চাঁদপুরের শাহরাস্তিতে ক্ষুধার জ্বালা সইতে না পেরে শিশু ফাহাদকে (২) নির্যাতন করেছে বলে জানিয়েছেন তার মা পারভীন আক্তার।

শুক্রবার দুপুরে শহরাস্তির চিতোষী পশ্চিম ইউনিয়নের হাঁড়িয়া গ্রামের দুলাল মেম্বারের বাড়িতে ছেলেকে নির্যাতনের কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, শ্বশুরবাড়ির নির্যাতনে অতিষ্ট হয়ে বাবার বাড়িতে এসে আশ্রয় নিয়েছেন। আদালত নির্দেশিত মাসিক আট হাজার টাকা দিয়েই শিশুকে নিয়ে চলতেন তিনি। অনেক দিন ধরে খরচের টাকা না পেয়ে স্বামীকে ফোন দিলে তিনি ছেলেসহ তাকে মরে যেতে বলেন।

তিনি আরো বলেন, শ্বশুর বাড়ির শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণা তাকে মৃত্যুরমুখে ঠেলে দিচ্ছে। ঈদে শ্বশুরবাড়িতে গেলে তারা ঘরের দরজা বন্ধ করে দেয়। খাবারের জন্য একমুঠো ভাত চেয়েও পাননি। অনেকবার বলার পরও ছেলেকে একটি রুটি দেননি তারা। এরপর বাবার বাড়িতে একা অবস্থান করেন। সেখানে দিনের পর দিন খরচের টাকা না পেয়ে অনাহারেও ছিলেন। তার কষ্ট দেখে পাশের ঘরের চাচা ইউনিয়ন পরিষদ থেকে দু’দফা চাল এনে দিয়েছেন। ক্ষুধার যন্ত্রণা কতো ভয়াবহ প্রতিদিন উপলব্ধি করেছেন। এসব যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে রাগের বশবর্তী হয়ে সন্তানকে মারধর করে ওই ভিডিও স্বামীর কাছে পাঠান বলে জানান।

তিনি বলেন, ‘আমি ধারণা করেছি সে ওই ভিডিও দেখে পরিবর্তন হবে অথচ উল্টো নিজেদের স্বার্থ রক্ষার্থে ভিডিওটি বিভিন্নজনের মাধ্যমে ছড়িয়ে আমাকে সারা দুনিয়ার মানুষের কাছে দোষী বানিয়েছে।’

অভিযোগ করে তিনি বলেন, ‘তাদের নির্যাতনে আমার গর্ভের ৮ মাসের একটি মেয়ে সন্তান মারা গেছে। আমি তাদের সঠিক বিচার দাবি করছি।’

পারভীনের ভাই মো: শাহ পরান জানান, বিয়ের পর থেকে তার বোন ওই পরিবারে নির্যাতন ছাড়া কিছুই পায়নি। আমরা আমাদের সাধ্যমতো সহযোগিতা করেও নির্যাতনের হাত থেকে তাকে রক্ষা করতে পারিনি। আমার বোন সংসার করতে চেয়েছে। তাই তাদের শত নির্যাতনের পরও সংসার ছেড়ে আসার কথা চিন্তা করেনি। অথচ আজকে তাদের অমানুষিক নির্যাতনে অতিষ্ট হয়ে শিশু বাচ্চাটিকে মারধরের ভিডিওকে কেন্দ্র করে আমার বোনকে তারা নিঃশেষ করে দেয়ার অপচেষ্টা করছে। আমরা ঘটনার সঠিক তদন্তপূর্বক আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কাছে বিচার দাবি করছি।

পারভীনের চাচা সাবেক ইউপি সদস্য মো: দুলাল হোসেন জানান, শ্বশুর বাড়ির অমানুষিক নির্যাতন ও অনাহারে থেকে মেয়েটি ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছে। পুলিশ বাচ্চাটিকে উদ্ধার না করলে হয়তো তিনি বাচ্চাটিকে মেরে নিজে আত্মহত্যা করতেন।

চিতোষী পশ্চিম ইউপি চেয়ারম্যান জোবায়েদ কবির বাহাদুর জানান, ‘পারভীন বিয়ের পর হতে স্বামীর পরিবারের হাতে বার বার নির্যাতিত হয়েছে। আমি কয়েক বার তাদের সালিশ বৈঠকে গিয়েছি। ওই পরিবারের অত্যাচারের মাত্রা সীমা ছাড়িয়ে যাওয়ায় মেয়েটি তার শিশুকে নিয়ে বাবার বাড়িতে আশ্রয় নেয়। সেখানে অর্ধহারে-অনাহারে রয়েছে শুনে আমি ইউনিয়ন পরিষদ থেকে দু’দফা চালের ব্যবস্থা করে দিয়েছি।’

এর আগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শিশুকে নির্যাতনের একটি ভিডিও ভাইরাল হয়। বিষয়টি আদালতের নজরে এলে বৃহস্পতিবার রাতেই ওই শিশুকে চট্টগ্রামের ছোটমনি নিবাসে হস্তান্তর করা হয় বলে জানিয়েছেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উপ-পরিদর্শক (এসআই) জনি কান্তি দে।

এদিকে বৃহস্পতিবার জামিনে ছাড়া পেয়ে শুক্রবার দুপুরে শিশুর মা অভিযুক্ত পারভীন আক্তার বাড়িতে যান। এ সময় তিনি নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন। পরিস্থিতির শিকার হয়ে এ ঘটনা ঘটিয়েছেন বলেও জানান তিনি।

উল্লেখ্য, চাঁদপুরের শাহরাস্তি উপজেলার চিতোষী পশ্চিম ইউনিয়নের হাড়িয়া গ্রামের নূরুল আমিনের কন্যা পারভীন আক্তারের (২৩) সাথে কুমিল্লার মনোহরগঞ্জ উপজেলার আশিয়াদারি গ্রামের আবদুল করিমের ছেলে প্রবাসী মহিনউদ্দিনের তিন বছর আগে বিয়ে হয়। তাদের সংসারে ফাহাদ (২) নামের একটি ছেলেসন্তান রয়েছে। বিয়ের এক বছর পর থেকে তাদের দাম্পত্য কলহ দেখা দেয়। এ নিয়ে স্ত্রী পারভীন আক্তার বাবার বাড়িতে থাকার সিদ্ধান্ত নেন। চাঁদপুর লিগ্যাল এইড কার্যালয়ের সিদ্ধান্তমতে ভরণপোষণ বাবদ প্রতি মাসে স্বামীর কাছ থেকে আট হাজার টাকা দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়।

প্রবাসী স্বামী ঠিকমতো ওই টাকা না দিতে পারায় সম্প্রতি পারভীন তাদের দু’বছরের শিশুসন্তানকে নির্যাতন করে তার ভিডিও স্বামীকে পাঠান। শিশুটির বাবা ওই ভিডিও দেখে সন্তানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মনোহরগঞ্জ এলাকার বিভিন্নজনকে অনুরোধ করেন। এরই মধ্যে ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নজরে আসে। বৃহস্পতিবার দুপুরে ওই শিশুটিকে আদালতে হাজির করা হলে শিশু আদালতের বিচারক জান্নাতুল ফেরদাউস চৌধুরী শিশুটিকে পরিচর্যা ও ভরণপোষনের জন্য চট্টগ্রামের রৌফাবাদ ছোটমনি নিবাসে পাঠানোর নির্দেশ দেন।