নিজের নাম নাছিমা, বাবা মায়ের নাম ও ঠিকানা কি তাও তিনি জানেন না। দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে এভাবেই বড় হয়েছে তিনি। নাম ও পরিচয় হারিয়ে যাওয়া টাঙ্গাইলের মধুপুরের ওই নারী দুই যুগ পর ফিরে পেয়েছেন নিজের পরিচয়। ফিরে পেয়েছেন আপন মাকেও।

মনোয়ার হোসেন নামের এক তরুণের মাধ্যমে ওই নারী নিজের নাম ও পরিচয় ফিরে পেয়েছেন।

সময়টা ১৯৯৭ সাল। বড় ভাই (বৈমাত্রেয়) কাজের কথা বলে ঢাকায় নিয়ে এক বাসায় রেখে চলে আসেন। বাবার তৃতীয় ঘরের সন্তান হিসেবে ছোট সময়েই বাবা হারা হয় শিশু নাছিমা। বিধবা মা সংসার ছেড়ে চলে যাওয়ায় অন্য ঘরের ভাই বোনদের সাথে সংসারের বোঝা হিসেবেই তার স্থান হয় রাজধানীর অচেনা রাজপথের ওই বাসায়।

বয়স আর কত হবে? সাত কি আট বছর। মন টেকেনি কোনোভাবেই। কয়েক দিন না যেতেই বাসার বাইরে আসতে হয়। ক্ষণিকের মুক্ত পরিবেশে বুকভরা শ্বাস নিতে ভালোই লাগছিল। কিন্তু নির্ধারিত ওই বাসায় ফেরার সুযোগ আর হয়নি তার। খুঁজতে খুঁজতে হারিয়ে ফেলে নিজেকে। নিজের অবস্থানকে মাতুয়াইল এলাকা থেকে তাকে নিয়ে যান এক নারী। দুই ছেলে ও এক মেয়ের সাথে ডলি নামে আদর-যত্নে বড় করেন মেয়েটিকে।
নতুন বাবা-মায়ের আদর পেলেও প্রকৃত বাবা মায়ের আদরের অভাব যেন কাটে না। মা-বাবাসহ স্বজনদের চেহারা মনে করার চেষ্টা চলে অবিরাম। এভাবে কেটে যায় আট থেকে ১০ বছর। লালন-পালন করা পরিবারের উদ্যোগে বিয়ে হয় এক পরিবহন চালকের সাথে।

স্বামীর সাথে নতুন সংসারে প্রকৃত মা-বাবা ও স্বজনদের মুখ ঝাপসা ঝাপসা মনে করার চেষ্টা চলে নাছিমার। অনেক চেষ্টা করেও তা মনে করতে পারেন না। অন্যদিকে সংসার জীবনের বেশ কয়েক বছরে ঘরে সন্তান না আসার কষ্ট অপ্রাপ্তির বেদনাকে আরো বাড়িয়ে দেয়। স্বামীর সাথে এসব কষ্ট নিয়ে প্রতিনিয়ত মতবিনিময় হতো তার।

‘সবুজ শ্যামলে ঘেরা মধুপুরে বাবা-মায়ের বাড়ি’ এ তথ্য ছাড়া স্ত্রীর কাছ থেকে স্বামী কোনো কিছুই পাননি। মধুপুরের কথা বললেই চমকে ওঠেন স্ত্রী নাছিমা বেগম। একদিন বাসার পাশের এলাকার এক গারো তরুণের সথে কথায় কথায় ভাব বিনিময় হয়। গারো তরুণ জানায় তার বাড়ি টাঙ্গাইলের মধুপুরে। একদিন দুইদিন করে সম্পর্ক গভীরে গড়ায়।

