সমাপনী পরীক্ষা বর্জনের ঘোষণা থেকে সরকারি প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষকরা সরে আসায় সব মহলে স্বস্তি বিরাজ করছে। শিক্ষকদের পরীক্ষা বর্জনের ঘোষণা নিয়ে জটিল পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল।
রাষ্ট্রের কর্মচারী হয়ে দাবি আদায়ের জন্য শিক্ষকদের স্কুলে কর্মবিরতি পালনের কারণে অধিদফতর থেকে তাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের গুরুতর অভিযোগ আনা হয় লিখিতভাবে। শিক্ষকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দিয়ে চিঠি পাঠানো হয় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে। এরপর আবার দাবি আদায়ের জন্য সমাপনী পরীক্ষা বর্জনের হুমকির পরিপ্রেক্ষিতে হাইস্কুলের শিক্ষকদের মাধ্যমে পরীক্ষা গ্রহণের ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য চিঠি জারি করা হয় অধিদফতর থেকে। এ নিয়ে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়, অধিদফতর ও শিক্ষকদের মধ্যে একটি অস্বস্তিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। শেষ পর্যন্ত প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব মো: আকরাম আল হোসেনের সাথে গত বৃহস্পতিবার শিক্ষক নেতৃবৃন্দের বৈঠকের পর গত শুক্রবার শিক্ষকরা পরীক্ষা বর্জনের ঘোষণা থেকে সরে আসার কথা জানান। এতে করে স্বস্তি ফিরে এসেছে সব মহলে। বিশেষ করে প্রায় ৩০ লাখ পরীক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকরা এ নিয়ে গভীর উৎকণ্ঠায় ছিল। সঠিক সময় সঠিকভাবে পরীক্ষা হবে কি না এ নিয়ে তারা অস্থিরতার মধ্যে ছিল। পড়ালেখার বিঘœ হচ্ছিল শিশুদের। অভিভাবকরা ছিল দোটানায়।
সরকারি প্রাইমারি স্কুলের প্রধান শিক্ষকদের বেতন দশম গ্রেডে ও সরকারি শিক্ষকদের বেতন ১১তম গ্রেডে বাস্তবায়নের দাবিতে আন্দোলন কর্মসূচি পালন করে আসছিলেন শিক্ষকরা। ১৩ অক্টোবর থেকে তারা ক্লাস বর্জন কর্মসূচি শুরু করেন। সরকারি কর্মচারী হয়ে এভাবে কর্মবিরতি পালনের জন্য শিক্ষকদের বিরুদ্ধে সরকারি শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগ আনা হয়েছে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতর থেকে। শিক্ষকদের এ কর্মবিরতিকে শৃঙ্খলা ভঙ্গ এবং ২০১৮ বিধিমালা পরিপন্থী আখ্যায়িত করে আন্দোলনরত শিক্ষকদের বিরুদ্ধে বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সারা দেশের সকল বিভাগীয় উপপরিচালক বরাবর চিঠি দেয়া হয়েছে। এভাবে শিক্ষকদের আন্দোলন পরিস্থিতি ক্রমে অস্বস্তিকর পর্যায়ে চলে যেতে থাকে। শিক্ষকদেরও অনেকে অস্বস্তিতে পড়েন এ আন্দোলন নিয়ে।
সরকারি প্রাইমারি স্কুলে বর্তমানে প্রধান শিক্ষক জাতীয় বেতন স্কেলে ১১তম গ্রেড ও সহকারী শিক্ষকরা ১৪তম গ্রেডে বেতন পান। তাদের মধ্যে বেতনের ব্যবধান তিন ধাপ। এটি কমিয়ে প্রধান শিক্ষকদের দশম গ্রেড ও সহকারী শিক্ষকদের বেতন ১১তম গ্রেডে করার জন্য শিক্ষকরা দাবি জানিয়ে আসছেন।
সরকারি প্রাইমারি স্কুলে সহকারী ও প্রধান শিক্ষকদের মধ্যে বেতনের বৈষম্য নিয়ে দীর্ঘ দিন ধরে ক্ষোভ ও অসন্তোষ বিরাজ করছে শিক্ষকদের মধ্যে। ২০১৪ সালে প্রধান শিক্ষকদের পদমর্যাদা দ্বিতীয় শ্রেণীতে উন্নীত করা হয়েছে এবং তাদের বেতন পাওয়ার কথা দশম গ্রেডে। কিন্তু আজো তারা বেতন পান ১১তম গ্রেডে।
অপর দিকে প্রধান শিক্ষকদের বেতন দশম গ্রেডে কার্যকর হলে সহকারী শিক্ষকদের সাথে প্রধান শিক্ষকদের বর্তমান বেতন বৈষম্য তিন ধাপ থেকে চার ধাপে পৌঁছবে যদি একই সাথে সহকারী শিক্ষকদের বেতন গ্রেডও পরিবর্তন করা না হয়।
এ বৈষম্য দূর করার জন্য সারা দেশের সহকারী শিক্ষকরা দীর্ঘ দিন ধরে আন্দোলন করে আসছন।
শিক্ষকদের দীর্ঘ দিনের আন্দোলন ও দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সর্বশেষ গত জুলাই মাসে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে প্রধান শিক্ষকদের বেতন দশম গ্রেড ও সহকারী শিক্ষকদের বেতন ১২তম গ্রেডে উন্নীত করার প্রস্তাব পাঠানো হলে অর্থ মন্ত্রণালয় তা প্রত্যাখ্যান করে।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এ প্রস্তাব নিয়েও শিক্ষকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। অনেকে এ প্রস্তাবের বিপক্ষে আবার অনেকে রয়েছেন পক্ষে।
এর কারণ ১১তম গ্রেডে সরকারি প্রাইমারি স্কুলে সহকারী প্রধান শিক্ষক নিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। অনেক শিক্ষকের মতে, এটি হলে সহকারী শিক্ষকদের প্রধান শিক্ষক হওয়ার পথে আরেকটি বাধা সৃষ্টি হবে। আবার অনেকের মতে, এটি হলে অনেক সহকারী শিক্ষক যাদের প্রধান শিক্ষক হওয়ার সম্ভাবনা নেই তারা সহকারী প্রধান শিক্ষক হতে পারবেন।
সারা দেশে বর্তমানে সরকারি প্রাইমারি স্কুল রয়েছে ৬৫ হাজার ৯৯টি।