এলাকার মুসল্লিদের আপত্তি ও বাধা উপেক্ষা করে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে জোরপূর্বক ইমামতি করার গুরুতর অভিযোগ পাওয়া গেছে। গাজীপুর মহানগরের ২৫ নম্বর ওয়ার্ডের ভুরুলিয়া আদর্শপাড়া জামে মসজিদের ক্ষুব্ধ মুসল্লিরা বর্তমানে অন্যত্র নামাজ পড়ছেন। মসজিদের দান-অনুদানের টাকা আত্মসাতের ঘটনায় মামলা হওয়ার পরও রাজনৈতিক প্রভাবে বহাল তবিয়তে আছেন আলোচিত ইমাম নাজমুল হুদা (৩০)।
এলাকার মুসল্লিরা অভিযোগ করেন, সাবেক কমিটির সাধারণ সম্পাদক গোলাম মহিউদ্দিন কাজল, কোষাধ্যক্ষ মোস্তাকুর রহমান চৌধুরী তুলন ও ইমাম নাজমুল হুদা যোগসাজশ করে মসজিদের প্রায় ২৪ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেন। এ ঘটনায় সদর থানায় মামলা হয়। তারা বছরের পর বছর আয়-ব্যয়ের কোনো হিসাব না দিয়ে চরম স্বেচ্ছাচারিতার মাধ্যমে মসজিদটিকে ব্যবহার করছেন। ইমাম নাজমুল হুদা মসজিদে নিজের পরিবারের সদস্যদের বসবাসের সুযোগ দিয়ে এবং সাবেক কমিটির সাধারণ সম্পাদক গোলাম মহিউদ্দিন কাজল জালিয়াতির মাধ্যমে নিজেকে মুতাওয়াল্লি দাবি করে মসজিদটিকে পারিবারিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছেন। তারা মসজিদের টাকায় নিজস্ব ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন।
অবশেষে আদালতের নির্দেশে গত ১৯ আগস্ট গাজীপুর সদর থানায় তাদের বিরুদ্ধে ২৩ লাখ ৬১ হাজার টাকা আত্মসাতের সুনির্দিষ্ট অভিযোগে একটি মামলা হয়। মামলা হওয়ার পর ইমাম পালিয়ে যান। এরপর মুসল্লিদের সম্মতিতে মুয়াজ্জিন হাফেজ মো: আবু তাহের ভারপ্রাপ্ত ইমাম হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। ইতোমধ্যে মুসল্লিদের পক্ষে উচ্চ আদালতে পৃথক একটি রিট মোকদ্দমার পরিপ্রেক্ষিতে উচ্চ আদালত সাবেক কমিটির সাধারণ সম্পাদক গোলাম মহিউদ্দিন কাজলসহ সংশ্লিষ্ট ছয়জনকে কারণ দর্শানোর জন্য রুলনিশি ইস্যু এবং একইসাথে মসজিদটিতে স্ট্যাটাসকো (বর্তমান অবস্থা) বজায় রাখার নির্দেশ প্রদান করেন। কিন্তু ইমাম নাজমুল হুদা উচ্চ আদালত থেকে আগাম জামিন লাভ করে প্রায় দুই মাস পর উচ্চ আদালতের স্ট্যাটাসকো অমান্য করে এবং মুসল্লিদের চরম আপত্তি উপেক্ষা করে রাজনৈতিক প্রভাবে ভারপ্রাপ্ত ইমাম হাফেজ আবু তাহেরকে সরিয়ে জোরপূর্বক ইমামতি শুরু করলে মুসল্লিদের মধ্যে উত্তেজনা ও ক্ষোভ দেখা দেয়। এ ঘটনার পর থেকে মসজিদ এলাকার মুসল্লিরা তাদের প্রতিষ্ঠিত মসজিদ ত্যাগ করে দূরবর্তী মসজিদে গিয়ে প্রায় এক মাস ধরে নামাজ আদায় করছেন।