ওই গারো তরুণ মধুপুরের দিকে বন্ধু-বান্ধবের সাথে এ নিয়ে কথা বলেন। শুরু হয় অনুসন্ধান। মনোয়ার হোসেন নামের এক তরুণ এপ্রিলের শেষ সপ্তাহে বর্তমান ডলির পরিচয়ের সন্ধান শুরু করেন। চষে বেড়ান মধুপুর উপজেলার শোলাকুড়ি ইউনিয়নের প্রত্যন্ত কয়েকটি এলাকা। তথ্য হিসেবে হাতে ছিল শোলাকুড়ি গ্রামের ছোট বেলার বন্ধু সাজ্জাদ, রাজিব দু’টি নাম।

এমন তথ্যে কয়েক দিনের অনুসন্ধানে অবশেষে কিছুটা মিল পাওয়া যায়।

যাচাই-বাছাই শেষে প্রমাণ হলো আজকের ডলি আর কেউ নন, তিনি মধুপুরের শোলাকুড়ি গ্রামের মৃত বন্দেস আলীর মেয়ে নাছিমা। মায়ের নাম হাসনা বেগম।

এবার শুরু হয় মায়ের সন্ধানে অভিযান। কিন্তু বাদসাধে মায়ের অবস্থানের ঠিকানা। কোথায় তার মা কেউ বলতে পারেন না। মায়ের সাথে দেখা করিয়ে দেয়াটা হয় আর এক চ্যালেঞ্জ। নতুন এ চ্যালেঞ্জ নিয়ে মনোয়ার ছুটে চলেছেন দেশের বিভিন্ন স্থানে।

অনুমান নির্ভর তথ্য হাতে তিনি ছুটে যান গোপালপুর উপজেলা, জামালপুরের কয়েক উপজেলাসহ দেশের বেশ কয়েকটি স্থানে। অবশেষে পাশের গোপালপুর উপজেলার একটি গ্রামে সন্ধান মিলে মা হাসনা বেগমের। তার এখন আলাদা সংসার।

ওই সংসারেও হাসনা বেগম স্বামী হারিয়েছেন। সন্তানাদি ও সংসার নিয়ে ওখানে মায়ের দিন চলছে সুখেই। তাই পরিচয় অনেকটা সংকুচিত করে তাকে আনা হয় শোলাকুড়িতে। ঝাঁপসা স্মৃতিতে মনে করে মা ফিরে পান আদরের মেয়েকে। মেয়েও দীর্ঘ দিনের বুকে চেপে রাখা কষ্ট নিয়ে মায়ের বুকে আছড়ে পড়েন। সে এক অভাবনীয় দৃশ্য।

মনোয়ার হোসেন জানান, স্রষ্টার কাছে হাজার শুকরিয়া-হয়তো আমার জীবনের সর্বোচ্চ একটি ভালো কাজ করার সুযোগ পেয়েছিলাম। দুই যুগ আগে পরিচয় হারানো মেয়েটিকে তার স্বজনদের মুখোমুখি করে দিতে পারার যে কী আনন্দ সে আমি বুঝাতে পারব না।

গত দুই যুগ ধরে ডলি নামে পরিচিত মধুপুরের নাছিমা তার মাকে পেয়ে খুবই আবেগাপ্লুত ও আনন্দিত।

তিনি জানান, সংসার জীবনে সন্তান না হওয়ার ব্যাপারটি আমাকে কষ্ট দিত। কিন্তু জন্ম পরিচয় না পাওয়ার কষ্টটা তার চেয়েও বেশি ছিল। আমার কষ্ট লাঘব করতে স্বামীর অব্যাহত চেষ্টায় এক গারো তরুণের মাধ্যমে মনোয়ার হোসেন নামের আরো এক তরুণ আমার সেই কষ্ট দূর করেছেন। আমি এমন কাজের জন্য মনোয়ারের কাছে চির কৃতজ্ঞ।

তিনি জানান, ঢাকা থেকে স্বামীসহ মায়ের কাছে এসে পাঁচদিন থেকে গেলাম। মাঝে-মধ্যে মায়ের কাছে চলে আসবো। সবার কাছে নাছিমা তাদের জন্য দোয়া চেয়েছেন।