ময়মনসিংহের ভালুকা পৌর এলাকায় শেফার্ড ও গ্লোরী ডায়িং ফ্যাক্টরিসহ উপজেলার বিভিন্ন স্থানে গড়ে ওঠা শতাধিক কারখানার বিষাক্ত বর্জ্য ও বালু ব্যবসায়ীদের তাণ্ডবে ঐতিহ্যবাহী খিরু নদী নাব্যতা হারিয়ে সরু খালে পরিণত হয়েছে। এতে প্রায় ২৫ কিলোমিটার নদীপাড়ের সেচনির্ভর হাজার হাজার একর আমন ও বোরো জমির আবাদ ব্যাহত হচ্ছে। মিল-ফ্যাক্টরির দূষিত বর্জ্য নদী-খাল-বিলে ফেলায় এলাকার মানুষ পেটের পীড়া ও চর্মরোগসহ নানা ব্যাধিতে আক্রান্ত হওয়ায় জনস্বাস্থ্য ও প্রাকৃতিক পরিবেশ হুমকির মুখে পড়েছে।
নদীপাড়ের লোকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, ৯০ দশকের আগ পর্যন্ত ঐতিহ্যবাহী খিরু নদীটি ছিল নাব্যতায় পরিপূর্ণ। এই নদী দিয়ে বড় বড় বজরা নৌকা এমনকি বিশাল আকারের লঞ্চ চলাচল করত। এলাকার হাজার হাজার লোক এই নদীতে মাছ শিকার করে তাদের পরিবার-পরিজন নিয়ে সংসার চালাত। আশপাশের কয়েক এলাকার জনসাধারণের চলাচলের একমাত্র বাহন ছিল খিরু নদীতে নৌকার যান। ভাটি এলাকার শ্রীপুর উপজেলার বরমী বাজার থেকে এ এলাকার ব্যবসায়ীরা পণ্য কিনে এই নদী দিয়ে নৌকার মাধ্যমে পরিবহন করে এলাকার চাহিদা মিটিয়ে আসছিল। কিন্তু ৯০ দশকের পর থেকে ভালুকার বিভিন্ন এলাকায় মিলকারখানা গড়ে ওঠার পর থেকে কারখানার বিষাক্ত বর্জ্য ও পলি জমে ঐতিহ্যবাহী খিরু নদীটি ভরাট হতে শুরু করে। বর্তমানে এ অঞ্চলে অর্ধশতাধিক ডায়িং ফ্যাক্টরির বিষাক্ত বর্র্জ্য এই খিরু নদীতে এসে পড়ছে। তা ছাড়া বেশ কয়েক বছর ধরে প্রভাবশালী ব্যক্তিরা নদীর দু’পাড়ে বালু স্তূপাকারে রেখে ব্যবসা করার কারণেও নদীটি ভরাট হচ্ছে।
ভালুকার খিরু ব্রিজের দক্ষিণ পাড়ে প্রায় ১৫ বছর আগে গড়ে ওঠা শেফার্ড গ্রুপের শেফার্ড ডায়িং ফ্যাক্টরির বিষাক্ত বর্জ্যে দূষিত হতে শুরু করে খিরু নদীর পানি। আর সম্প্রতি পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ড খারুয়ালী গ্রামের গজারী খালপাড়ে গড়ে ওঠা গ্লোরী ডায়িংয়ে বর্জ্য শোধন যন্ত্র থাকলেও তা শুধুই যে লোক দেখানো, তা এখন সবারই জানা। পরিবেশ অধিদফতরের অসাধু লোকদের সাথে ফ্যাক্টরি কর্তৃপক্ষের সুসম্পর্ক থাকায় কারখানার বিষাক্ত বর্জ্য খিরু নদীতে ফেলতে কোনো সমস্যা হচ্ছে না। তারা সরাসরি মোটা পাইপের মাধ্যমে বর্জ্য খিরু নদীতে ফেললেও সংশ্লিষ্ট দফতরের লোকজন যেন দেখেও না দেখার ভান করে। আর এসব ব্যাপারে এলাকার কেউ প্রতিবাদ করলে মিথ্যা মামলা ও বিভিন্ন ধরনের ভয়ভীতি দেখানোর ঘটনাও রয়েছে। এভাবে চলছে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় গড়ে ওঠা অর্ধশতাধিক ডায়িং ফ্যাক্টরি। উপজেলার কাঁঠালী গ্রামে অবস্থিত আরটি ডায়িং ফ্যাক্টরির ইটিপি প্ল্যান্টের ড্রেনগুলো শুকিয়ে চৌচির হয়ে থাকলেও পরিবেশ অধিদফতর ছাড়পত্র দিয়েছে ইটিপি কার্যক্রম সচল বলে।
তা ছাড়া উপজেলার হবিরবাড়ি, ভরাডোবা, মেদুয়ারী ও মল্লিকবাড়ী ইউনিয়নে শতাধিক ডায়িং, ক্যামিক্যাল ও কীটনাশকের ফ্যাক্টরি রয়েছে, যা থেকে নির্গত বিষাক্ত কালো বর্জ্য লাউতি খালসহ বিভিন্ন খাল-বিল হয়ে প্রতিনিয়ত খিরু নদীতে পড়ছে। বেশ কিছু ফ্যাক্টরিতে ইটিপি থাকা সত্ত্বেও তা বন্ধ থাকে বলে এলাকার লোকজন জানায়। ছোট ছোট খাল দিয়ে বর্জ্য পানি নামায় মাটি পুড়ে কালো বর্ণ হয়ে গেছে। এ ছাড়া কিছু কিছু এলাকায় যেমন ভরাডোবা গ্রামে কয়েকটি মিলের দূষিত বর্জ্য ভূগর্ভের পানির স্তরে মিশে যাওয়ায় টিউবওয়েলের পানির সাথে প্রায় বিষাক্ত ময়লা পানি বের হচ্ছে। যে পানি খেয়ে ওই গ্রামে অসংখ্য মানুষ ডায়রিয়া ও চর্মরোগসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।
এ দিকে বেশ কয়েক বছর ধরে এলাকার কতিপয় বালু ব্যবসায়ী বর্ষা এলেই শত শত ট্রলার দিয়ে ব্রহ্মপুত্র ও শীতলক্ষ্যা নদী থেকে বালু আমদানি করে। আর সেই বালু উত্তোলন করে রাখা হয় ভালুকা থানা সংলগ্ন নদীর চড়াসহ খিরু ব্রিজের উভয় পাড়ে। এসব বালু পাহাড়ের মতো স্তূপীকৃত করে রাখা হয়। আস্তে আস্তে এই বালু নদীতে নেমে ভরাট হয়ে নাব্যতা হারিয়ে ফেলছে। এতে সেচকাজ ব্যাহত হওয়ায় কৃষকরা চাষাবাদে বেকায়দায় পড়ছেন। অথচ স্থানীয় প্রশাসন এর প্রতিকারে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে না।
ভালুকা শেফার্ড গ্রুপের ডিজিএম মোখলেছুর রহমান জানান, তারা সার্বক্ষণিক ইটিপি প্ল্যান্ট চালু রেখে কাজ করছেন। তিনি আরো জানান, তাদের রয়েছে বায়োলজিক্যাল ইটিপি। ফলে মিলের বর্জ্যরে কারণে নদীর পানি নষ্ট হওয়ার কোনো কারণ নেই।
গ্লোরী ডায়িং মিলের জেনারেল ম্যানেজার আফছার উদ্দিন ও প্রজেক্ট ম্যানেজার অনিক দাস জানান, তাদের ফ্যাক্টরিটি এখানো পুরোপুরি চালু হয়নি। আপাতত ৫০০ শ্রমিক দিয়ে কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। পরীক্ষমূলকভাবে ইটিপিও পরিচালিত হচ্ছে। কিছু দিনের মধ্যেই সার্বিকভাবে ফ্যাক্টরিটির উৎপাদন কার্যক্রম চালু হবে বলে তারা জানান।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নার্গিস আক্তার জানান, ডায়িং মিল থেকে র্নিগত গাঢ় বর্জ্য পানিতে অ্যামোনিয়া বেশি থাকে অর্থাৎ ইউরিয়ার পরিমাণ অত্যধিক থাকে। যে কারণে ধানগাছ খুব তাড়াতাড়ি বেড়ে যায়, আর তাতে পাতাপচা রোগ বিস্তার হয়ে ফলন নষ্ট হয়। এ ছাড়া ফ্যাক্টরি থেকে নির্গত বর্জ্য পানিতে কেমিক্যাল ও ধাতব পদার্থ থাকে, যা গাছের খাদ্য হিসেবে ধানে মিশে যায় আর ওই ধানের চাল ভাত হিসেবে খেলে তা মানবদেহের ক্ষতি করে। কারখানার বর্জ্য মিশ্রিত পানি খাল-বিল-নদী-নালায় ফেলা বন্ধ করা প্রয়োজন বলে তিনি মন্তব্য করেন।।
উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম পিন্টু জানান, কারখানার বিষাক্ত বর্জ্যরে কারণে খিরু নদী ভরাটের পাশাপাশি প্রাকৃতিক পরিবেশ মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুস্থভাবে বেঁচে থাকার জন্য এখনই এ ব্যাপারে কঠোর পদক্ষেপ নেয়া দরকার এবং আমি এ ব্যাপারে সবসময়ই বিভিন্ন ভূমিকা পালন করে আসছি।
উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আবুল কালাম আজাদ জানান, মিলকারখানার বিষাক্ত ধোঁয়া ও দূষিত বর্জ্যরে কারণে যেভাবে পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে তাতে ভালুকার পরিবেশ রক্ষায় নাগরিক আন্দোলন গড়ে তোলা প্রয়োজন। তা ছাড়া উপজেলা পরিষদের পক্ষ থেকে সবসময়ই বিভিন্ন ধরনের পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সালমা খাতুন জানান, উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় গড়ে ওঠা মিলকারখানার বিষাক্ত বর্জ্য খিরু নদীসহ আশপাশ এলাকার খাল-বিল বা জলাশয়ে পড়ে তা অসহনীয়ভাবে পরিবেশ দূষণ ঘটাচ্ছে। এ ব্যাপারে প্রশাসনের পক্ষ থেকে ইতোমধ্যে বিভিন্ন ধরনের পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। পরিবেশ রক্ষায় যা যা করণীয় উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তা করা হবে।
ভালুকায় শতাধিক মিলের বর্জ্যে খিরু নদী মরা খাল
ময়মনসিংহের ভালুকা পৌর এলাকায় শেফার্ড ও গ্লোরী ডায়িং ফ্যাক্টরিসহ উপজেলার বিভিন্ন স্থানে গড়ে ওঠা শতাধিক কারখানার বিষাক্ত বর্জ্য ও বালু ব্যবসায়ীদের তাণ্ডবে ঐতিহ্যবাহী খিরু নদী...





