ময়মনসিংহের ভালুকায় লাইসেন্সবিহীন ১৬টি ইটভাটা নিয়মনীতির কোনো তোয়াক্কা করছে না। পরিবেশ অধিদফতরের ছাড়পত্র ছাড়াই স্থানীয় প্রশাসনকে ম্যানেজ করে এসব ইটভাটায় দেদারসে কাঠ পোড়ানো হচ্ছে। ফলে আবাসিক ও ফসলি জমিতে গড়ে ওঠা এসব ইটভাটার কালো ধোঁয়ায় একদিকে যেমন ফসলি জমির মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে, অন্য দিকে বনাঞ্চল উজাড় হয়ে হুমকির মুখে পড়েছে পরিবেশ। ভালুকা সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানেরই রয়েছে পরিবেশের ছাড়পত্র ও লাইসেন্সবিহীন দু’টি ইটভাটা।
ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপনে (নিয়ন্ত্রণ) আইন ২০১৩ (যা ১ জুলাই ২০১৪ থেকে কার্যকর) এ বলা হয়, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও উন্নয়নের স্বার্থে আধুনিক প্রযুক্তির ইটভাটা অর্থাৎ জিগজ্যাগ ক্লিন, হাইব্রিড হফম্যান ক্লিন, ভার্টিক্যাল শফট ক্লিন, টানেল ক্লিন বা অনুরূপ উন্নততর কোনো প্রযুক্তির ইটভাটা স্থাপন করতে হবে। তা ছাড়া আবাসিক, জনবসতি, সংরক্ষিত এলাকার বনভূমি ও গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় ইটভাটা করা যাবে না এবং সরকারি বনাঞ্চলের সীমারেখা থেকে দুই কিলোমিটার দূরত্বে ভাটা স্থাপন করতে হবে। পরিবেশ অধিদফতর থেকে ছাড়পত্র, জেলা প্রশাসকের অনুমোদন বা লাইসেন্স না নিয়ে ইটভাটা চালু করা যাবে না। আর এই আইন অমান্য করলে ১০ বছরের কারাদণ্ড ও ১০ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে।
আর এসব ইটভাটা তদারকি করার জন্য উপজেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার বিধান থাকলেও স্থানীয় বনবিভাগ তাদের রহস্যজনক নীরবতার কারণে ভালুকার বেশির ভাগ ইটভাটা মালিক এসব আইনের কোনো তোয়াক্কা করছে না। তারা সংশ্লিষ্টদের ম্যানেজ করে দেদার তাদের অবৈধ কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। ফলে আশপাশের এলাকার আবাদি জমির ঊর্বরতা হ্রাসসহ বিভিন্ন প্রজাতির ফলদ, বনজ গাছপালাসহ প্রাকৃতিক পরিবেশ হুমকির মুখে পড়েছে।
সরেজমিন উপজেলার ধরিয়া পলাশতলী গ্রামে গিয়ে দেখা গেছে, পলাশতলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের উত্তরপাশ ঘেঁষে তিনটি ইটভাটা। হুমায়ূন কবির খানের আল সাফা, আনিছুর রহমানের রিফাত ব্রিক্স ও জালালউদ্দিন, ধলিয়া গ্রামে অবস্থিত দুলু চৌধুরীর মির্জা ব্রিক্স, উপজেলার মেদুয়ারী গ্রামে সিদ্দিকুর রহমান ও আনিছুজ্জামানের স্টার ব্রিক্স, মেদিলা গ্রামে ইউপি চেয়ারম্যান শিহাব আমীন খানের দু’টি লাইসেন্সবিহীন ইটভাটাসহ ১৬টি ইটভাটার প্রায় সব ক’টির চারপাশে মজুদ করে রাখা হয়েছে শত শত মণ লাকড়ি। চিমনী দিয়ে প্রচণ্ড বেগে বের হচ্ছে কালো ধোঁয়া।