সন্ধ্যা নেমে আসার সাথে সাথে রাজধানীর পশ্চিমাঞ্চলের বাসিন্দাদের মধ্যে এক অজানা ভয় ও আতঙ্ক। ছড়িয়ে পড়ে। পথে চলতে গিয়ে পথচারীর মনে ছিনতাই ও অপহরণ আতঙ্ক। বাসা-বাড়ির বাসিন্দা ভুগছেন ডাকাত আতঙ্কে। আর দিনে নতুন বাড়ির মালিক ও ব্যবসায়ীরা ভুগেন চাঁদাবাজদের আতঙ্কে। রাজধানীর পশ্চিমাঞ্চল তথা মোহাম্মদপুর ও আশপাশের বাসিন্দাদের মধ্যে বেশ কিছুদিন ধরে চলছে এমন আতঙ্ক। আর এ আতঙ্কের নাম ‘গাঙচিল বাহিনী’। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতার কারণে দীর্ঘ দিন গা ঢাকা দেয়া এই সন্ত্রাসী বাহিনী আবারো তৎপরতা শুরু করেছে।
জানা গেছে, মোহাম্মদপুরের ঢাকা উদ্যান, নবীনগর হাউজিং, চন্দ্রিমা হাউজিং, তুরাগ হাউজিং, একতা হাউজিং ও আশপাশের এলাকার বাসিন্দারা গাঙচিল বাহিনীর অত্যাচারে অতিষ্ঠ। পাশাপাশি এই বাহিনী বুড়িগঙ্গা নদী ও তুরাগ নদীতে ট্রলার ও জাহাজ আটকিয়ে করছে ছিনতাই-ডাকাতি। তাদের ভয়ে কেউ মুখ খুলতে সাহস পান না। গাঙচিল বাহিনীর সদস্যরা চুরি-ছিনতাই, ডাকাতি, মাদক ব্যবসা, জমি দখল, অপহরণ, চাঁদাবাজি করছে। সাধারণ মানুষ অসহায়। মুখ খুলতে গেলেই শিকার হচ্ছে হামলার।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, এলাকার কুখ্যাত সন্ত্রাসী লম্বু মোশারফের নেতৃত্বে চলছে গাঙচিল বাহিনী। তার নির্দেশেই এলাকায় কয়েকটি গ্রুপে বিভক্ত হয়ে ছিনতাই, জমি দখল ও চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ হচ্ছে। এর মধ্যে মাদক ব্যবসা ও মোটরসাইকেলে করে ছিনতাই করে রুবেল গ্রুপ, কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণ করে তারই ভাগিনা নাঈম গ্রুপ। হাউজিং এলাকার চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করে জুম্মন গ্রুপ। আবার কোনো বাড়িতে কাজ করতে গেলেই চাঁদা দিতে হচ্ছে জুম্মন গ্রুপকে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, রাজধানীর গাবতলী থেকে মোহাম্মদপুর পর্যন্ত বেশ কয়েকটি গ্রুপ সন্ধ্যার পর থেকে চুরি-ছিনতাই এবং ডাকাতির সাথে জড়িত। এই গ্রুপগুলো দিনে ভূমি দখল এবং চাঁদাবাজি করে থাকে। আর সন্ধ্যার পর থেকে আদাবরের সুনিবিড় হাউজিং এলাকার বেড়ি বাঁধে সাইনেস্ট গার্মেন্টের সামনে থেকে শুরু করে শ্যামলী হাউজিংয়ের ৬ নম্বর রোডে দ্বিতীয় প্রকল্প, তুরাগ হাউজিং, একতা হাউজিং ১ ও ২, নবীনগর হাউজিং, ঢাকা উদ্যান, চন্দ্রিমা মডেল টাউন এলাকার বিভিন্ন রাস্তায় চুরি-ছিনতাই ও ডাকাতি করে। এ ছাড়া প্রতিদিন এই বাহিনীর ইভটিজিংয়ের শিকার হন কিশোরী, নারী পথচারী, গৃহিণী মহিলারা। অনেকেই জোরপূর্বক ধর্ষণের শিকার হচ্ছেন তাদের হাতে। মান-সম্মানের ভয়ে কেউ মুখ খুলছেন না।
এলাকাবাসী জানান, গাঙচিল বাহিনীর সেকেন্ড-ইন কমান্ড মোহাম্মদপুরের দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী লম্বু মোশারফ। সে কাফরুল থানার পিন্টু গ্রুপের সদস্য। সেখানে ২০০০ সালে চুরি-ছিনতাই দিয়ে তার উত্থান শুরু হয়। ওই এলাকায় একাধিক মামলা থাকায় আত্মগোপন করে ঘাঁটি গড়ে তুলে মোহাম্মদপুরে। নতুন করে গড়ে তুলে সন্ত্রাসী বাহিনী। তার নেতৃত্বে মোহাম্মদপুর এলাকায় জুম্মন, আদাবরের রুবেল, মাদকবিরোধী অভিযানে র্যাবের সাথে বন্দুক যুদ্ধে নিহত মোহাম্মদপুর-আদাবরের আলোচিত মাদক ব্যবসায়ী ফালু মিয়ার ছেলে রবিন, নাঈম, শামীম, রাফাত, জসিম, রিয়াজ, মোস্তফা, সাগর ওরফে বিলাই চোখ সাগর, নাসির, ইমন, ইব্রাহীম, হৃদয়, লিখন, মুনসুরাবাদের মাদক ব্যবসায়ী রাকিব, ময়লা মোশারফসহ ২৫-৩০ জনের একটি দল। গাঙচিল বাহিনীর সেকেন্ড ইন কমান্ড লম্বু মোশারফ আগ্নেয়াস্ত্রসহ তার সদস্যরা দেশীয় অস্ত্র নিয়ে রাতে অপারেশনে বের হয়। এলাকাবাসী