দেশে সম্প্রতি অর্থনীতির প্রাণশক্তি রেমিট্যান্স প্রবাহ আকস্মিকভাবে বেড়ে গেছে। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো মোবাইল পেমেন্ট ব্যবহার করায় চ্যানেলে রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়েছে। সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে দেশে সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স এসেছে এক হাজার ৬৪০ কোটি ডলার (১৬.৪০ বিলিয়ন), যা আগের অর্থবছরের চেয়ে ৯ দশমিক ৪৭ শতাংশ বেশি।
ব্যাংকগুলো বিদেশ থেকে রেমিট্যান্স সংগ্রহ করে তাৎক্ষণিক পার্টনার এমএফএস বিশেষ করে বিকাশের মাধ্যমে গ্রহীতাদের কাছে রেমিট্যান্স পৌঁছে দিচ্ছে। এর ফলে প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলের গ্রাহকরাও সঠিক সময় ও কম খরচে রেমিট্যান্সের অর্থ হাতে পাচ্ছেন। সরকারের প্রণোদনা, স্থিতিশীল মুদ্রা বিনিময় হার নীতি ও মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) অংশীদারত্বের ভিত্তিতে ব্যাংকগুলোর আন্তরিক সেবাই রেমিট্যান্স প্রবাহ আকস্মিক বেড়ে যাওয়ার কারণ বলে মনে করা হচ্ছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুসারে, সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে দেশে সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স এসেছে। এর পরিমাণ এক হাজার ৬৪০ কোটি (১৬.৪০ বিলিয়ন) ডলার। এই রেমিট্যান্স প্রবাহ ২০১৭-১৮ অর্থবছরের চেয়ে ৯ দশমিক ৪৭ শতাংশ বেশি। গ্রহীতাদের হাতে রেমিট্যান্স পৌঁছে দিতে মোবাইল ব্যাংকিং চ্যানেলকে সহায়তা করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সরকারি চ্যানেলে অর্থ পাঠানোর জন্য প্রবাসী শ্রমিকদের আকৃষ্ট করতে ডলার বিক্রির ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ হার অব্যাহত রয়েছে। ইতোমধ্যে গত মে মাসে আগের মাসের তুলনায় মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) চ্যানেলে রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়ে ৭৪ শতাংশ হয়েছে। বিকাশের মাধ্যমে বেশ কিছু ব্যাণিজ্যিক ব্যাংক তাদের অংশীদারদের সহায়তায় বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের গ্রাহকদের মধ্যে রেমিট্যান্স পৌঁছে দিচ্ছে। বিকাশ হলো গোটা দেশের মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের (এমএফএস) সবচেয়ে বড় জোগানদাতা।
দেশে অবস্থানরত প্রিয়জনদের কাছে দ্রুত ও নিরাপদ সহযোগিতামূলক রেমিট্যান্স পাঠানোর উপায় হিসেবে এমএফএসকে বেছে নিয়েছে বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশী শ্রমিকরা। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে অবস্থানরত প্রবাসী শ্রমিকদের আত্মীয়স্বজন বিদেশী মুদ্রাকে তাৎক্ষণিক নগদ টাকায় পরিণত করে তা তুলতে পারছেন। বর্তমানে বিকাশ ছয়টি ব্যাংকের সাথে অংশীদারত্বের ভিত্তিতে (পার্টনারশিপ) রেমিট্যান্স সরবরাহ করছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক কর্মকর্তা জানান, জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত ব্র্যাক ব্যাংক, এমটিবি ও ব্যাংক এশিয়া ৫১ হাজার ৯৯৫টি লেনদেনের মাধ্যমে ৩২ কোটি ৭৫ লাখ টাকা সরবরাহ করেছে। জুনে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো ২৪ কোটি পাঁচ লাখ টাকা সংগ্রহ করে বিকাশের সাহায্যে ৩৮ হাজার ৩৫১ লেনদেনের মাধ্যমে গ্রাহকদের কাছে পৌঁছে দিয়েছে। ৫৬টি ব্যাংকের মধ্যে মাত্র ১৭টি ব্যাংক নিজস্ব এমএফএস সার্ভিসের মাধ্যমে সুবিধাভোগীদের কাছে তাৎক্ষণিক টাকা পাঠাতে পারছে। বিকাশের গ্রাহক সংখ্যা এখন সবচেয়ে বেশি। এর গ্রাহক সংখ্যা প্রায় তিন কোটি (৩০ মিলিয়ন)।
