ময়মনসিংহের ভালুকায় পোলট্রি হ্যাচারির বিষাক্ত বর্জ্য উন্মুক্ত স্থানে ফেলার কারণে দুর্গন্ধে দেড় শতাধিক পরিবার চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছে। তাছাড়া আশপাশের ফসলি জমি ও গাছপালার ক্ষতিসহ প্রাকৃতিক পরিবেশ হুমকির মুখে পড়েছে। পরিবেশ অধিদফতরের তদারকি না থাকায় দুর্ভোগের অবসান হচ্ছে না। এমনকি এ ব্যাপারে বারবার অভিযোগ দেয়ার পরও হ্যাচারি কর্তৃপক্ষ কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
এলাকাবাসীর সাথে কথা বলে জানা গেছে, উপজেলার মামারিশপুর গ্রামে প্রায় আট-নয় বছর আগে নিউ হোপ পোলট্রি হ্যাচারি নামের একটি মুরগির ছানা উৎপাদনকারী শিল্প গড়ে তোলা হয়। ২০১৩ সাল থেকে শিল্পটি ডিম থেকে মুরগির ছানা উৎপাদন করে দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করে আসছে। করোনার কারণে বর্তমাণে প্রতিদিন ৬০ থেকে ৭০ হাজার ছানা উৎপাদন হলেও এর আগে প্রায় দেড় লাখ ছানা উৎপাদন করা হতো। কিন্তু হ্যাচারির বিষাক্ত বর্জ্য, পচা ডিম ও মুরগির মৃত ছানা অপসারণের নিজস্ব কোনো ব্যবস্থা ও স্থান না থাকায় তা ড্রেনের মাধ্যমে হ্যাচারির সীমানা প্রাচীরের বাইরে উন্মুক্ত স্থানে ছেড়ে দেয়া হচ্ছে। এতে ওই এলাকার জমির ফসল ও গাছপালার মারাত্মক ক্ষতির পাশাপাশি শতাধিক পরিবার বেশ কয়েক বছর ধরে দুর্গন্ধে চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছে।
স্থানীয় মৎস্য চাষি আতিকুল ইসলাম জানান, দেড় একর জমি ভাড়া নিয়ে কয়েক বছর ধরে তিনি দেশী জাতের মাছের চাষ করে আসছেন। কিন্তু খামারের পাশে ফ্যাক্টরি কর্তৃপক্ষ শহিদ নামে এক ব্যক্তির কাছ থেকে জমি ভাড়া নিয়ে বিশাল আকারের গর্ত তৈরি করে ট্রাকে করে এনে মরা মুরগির ছানা ও পচা ডিম ফেলছে। এতে করে আধা কিলোমিটার জুড়ে পরিবেশে মারাত্মক বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। সার্বক্ষণিক কুকুর, শেয়াল ও কাক চিলের বিচরণ ও তাদের ডাকাডাকিতে এলাকায় অস্বস্তিকর পরিবেশ বিরাজ করছে। তাছাড়া ওই বিষাক্ত বর্জ্যরে কারণে তার খামারের প্রায় দেড় লক্ষাধিক টাকার মাছ মরে ভেসে উঠেছে। অপর মৎস্য চাষি ইব্রাহিম মিয়া জানান, তিনি তার নিজের ও লিজকৃত ৪০ কাঠা জমিতে কার্প ও সিলভারসহ বিভিন্ন জাতের মাছের রেণু পোনার উৎপাদন করে আসছেন বেশ কয়েক বছর ধরে। কিন্তু নিউ হোপ হ্যাচারির বিষাক্ত বর্জ্যে প্রায়ই তার পোনার মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে। সম্প্রতি ফ্যাক্টরির বর্জ্যরে কারণে পোনা মরে গিয়ে তার অনেক টাকার ক্ষতি হয়েছে।
তাছাড়া ফ্যাক্টরির পূর্বপাশে ঢাকার খন্দকার ইকবালের প্রজেক্টের ভেতর বোরো ধানের ক্ষেত ও গাছপালার মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে। প্রজেক্টের কেয়ারটেকার শহিদ মিয়া জানান, তাদের রোপণকৃত ধানের গোছা বর্জ্যরে কারণে পচে যাচ্ছে। তাছাড়া চরম দুর্গন্ধের কারণে পরিবার নিয়ে বসবাস করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা মহেন্দ্রচন্দ্র বর্মণ, খোকাচন্দ্র বর্মণ ও হরেন্দ্রচন্দ্র বর্মণসহ বহু পরিবারের লোকজন অভিযোগ করে, পরিবারপরিজন নিয়ে এখানে আর বসবাস করা যাচ্ছে না। নিউ হোপ হ্যাচারির বিষাক্ত বর্জ্যরে দুর্গন্ধে নাক বন্ধ হয়ে আসে। তারা জানান, আশপাশে বসবাসরত শতাধিক পরিবার তিন-চার বছর ধরে হ্যাচারির বর্জ্যরে কারণে চরম দুর্ভোগে দিন যাপন করছে। এ ব্যাপারে স্থানীয় ওয়ার্ড মেম্বার, চেয়ারম্যান ও প্রশাসনসহ বিভিন্ন দফতরে অভিযোগ দিয়েও কোনো প্রতিকার পাওয়া যাচ্ছে না।
স্থানীয় সচেতন ব্যক্তিরা অভিযোগ করেন, এ ব্যাপারে বারবার অভিযোগ দেয়ার পরও হ্যাচারি কর্তৃপক্ষ বা আশপাশে প্রতিষ্ঠিত কারখানা কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না। এতে এলাকার ফসল ও গাছপালার ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে।
নিউ হোপ হ্যাচারির ম্যানেজার সেলিম রেজা জানান, তাদের হ্যাচারির বর্জ্য বেশ কিছুদিন স্থানীয় শহিদের জায়গায় ফেলা হচ্ছে। এ জন্য শহিদ মিয়াকে মাসে ৫০ হাজার টাকা ভাড়া দিতে হচ্ছে। তাদের হ্যাচারির বর্জ্যে আশপাশের মানুষের ক্ষতি হওয়ার তেমন কোনো কারণ নেই বলে তিনি উল্লেখ করেন।
স্থানীয় ওয়ার্ড মেম্বার আছমত আলী বলেন, এ ব্যাপারে এলাকার লোকজন আমার কাছে অভিযোগ করলে আমি বহুবার হ্যাচারি কর্তৃপক্ষকে বিষাক্ত বর্জ্যরে ব্যাপারে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য বলেছি। কিন্তু নেবে নেবে বলে তারা কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না।
ভালুকা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সালমা খাতুন জানান, এ ব্যাপারে তার কিছু জানা নেই। তবে তিনি খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন।