বন্ধিতার আভাস পাওয়া যাচ্ছে।
জানা গেছে, আসন্ন নির্বাচনে দেশের ভিআইপি আসন হিসেবে পরিচিত ফেনী-১ আসনে বিএনপির চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া এরশাদ সরকারের পতনের পর থেকে বিপুল ভোটের ব্যবধানে আওয়ামী লীগ প্রার্থীদের হারিয়ে চার বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন।
বিএনপি বিহীন বিগত নির্বাচনে বিনাপ্রতিদ্বন্ধিতায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন জাসদ নেত্রী শিরীন আখতার। নৌকার টিকেটে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে বিগত সময়ে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন না করাসহ বিভিন্ন অভিযোগে সভা-সমাবেশ করে জাসদ নেত্রীর বিরোধীতা করেছিল আওয়ামীলীগ।
নির্বাচনে তাকে নৌকার প্রার্থী হিসেবে মেনে না নেয়ার ঘোষণা দিয়েছিল আওয়ামী লীগ। কিন্তু আওয়ামীলীগের হেভিওয়েট প্রার্থী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাবেক প্রটোকল অফিসার আলাউদ্দিন চৌধুরী নাসিমকে টপকে নৌকার টিকেট নিয়ে আবারো মহাজোটের প্রার্থী হয়েছেন শিরীন আখতার।
নাসিমের প্রার্থীতাকে সমর্থন জানিয়ে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন দৌঁড়ে এগিয়ে থাকা ছাগলনাইয়া উপজেলা চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মেজবাউল হায়দার চৌধুরী সোহেল দলীয় মনোনয়ন কেনা থেকেই বিরত থাকেন।
আওয়ামীলীগ থেকে প্রার্থী না পাওয়ায় ফেনী-১ আসনের তিনটি উপজেলার আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা রাস্তায় আগুন জ্বালিয়ে সড়ক অবরোধ করে ব্যাপক বিক্ষোভ সমাবেশ করেছিল শিরীনের বিরুদ্ধে।
আওয়ামীলীগ নেতা শেখ আবদুল্লাহ নির্বাচনের মাঠে ব্যাপক শোড়াউন অব্যাহত রাখেন। প্রথম দিকে নৌকার পক্ষে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের অবস্থান দেখা যায়। গত ১৩ ডিসেম্বর বিকেলে ছাগলনাইয়া উপজেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক উপজেলা চেয়ারম্যান মেজবাউল হায়দার চৌধুরীর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা নৌকার সমর্থনে ছাগলনাইয়া জমাদ্দার বাজারে প্রথম বারের মতো বিশাল মিছিল সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।
পরশুরাম ও ফুলগাজীতেও নৌকার সমর্থনে পৃথক মিছিল সমাবেশ হয় । কিন্তু সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে নির্বাচনী মাঠে আওয়ামী লীগের একটি অংশ নৌকার বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে আপেলের পক্ষে মাঠে সরব হতে থাকেন।
এ নিয়ে স্থানীয় ও জাতীয়ভাবে পর্দার অন্তরালে জাসদ নেত্রী ও আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দের মধ্যে দফায় দফায় বৈঠক হলেও নৌকার পক্ষে ঐক্যবন্ধ নির্বাচন করার ব্যাপারে দু-পক্ষের মধ্যে সমঝোতা হয়নি বলে সূত্রে জানা গেছে।
এর পর থেকে ধানের শীষের মোকাবেলায় আপেল প্রতীকের পক্ষে আওয়ামীলীগের নেতাকর্মীরা প্রকাশ্যে গণসংযোগ করছেন বলে জানাগেছে। জানা গেছে, গত বৃস্পতিবার থেকে নির্বাচনী এলাকার ছাগলনাইয়া,পরশুরাম ও ফুলগাজী উপজেলার বেশিরভাগ নেতাকর্মী আপেলের পক্ষ অবস্থান নিয়ে গণসংযোগ ও কেন্দ্র কমিটি গঠনের কাজ শুরু করেছে। আওয়ামী লীগ নেতারা বলছেন, জাসদ নেত্রী শিরীন আখতারের সঙ্গে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের দুরত্ব রয়েছে,তাকে নিয়ে বিএনপির ধানের শীষের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের প্রার্থী ছাড়া বিজয়ী হওয়া সম্ভব নয় ।
