মুন্সীগঞ্জ জেলার অন্যতম চিরচেনা শিমুলিয়া ফেরিঘাট এখন ফাঁকা। প্রথম দিনেই বদলে গেছে ঘাটের দৃশ্যপট। স্বপ্নের পদ্মা সেতু চালু হওয়ায় শুধু ধু-ধু বালু ও রোদ খা-খা করছে এই ঘাটে। মুন্সীগঞ্জের এই ঘাট তিন যুগের চিরচেনা ব্যস্ততার চিত্র, এখন নেই কোনো কোলাহল, দেখা যাচ্ছে না যাত্রীদের দীর্ঘ অপেক্ষার সারি ও যাবতীয় বিড়ম্বনা। এ নিয়ে লঞ্চের মালিক-শ্রমিকরা দুশ্চিন্তায় থাকলেও চলছে নতুন চিন্তা-ভাবনা।
পদ্মা সেতুতে যানবাহন চালু হয় রোববার সকাল ৬টা থেকে। এরই মধ্যে শিমুলিয়া ঘাটের গুরুত্ব কমে যাওয়ার পাশাপাশি বিআইডব্লিউটিসির ফেরিসহ ব্যক্তি মালিকানায় চলাচল করা সকল নৌযানগুলোর চাহিদাও নেমে আসছে তলানিতে। এ নিয়ে ঘাটের নৌযানগুলোর মালিক-শ্রমিকরা আছেন অনেক দুশ্চিন্তায়। কারণ, শিমুলিয়া লঞ্চ মালিক সমিতির তথ্য অনুযায়ী শিমুলিয়া ঘাট থেকে বাংলাবাজার ও মাঝিকান্দি পর্যন্ত ৮৭টি ছোট-বড় লঞ্চ চলাচল করে বছরজুড়ে।
শিমুলিয়া ঘাটের চলাচলরত ফারজানা-৯ লঞ্চের মালিক অমিনুল মিয়া জানান, ‘আমি ১৯ বছর ধরে এই লঞ্চ চালাই। এর আগে শিমুলিয়া ঘাট যখন মাওয়া-কান্দিপাড়ায় ঘাট ছিল তখন থেকেই চালিয়ে আসছি। পদ্মা সেতু চালু হয়েছে মনটা ভরে গেছে, আমরা খুশিও হয়েছি অনেক। কিন্তু অপরদিকে দুশ্চিন্তায় ঘুম হারাম হয়েছে, আমার মতো লঞ্চ কর্মচারীদের। যাত্রী চলাচল না করলে লঞ্চ বন্ধ হয়ে যাবে। আর লঞ্চ বন্ধ হয়ে গেলে সংসার কিভাবে চালাবো এটি এখন ভাবিয়ে তুলছে সকলের মনে। আমাদের জন্য অন্য রুটের যেন ব্যবস্থা করে দেয়া হয়, সরকারের কাছে এটাই দাবি।
আহমেদ আলী-১ লঞ্চের কেরানি মো: জাকির হোসেন বলেন, ‘এই লঞ্চে চাকরি করে মাসে ১২ হাজার টাকা বেতন পাই। লঞ্চ না চললে চাকরিও থাকবে না। সরকারের কাছে দাবি, আমরা যেন কোনো না কোনোভাবে লঞ্চ চালু রাখতে পারি।’
লঞ্চ মালিক সমিতির মাওয়া জোনের সাধারণ সম্পাদক মনিরুজ্জামান জানান, তাদের প্রাথমিক পরিকল্পনা হচ্ছে অন্য রুটে লঞ্চগুলো দেয়া। এখানে ৮৭টি লঞ্চ আছে। এগুলোর জন্য নতুন রুট চেয়ে বিআইডব্লিউটিএ বরাবর কয়েকটি চিঠি দেয়া হয়েছে। তারা বিআইডব্লিউটিএ টিমের সাথে বাহাদুরাবাদ, বালাসিঘাট পরিদর্শন করেছে।
এ বিষয়ে বিআইডব্লিউটিএর সহযোগিতা চাচ্ছেন তারা। আবার চিলমারি টু রৌমারি ও মনুরঘাট টু চরভদ্রাসন রুটের জন্যও আবেদন করছেন। এদিকে পদ্মা সেতু চালু হওয়ার আগে কয়েকজন মালিক তাদের লঞ্চ বিক্রি করে দিয়েছেন বলেও জানা যায়।
এ প্রসঙ্গে মনিরুজ্জামান আরো বলেন, ‘পদ্মা সেতু চালু হওয়ার জন্য লঞ্চ মালিক সমিতির পক্ষ থেকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ। যাদের এই সেতুতে জমি ছিল তারা কিন্তু টাকা পেয়েছে, ঘর বাড়িও পেয়েছে। যারা ঘাটে ব্যবসা করতো তারাও ক্ষতিপূরণ পেয়েছে। কিন্তু আমরা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। নৌরুট বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। অথচ আমরা ক্ষতিপূরণ পাচ্ছি না। আর আমাদের কোনো কর্মসংস্থানও হচ্ছে না।’
তিনি বলেন, জেলা প্রশাসক বরাবর একাধিকবার দরখাস্ত করেন। প্রতিকার পাননি। ৮৭টি লঞ্চের প্রায় ১০০ থেকে ১৫০ জন মালিক আছেন। সাথে রয়েছে পাঁচ শতাধিক কর্মচারী। কিছু ক্ষতিপূরণ পেলে তারা বেঁচে থাকতে পারবেন। ক্ষতিপূরণ যদি না পান, তবে যেন তাদের এই ৮৭টি লঞ্চের জন্য নতুন রুট তৈরি করে দেয়া হয়।
বিআইডব্লিউটিএর শিমুলিয়া ঘাটের সহকারী পরিচালক শাহাদাত হোসেন বলেন, ১৯৮৬ সালে মুন্সীগঞ্জের লৌহজং উপজেলার মাওয়ায় ফেরিঘাট স্থাপন করা হয়। পদ্মা সেতু চালু হলো, এখন থেকে ঘাটের লঞ্চ ও স্পিডবোটগুলোকে অন্যত্র সরিয়ে বিভিন্ন রুটে চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। এ বিষয়ে লঞ্চ ও স্পিডবোট মালিকদের সাথে আলোচনার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। রুট ব্যবহারের ক্ষেত্রে তাদের পছন্দকে অগ্রাধিকার দেয়া হবে।
সেতু চালু হয়েছে, আর শিমুলিয়া ঘাটমুখী হচ্ছে না দক্ষিণ বঙ্গের কোনো মানুষ। কারণ, ছয় মিনিটে পদ্মা পাড়ি দেয়ার স্বপ্ন এখন বাস্তবে রূপ নিয়েছে। শিমুলিয়া ঘাট চির দিনের জন্য হারাবে তার চির চেনা ব্যস্ততা ও কোলাহল।