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, খারুয়ালী, ধলিয়া, মেদীলা, মেদুয়ারী, ভাণ্ডাব, বিরুনীয়া, রাংচাপড়া, শান্তিগঞ্জ, চান্দরাটি এবং ভালুকা উপজেলার সীমান্তবর্তী উরাহাটি গ্রামে মনু মিয়া এমএমআর ও পাশের শ্রীপুর উপজেলার সীমান্তবর্তী ধামলই গ্রামে সুরুজ মিয়ার টিএলআর ব্রিক্সসহ বিভিন্ন এলাকায় ১৬টি ইটভাটা রয়েছে। এসব ইটভাটার দুই-একটি ছাড়া কোনোটিরই লাইসেন্স হালনাগাদ করা নেই। অভিযোগ রয়েছে, বেশির ভাগ ইটভাটায় শিশু ও নারী শ্রমিক দিয়ে কাজ করানো হয়ে থাকে এমনকি ইট তৈরিতে ছয় থেকে সাত ধরনের ডাইস ব্যবহার করা হয় এবং ইটের সাইজ ছোট-বড় করে প্রতিনিয়তই ক্রেতাদের সাথে প্রতারণা করা হয়ে থাকে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক ইটভাটা মালিক জানান, ভালুকার কোনো ভাটারই লাইসেন্স নেই। কিভাবে চলে প্রশ্ন করা হলে তিনি জানান, স্থানীয় প্রশাসন, জেলা প্রশাসক ও বনবিভাগ থেকে শুরু করে প্রতিটি সেক্টর ম্যানেজ করেই ভাটা পরিচালনা করা হয়ে থাকে। আর এসব ম্যানেজ করে থাকেন উপজেলা ইটভাটা মালিক সমিতির সভাপতি আফজাল হোসেন মণ্ডল।
আল সাফা ব্রিক্সের মালিক হুমায়ন কবির খান জানান, প্রতিটি ইটভাটা থেকে ভাটা মালিক সমিতির সভাপতি ও সেক্রেটারিকে ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা দেয়া হয় এবং সার্বিক দিক দেখভাল করার জন্য তাদের ওপরই দায়িত্ব দেয়া হয়েছে।
উপজেলা ইটভাটা মালিক সমিতির সভাপতি আফজাল হোসেন মণ্ডল জানান, ভালুকায় পরিচালিত ইটভাটাগুলোর অধিকাংশেরই লাইসেন্স বা পরিবেশের ছাড়পত্র নেই। সার্বিকদিক ম্যানেজ করেই বরাবর যেভাবে চালানো হয়ে থাকে, এ বছরও সেভাবেই ভাটাগুলো পারিচালিত হয়ে আসছে।
পরিবেশ অধিদফতর ময়মনসিংহের পরিচালক ফরিদ আহমেদ জানান, এই অফিসে ভালুকার ২৯টি ইটভাটার তালিকা রয়েছে। তার মধ্যে চলতি বছর একটি মাত্র ইটভাটার ছাড়পত্র দেয়া হয়েছে। আর ছাড়পত্রহীন ওই সব ভাটা অবৈধভাবেই পরিচালিত হচ্ছে। তিনি বলেন, ইতোমধ্যে জেলার ত্রিশাল, গফরগাঁওসহ বিভিন্ন উপজেলায় অভিযান চালানো হয়েছে। ভালুকায় যেসব ইটভাটার পরিবেশের ছাড়পত্র নেই অভিযানের মাধ্যমে তাদের বিরুদ্ধে অচিরেই ব্যবস্থা নেয়া হবে।
ভালুকা রেঞ্জের রেঞ্জ কর্মকর্তা মোজাম্মেল হোসেন জানান, প্রজ্ঞাপনে বনবিভাগ জেলা কমিটির সদস্য মাত্র। তার অফিসে এ সংক্রান্ত কোনো তালিকা নেই বা কোনো চিঠিও আসেনি। তবে ভাটায় লাকড়ি পোড়ানোর ব্যাপারে কোনো লিখিত অভিযোগ পেলে অভিযানের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
এ ব্যাপারে জানতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সালমা খাতুনের সরকারি মোবাইল নম্বরে বারবার চেষ্টা করলেও তিনি ফোন রিসিভ না করায় বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।