অপরদিকে, ফেনী-১ আসনে বার বার নির্বাচিত দলের চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে না পারায় ধানের শীষের প্রার্থী হয়েছেন ঢাকা মহানগর (দক্ষিণ) সভাপতি রফিকুল আলম মজনু।
রফিকুল আলম মজনু নেতাকর্মীদের নিয়ে বিএনপির চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার পৈত্রিক বাড়ী ফুলগাজীর শ্রীপুরে নির্বাচনী প্রচার প্রচারণা শুরু করেন। প্রচার কর্মীদের মারধর, অফিস ভাংচুর, জোটের নেতাকর্মীদের আটক ও হয়রানির মধ্যে ব্যাপক গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। বিএনপি অধ্যুষিত এলাকা হিসেবে পরিচিত দীর্ঘদিন রাজপথে নামতে না পারলেও বর্তমানে বিএনপির হাজার হাজার নেতাকর্মীরা ধানের শীষের পক্ষে নির্বাচনী মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন। ধানের শীষের প্রার্থী মজনু বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের সকল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের নিয়ে দিন-রাত চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার প্রতিনিধি হিসেবে নিজেকে তুলে ধরে পথ সভা, উঠান বৈঠক, লিফলেট বিতরণ করে তার মুক্তির জন্য ধানের শীষের পক্ষে ভোট প্রার্থনা করতে দেখা গেছে ।
যেখানে গণসংযোগে যাচ্ছেন সেখানেই শত শত নেতাকর্মী ও ভোটারের ঢল নামছে বলে প্রার্থী মজনু সাংবাদিকদের জানিয়েছেন।
আসন্ন নির্বাচনে বিএনপি, আওয়ামীলীগ, জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ও স্বতন্ত্র প্রার্থীসহ বিভিন্ন দলের ৯ প্রার্থী এবারের নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। এছাড়াও খেলাফত আন্দোলন আনোয়ার উল্যাহ ভূঞা (বটগাছ), জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট প্রার্থী এটিএম গোলাম মাওলা চৌধুরী (সূর্য), বিএনএফ শাহরিয়ার ইকবাল (টেলিভিশন), ইসলামী আন্দোলন প্রার্থী কাজী গোলাম কিবরিয়া (হাতপাখা), ইসলামী ফ্রন্ট কাজী মাওলানা নুরুল আলম (মোমবাতি) ও এনডিএম’র তারেকুল ইসলাম (হারিকেন) প্রতীক পেয়ে নির্বাচনী মাঠে রয়েছেন।
মহাজোট প্রার্থী শিরীন আখতারের নৌকা প্রতীকের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়ার কারণ জানতে চাইলে, ফুলগাজী উপজেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক ও উপজেলা চেয়ারম্যান আবদুল আলিম জানান, দলের নেতৃবৃন্দের নির্দেশনা এবং শিরীন আখতার আওয়ামী লীগ থেকে এমপি নির্বাচিত হয়ে গত পাঁচ বছর আওয়ামী লীগের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেননি, তাই আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা তার পক্ষে মাঠে নামতে রাজি নয় ।
পরশুরাম উপজেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক ও উপজেলা চেয়ারম্যান কামাল উদ্দিন মজুমদার ফোন রিসিভ না করায় তার সঙ্গে কথা বলা যায়নি ।
ছাগলনাইয়া উপজেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি সামছুদ্দিন আহম্মদ বুল মজুমদার জানান, শিরীন আখতারকে নিয়ে ফেনী-১ আসন শেখ হাসিনাকে উপহার দেয়া সম্ভব নয়, তাই বিকল্প প্রার্থী হিসেবে স্বতন্ত্র প্রার্থী আওয়ামী লীগের শেখ আবদুল্লার পক্ষে নেতাকর্মীরা মাঠে নেমেছেন ।