জানান, পুলিশের তৎপরতা শুরু হলে লম্বু মোশারফ ঢাকা উদ্যানের বুড়িগঙ্গা নদীর ওপারে সাভার থানা এলাকায় বিভিন্ন হাউজিংয়ে আত্মগোপন করে। নদীর এপার থেকে ওপারে লোকজন অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায় করে। আর তার সহযোগী জুম্মন সব অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের ছক তৈরি করে তাদের বাহিনীর লম্বু মোশারফকে জানায়। এরপর লম্বু মোশারফ গাঙচিল বাহিনীর অন্য সদস্যদের নির্দেশ দেয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন ইটভাটার মালিক জানান, গাঙচিল বাহিনীকে প্রতি মাসে চাঁদা দিতে হয়। চাঁদা দিতে একটু দেরি হলেই লম্বু মোশারফ তার বাহিনী নিয়ে এসে রাতের আঁধারে সিকিউরিটিকে বেঁধে মারধর করে ট্রলার ভরে ইট নিয়ে চলে যায়। এতে বাধ্য হয়ে গাঙচিল বাহিনীকে চাঁদা দিতে হচ্ছে। এলাকা সূত্র জানায়, গাঙচিল বাহিনীর সদস্যরা গত ২৪ আগস্ট মোহাম্মদপুরের তুরাগ হাউজিংয়ের বাসিন্দা আবদুর রহিমের বাসার ম্যানেজারের স্ত্রীকে জোরপূর্বক ধর্ষণের চেষ্টা চালায়। বাধা দেয়ায় ম্যানেজার ও বাড়িওয়ালা দু’জনের ওপরই হামলা চালিয়ে আহত করে গাঙচিল বাহিনী। তাদের বাঁচাতে এগিয়ে আসেন আদাবর থানার ১০০ নম্বর ওয়ার্ড স্বেচ্ছাসেবক লীগের যুগ্ম আহ্বায়ক শাহীন মুন্না, ওয়ার্ড যুবলীগ নেতা সোহেল এবং গার্মেন্টকর্মী ইউসুফ। সন্ত্রাসীরা তাদের ওপরও হামলা চালায়। রামদা-চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে মুন্না ও সোহেলকে গুরুতর আহত করে। খবর পেয়ে মোহাম্মদপুর থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে ছুটে যায়। এ সময় গাঙচিল বাহিনীর সেকেন্ড ইন কমান্ড লম্বু মোশারফের নেতৃত্বে রামদা-চাপাতি নিয়ে পুলিশের ওপরও হামলা চালায় গাঙচিল বাহিনীর সন্ত্রাসীরা। মোহাম্মদপুর থানার এসআই সজীব কোচকে চাপাতি দিয়ে কোপ দেয়। এতে তিনি আহত হন। পরে সেখানে অতিরিক্ত পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছলে গাঙচিল বাহিনীর সন্ত্রাসীরা পালিয়ে যায়। পরে ব্যবসায়ী আবদুর রহিম, স্বেচ্ছাসেবকলীগ নেতা শাহীন মুন্না, যুবলীগ নেতা সোহেল ও আহত এসআই সজীব কোচকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায়। বর্তমানে ঢামেক হাসপাতালে স্বেচ্ছাসেবকলীগের নেতা শাহীন মুন্না ও পঙ্গু হাসপাতালে সোহেল চিকিৎসাধীন রয়েছেন। গত ২৫ আগস্ট মোহাম্মদপুর থানায় এসআই সজীব কোচ ও আহত আবদুর রহিম বাদি হয়ে ওই সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন।
পুলিশ জানায়, ওই সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় একাধিক মামলা রয়েছে। তারা বিভিন্ন ধরনের অপরাধের সাথে জড়িত। তাদের মধ্যে কয়েকজন গ্রেফতার হয়েছে। অন্যদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।
জানা যায়, গত ২৮ আগস্ট গাঙচিল বাহিনী বছিলা গার্ডেন সিটির শাওনকে অপহরণ করে। পরে তাকে মারধর করে ১০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে। খবর পেয়ে পুলিশ অপহৃত শাওনকে উদ্ধার করে। ২৫ ও ২৮ আগস্টের ঘটনায় গাঙচিল বাহিনীর কয়েকজন সদস্য পুলিশের হাতে আটক হলেও লম্বু মোশারফকে গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ। এ ব্যাপারে মোহাম্মদপুর থানার ওসি আবদুল লতিফ জানান, পুলিশ এ ঘটনায় বেশ কয়েকজনকে গ্রেফতার করেছে। অন্যদের ধরতে অভিযান চলছে।
দিনে চাঁদাবাজি, রাতে ডাকাতি-ছিনতাই-অপহরণ
রাজধানীতে আবারো তৎপর গাঙচিল বাহিনী
সন্ধ্যা নেমে আসার সাথে সাথে রাজধানীর পশ্চিমাঞ্চলের বাসিন্দাদের মধ্যে এক অজানা ভয় ও আতঙ্ক। ছড়িয়ে পড়ে। পথে চলতে গিয়ে পথচারীর মনে ছিনতাই ও অপহরণ আতঙ্ক।...