বিকাশ লিমিটেডের চিফ অব এক্সটার্নাল অ্যাফেয়ার্স মেজর জেনারেল (অব:) শেখ মো: মনিরুল ইসলাম বলেন, সম্প্রতি বিকাশের মাধ্যমে আমরা বিপুল রেমিট্যান্স সংগ্রহ করে গ্রাহকদের মধ্যে পৌঁছে দিয়েছি। এ ক্ষেত্রে আইনগত সহায়তার জন্য তিনি বাংলাদেশ ব্যাংককে ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, সুবিধাভোগী বিকাশ অ্যাকাউন্ট হোল্ডারদের কাছে তাৎক্ষণিক রেমিট্যান্স পৌঁছে দিতে আমাদের অনেকগুলো পার্টনার ব্যাংক আছে।
কিভাবে প্রক্রিয়াটি দ্রুত ও নিরাপদ রেমিট্যান্স সরবরাহ নিশ্চিত করছেÑ এমন প্রশ্নের জবাবে মনিরুল ইসলাম বলেন, প্রথমে প্রবাসী শ্রমিকরা দেশে অবস্থানরত গ্রাহকের সঠিক নাম ও বিকাশের অ্যাকাউন্ট নাম্বার দেন। এরপর পার্টনার ব্যাংকের অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে বিদেশী রেমিট্যান্স গ্রহণ করে তা জাতীয় মুদ্রা বিনিময়ের (ন্যাশনাল এক্সচেকার) মাধ্যমে স্থানীয় মুদ্রায় পরিণত করে তা বিকাশের ওয়ালেটে রাখা হয়। এরপর ডিজিটাল মানি (টাকা) নগদ অর্থে পরিণত করে সুবিধাভোগী গ্রহীতারা তা নিজেদের প্রয়োজনে ব্যবহার করছেন। বিল পরিশোধে, কাউকে অর্থ পাঠাতে, মোবাইল ফোন রিচার্জ করতে এবং রেজিস্টার্ড বিকাশের মার্চেন্টদের কাছ থেকে তারা যেকোনো পণ্য কিনতে পারছেন।
ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব সানফ্রান্সিসকোর এক গবেষণায় দেখানো হয়েছে, রেমিট্যান্স পাঠানোর ক্ষেত্রে উচ্চ খরচ এবং দেরিতে গ্রাহকদের কাছে টাকা পাঠানো বাংলাদেশে রেমিট্যান্স প্রবাহ প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। রেমিট্যান্স পাঠানোর ফি ১.৫ শতাংশে (প্রিপেইড কার্ড ট্রাঞ্জেকশন) কমাতে পারলে বাংলাদেশে এ ক্ষেত্রে অর্থবহ অর্জন সম্ভব।
এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা বলেন, এমএফএসের মতো নতুন প্রযুক্তির ব্যবহারে রেমিট্যান্স পাঠানোর খরচ কমানো যেতে পারে। ডিস্ট্রিবিউটেড লেজার টেকনোলজি (ডিএলটি) ব্যবহারের মাধ্যমেও মাথাপিছু ব্যয় হ্রাস পেতে পারে। পার্টনারশিপের ভিত্তিতে টাকা তাৎক্ষণিক সরবরাহের মাধ্যমে আরো বেশি রেমিট্যান্স পাঠাতে প্রবাসী শ্রমিকদের উৎসাহিত করা হচ্ছে। এ জন্য বাংলাদেশে এমএফএস ইন্ডাস্ট্রিজের দ্রুত বিকাশে সুযোগ-সুবিধার সব দরজা খুলে দেয়া হয়েছে। এমএফএস অনেক উন্নয়নশীল দেশে সরকারি চ্যানেলের মাধ্যমে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়াচ্ছে। রেমিট্যান্স গ্রহীতাদের কাছে নিরাপদ, দ্রুত ও নির্ভরশীল সেবা হিসেবে এমএফএস জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, মোবাইল টেকনোলজির আবির্ভাবের মাধ্যমে ব্যাংকের কার্যপদ্ধতি ও অর্থ প্রদানের পদ্ধতির প্রসার ঘটছে। এজেন্ডার ব্যাপক (আর্থিক) প্রসারে মোবাইল পেমেন্ট সুবিধা নিচ্ছে অনেক নিয়ন্ত্রক। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক পেছনে পড়ে থাকবে না।