ময়মনসিংহের ভালুকায় এক্সপেরিয়েন্স টেক্সটাইল মিলের বিষাক্ত বর্জ্যরে কারণে প্রায় এক যুগ ধরে ছয় গ্রামের ১৬ বিলে কৃষকদের প্রায় দুই হাজার একর জমি অনাবাদি পড়ে আছে। ফলে এই জমির মালিক কৃষকরা প্রতি বছরে কয়েক হাজার টন ধান উৎপাদন থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। উপজেলার ভরাডোবা গ্রামে অবস্থিত ওই মিলের বর্জ্যমিশ্রিত দূষিত পানি নিঃসরণ বন্ধের দাবিতে ইতোমধ্যে মানববন্ধন, মহাসড়ক অবরোধ, ইউএনও অফিস ঘেরাও, বিক্ষোভ ও প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি দিয়েও কোনো প্রতিকার পাননি কৃষকরা।
সরেজমিন ঘুরে ও স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা যায়, ভরাডোবা ও বিরুনীয়া ইউনিয়নের কাহাচূড়া বিল, হাউড্ডা বিল, খুরুলিয়া বিল, সাধুয়া বিল, ভালুকজানি বিল, গায়লা বিল, তালতলা বিল, কেচুরগোনা বিল, তেইরা বিল, শিমুলিয়া বিল, সাউত্তার কুড়ি, তৌরা বিল, ডিমাইল বিল, মলেঙ্গা বিল, বালিপাথর বিল, কাইল্লানির পাথরের প্রায় দুই হাজার একর জমিতে মিলের দূষিত পানির কারণে এক যুগ ধরে কৃষকরা তাদের জমিতে ধান লাগাতে পারছেন না। সারা বছরই বিলগুলোতে দূষিত পানি আটকে থাকে। দীর্ঘ দিন যাবৎ ধান রোপণ না করতে পারার কারণে সবগুলো বিল কচুরিপানায় ভরে গেছে। এতে করে দু’টি ইউনিয়নের ছয়টি গ্রামের কৃষকরা প্রতি মৌসুমে কয়েক হাজার একর জমির বোরো ধান উৎপাদন থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এ ছাড়া এসব বিলে সারা বছর প্রচুর মাছ পাওয়া যেত; কিন্তু মিলের বিষাক্ত কালো পানির কারণে এখন আর কোনো মাছ নেই। এমনকি বিলের পানিতে নামলে আশপাশে বসবাসরত মানুষের শরীরে বিভিন্ন রোগের সৃষ্টি হচ্ছে। জমিতে দীর্ঘ দিন ধরে কালো পানি জমে থাকায় মাটির উপরে আলকাতরার মতো স্তর জমে গেছে। তা ছাড়া আশপাশের এলাকার বসবাসরত মানুষের বাড়ির টিউবওয়েলের পানিতেও কটু গন্ধ বের হয়।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মিলের দূষিত পানি নিঃসরণ বন্ধের দাবিতে এলাকাবাসী বেশ কয়েক দফায় ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক অবরোধ করেছেন। পরে স্থানীয় সংসদ সদস্য, উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও ওসির দেয়া সমাধানের আশ্বাসে কৃষকরা অবরোধ তুলে নেন। বেশ কয়েক বছর আগে পরিবেশ অধিদফতরের একটি দল সরেজমিন পরিদর্শন করে নানা অভিযোগ এনে মিল কর্তৃপক্ষকে তাৎক্ষণিক কারখানা বন্ধের নির্দেশ দিয়ে দুই কোটি ২৪ লাখ ৬৪ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ ধার্য করে। তারা ইটিপি ত্রুটিমুক্ত না হওয়া পর্যন্ত মিল বন্ধ রাখতে নির্দেশ এবং গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করে দেয়। কিন্তু কিছু দিন বন্ধ রাখার পর রহস্যজনক কারণে আবার মিলটি চালু হলে ফের দূষিত পানির জলাবদ্ধতায় ফসলহানি শুরু হয়।
মিল কর্তৃপক্ষ ভরাডোবা থেকে ভালুকা থানার মোড় পর্যন্ত প্রায় পাঁচ কিলোমিটার লম্বা একটি পাইপ লাইন অপরিকল্পিতভাবে স্থাপনের মাধ্যমে খিরু নদীতে বর্জ্যরে লাইন স্থাপন করলেও পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন স্থানে পাইপ লাইনটি ভেঙে যায়। এর ফলে ঠিক মতো বর্জ্য পানি খিরু নদীতে না নেমে আশপাশের আরো কয়েকটি এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। এতে ওই এলাকাগুলোও ফসলহানিতে পড়ে। বর্তমানে খিরু নদীতে বর্জ্য ফেলানোর পাইপটি একেবারেই অকার্যকর হয়ে পড়েছে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) ভালুকা আঞ্চলিক শাখার সদস্যসচিব কামরুল হাসান পাঠান কামাল বলেন, মিলটির দূষিত বর্জ্যরে কারণে প্রায় এক যুগ ধরে ওই এলাকার কৃষরা কোনো ফসল ফলাতে পারছেন না। বিষাক্ত পানির কারণে জলাশয়ে কোনো মাছ নেই। ফসল ও জীববৈচিত্র্যের এত ক্ষতিসাধনের পরও কিভাবে কারখানাটি চলমান রয়েছে তা আমাদের বোধগম্য নয়।
স্থানীয় কৃষক ও শ্রমীকলীগ নেতা ইব্রাহিম খলিল জানান, আমরা দীর্ঘ ১০ বছর ধরে এক মণ ধানও বাড়িতে নিতে পারছি না। আমার বাবার পাঁচ একর জমি থাকার পরও আমাদের চাল কিনে খেতে হয়। এ থেকে পরিত্রাণ পেতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সদয় দৃষ্টি কামনা করছি।
স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান শাহ আলম তরফদার জানান, ফ্যাক্টরিটি আমার ইউনিয়নবাসীকে ধ্বংস করে ফেলেছে। আমি পরিবেশ অধিদফতরে একাধিকবার সশরীরে লিখিত অভিযোগ দিয়েছি; কিন্তু কোনো প্রতিকার পাইনি।
এ ব্যাপারে এক্সপেরিয়েন্স মিলের অ্যাডমিন ম্যানেজার সাইফ আহাম্মেদের কাছে জানতে তার মোবাইল নম্বরে বারবার ফোন দিলেও তিনি রিসিভ না করায় তার বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সালমা খাতুন জানান, তিনি এলাকাটি সরেজমিনে পরিদর্শন করেছেন। কৃষকদের ফসলহানির চিত্র সংশ্লিষ্ট দফতরে জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ফসলহানির বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলে যথাযথ আইনি ব্যবস্থা নেবেন।
পরিবেশ অধিদফতর ময়মনসিংহের পরিচালক ফরিদ আহম্মেদ বলেন, কারখানাটির পরিবেশ ছাড়পত্র নেই। এ দিকে মিল কর্তৃপক্ষ সব দফতরকে ম্যানেজ করে কারখানা চালাচ্ছে এমন অভিযোগের ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এমন কোনো প্রমাণ কেউ দিতে পারবে না। তবে বিষয়টি খুব গুরুত্ব সহকারে দেখবেন বলে তিনি জানান।