মসজিদের প্রতিষ্ঠাকালীন সাধারণ সম্পাদক মরহুম আলহাজ আব্দুর রহিমের ছেলে ডুয়েট কর্মকর্তা খায়রুল ইসলাম মাসুম বলেন, ‘মসজিদ ঘেঁষেই আমাদের বাড়ি। আমার বাবা এই মসজিদের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। অথচ রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে দুর্নীতিবাজ ও বিভিন্ন কারণে বিতর্কিত ইমাম এখনো মসজিদে বহাল তবিয়তে থাকায় আমাদেরকে অন্যত্র গিয়ে নামাজ পড়তে হচ্ছে।’ মসজিদের পাশের অপর বাড়ির মালিক আলহাজ আবুল কাশেম লম্ভরী বলেন, ‘আমি আগে থেকেই এই ইমামের পেছনে নামাজ পড়তে আপত্তি জানিয়ে আসছি। ইমাম তার মাদাকাসক্ত ভাইকে মসজিদ কক্ষে বসবাস করতে দিয়ে মসজিদের পরিবেশ নষ্ট করেছেন। আয়-ব্যয়ের কোনো হিসাব নেই। দান-অনুদানের টাকা কখনো মসজিদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা করেন না। প্রতি জুমায় প্রাপ্ত অনুদানের টাকারও কোনো কোনো হদিস থাকে না। মসজিদের পাশের আরেক বাড়ির মালিক ও মসজিদটির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা আলহাজ ফজলুল হক জানান, নাজমুল হুদার ইমামতি করার কোনো যোগ্যতা নেই। তিনি কখনো নিজেকে ‘হাফেজ’ আবার কখনো ‘মুফতি’ দাবি করলেও এ পর্যন্ত অ্যাকাডেমিক সনদ দেখাতে পারেন নাই। তৎকালীন কমিটির সভাপতির আত্মীয় হওয়ার সুবাদে ইন্টারভিউ ছাড়াই তাকে মৌখিকভাবে ইমামতি করার দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল।
মসজিদ পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব মো: দেলোয়ার হোসেন জানান, তার এক আবেদনের প্রেক্ষিতে জটিলতা নিরসনকল্পে গঠিত জেলা কমিটি দুইবার দুই ধরনের প্রতিবেদন দেয়। এতে জটিলতা আরো বৃদ্ধি পায়। তাই তিনি মসজিদটিতে বিদ্যমান জটিলতা স্থায়ীভাবে নিরসনের জন্য হাইকোর্টে রিট (৪২১৮/২০২০) করেন। অপর দিকে মসজিদের অনুদানের টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ইমামসহ কমিটির সাবেক দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সদর থানায় মামলা (৪২(৮)২০২০) করেন। কিন্তু ইমামসহ মামলার আসামিরা রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে ও বহিরাগত মাস্তান দিয়ে ভয়ভীতি দেখিয়ে তার কমিটিকে দায়িত্ব পালনে বাধা দিচ্ছে। এ দিকে ইমাম নাজমুল হুদার সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘মসজিদের কমিটি নিয়ে বিরোধ রয়েছে। যারা কমিটিতে আসতে পারেননি তারাই আমার বিরোধিতা করছেন। তারা ছাড়া বাকি সবাই আমার পেছনে নামাজ পড়েন।’
এ ব্যাপারে গাজীপুর মেট্রো সদর থানার ওসি মুহাম্মদ আলমগীর ভূঞা অভিযোগের সত্যতা স্বীকার করে বলেন, মসজিদের কমিটি নিয়ে বিরোধ রয়েছে। দুই পক্ষকেই তাদের রেকর্ডপত্রাদি জমা দিতে বলা হয়েছে। একপক্ষ জমা দিয়েছে অপরপক্ষ এখনো দেয়নি। উভয়পক্ষের কাগজপত্র পর্যালোচনা করে আমরা পরবর্তী ব্যবস্থা নেবো। আপাতত মুয়াজ্জিন অথবা তৃতীয় একজনকে ইমামতির দায়িত্ব পালনের জন্য বলা হয়েছিল।