সন্ত্রাসীদের অত্যাচার, নির্যাতন ও ভয়ে বগুড়ার শাজাহানপুর উপজেলার মাথাইল চাপড় গ্রাম পুরুষশূন্য হয়ে পড়েছে। রাতের আঁধারে দেশীয় অস্ত্র হাতে পাড়ার অলিগলিতে মহড়া দিচ্ছে সন্ত্রাসীরা। এ অবস্থায় বাড়িতে স্ত্রী ও অবুঝ শিশু সন্তানরা চরম অসহায় হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে। শুধু তা-ই নয়, বাড়িতে স্বামী না থাকার সুযোগে ঘরে ঢুকে নারীদের ভয়ভীতি ও শ্লীলতাহানির চেষ্টা করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। বুধবার এসব তথ্য জানান ওই এলাকার ভুক্তভোগী নারী ও বয়োবৃদ্ধরা। এসব ঘটনায় শাজাহানপুর থানা ও জেলা প্রশাসক বরাবরে অভিযোগ দায়ের করা হলেও কোনো প্রতিকার পাচ্ছেন না বলে তারা জানান। তথ্য সংগ্রহকালে এসব নারীদের ছেলে-মেয়ে ও স্বামীকে পাওয়া যায়নি। জীবনের ভয়ে তারা সকলেই পলাতক রয়েছেন এবং সন্ত্রাসীদের জিম্বী দশা থেকে মুক্তি ও সন্তানদের ফিরে পেতে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
গ্রামবাসীর অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, শাজাহানপুর উপজেলার রানীরহাট এলাকার সন্ত্রাসী হজরতের ছত্র ছায়ায় স্থানীয় সাগর বাহিনীর সদস্য সন্ত্রাসী মনির হোসেন, ইউসুফ হোসেন, ইস্রাফিল হোসেন, পিন্টু মিয়াসহ তাদের সহযোগীরা পুরো মাথাইল চাপড় গ্রাম সহ আশপাশে আধিপত্য গড়ে তুলেছে। আধিপত্য বিস্তার কেন্দ্র করে ৪ এপ্রিল এলাকায় খুন হয় ইউসুফ প্রামাণিকের ছেলে বিদেশফেরত আবু বকর সিদ্দিক (২৩)। এ ঘটনাকে পুঁজি করে বাণিজ্যে নামে সন্ত্রাসী বাহিনী। হত্যা মামলার আসামি করার ভয় দেখিয়ে তারা এলাকায় চাঁদাবাজি শুরু করে। একপর্যায়ে চাঁদার টাকা দিতে না পারায় সেই মামলায় ওই গ্রামের ফিরোজ খানের দুই সন্তান পারভেজ (২০) ও রাসেলকে (১৮) আসামি করে। ঘটনার ধারাবাহিকতায় বুধবার রাতে দেশীয় ধারালো অস্ত্রসহ তাদের বাড়িতে হামলা চালিয়ে দরজা-জানালা ভাঙচুর করে। এভাবে প্রায় রাতেই সন্ত্রাসীরা দেশীয় অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে পাড়ার ভেতরে মহড়া দেয় এবং মোড়ে মোড়ে মাদক সেবন করে। এলাকার এসব ঘটনা তুলে ধরে রাসেলের মা চায়না বেগম শাজাহানপুর থানা, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও বগুড়া জেলা প্রশাসক বরাবরে প্রতিকার চেয়ে অভিযোগ করেন।
অভিযোগে আরো জানা যায়, ওই হত্যা মামলায় ফাঁসানোর ভয় দেখিয়ে এই বাহিনী শাবরুল বাজারে কাপড় ব্যবসায়ী আবদুস সালামের কাছ থেকে ২০ হাজার টাকা, শফিকুল ড্রাইভারের কাছ থেকে এক লাখ টাকা চাঁদা নেয়। শাবরুল ছোট হিন্দু পাড়া গ্রামের পরিমলের ছেলে নাপিত সুমনের কাছে তিন লাখ টাকা দাবি করে। পরে তা দিতে না পারায় নাপিত সুমনকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যায়। গরু, ছাগল ও স্বর্ণালঙ্কার বিক্রি করে ৭০ হাজার টাকা দিয়ে ছেলেকে ছাড়িয়ে আনেন সুমনের বাবা পরিমল চন্দ্র। পরে ভয়ে সুমন তার ছোট ভাই গৌরাঙ্গ, স্ত্রী ও চার বছরের সন্তানকে নিয়ে গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে যায়। তবে সম্প্রতি পুলিশি সহযোগিতায় তারা গ্রামে ফিরে এলেও সন্ত্রাসীদের নেয়া সেই টাকা এখনো উদ্ধার হয়নি। ওই গ্রামের সহিদুল ইসলামের স্ত্রী ফেরদৌসি খাতুন কেঁদে কেঁদে বলেন, ঘরে স্বামী না থাকায় কয়েক দিন আগের এক রাতে সন্ত্রাসীরা তার ঘরে প্রবেশ করে অশালীন আচরণ করে। দুই মাস আগে রশিদুলের ছেলে অসুস্থ নান্নু মিয়াকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলে সন্ত্রাসীরা সেই ডাক্তারকেই মারধর করে। এ ব্যাপারে অভিযুক্ত হজরতের সাথে একাধিকবার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।
ভুক্তভোগী নারীরা জানান, রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় পালিত এই সন্ত্রাসীদের ভয়ে তাদের স্বামী ও ছেলেরা সাত মাস ধরে বাড়িতে আসতে পারছে না। সন্তানের মুখ দেখতে পারছেন না। সন্ত্রাসীদের ভয়ে কেউ মুখ খোলার সাহসও পাচ্ছে না।
এ বিষয়ে শাজাহানপুর থানার ওসি আজিম উদ্দীনের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, অভিযোগ পেয়েছি। তবে তদন্তসাপেক্ষে আইনানুগ ব্যাবস্থা গ্রহন করা হবে।
বগুড়া জেলা প্রশাসক জিয়াউল হকের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিষয়টি জানা নেই। তবে অভিযোগ পেলে আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে।





