‘আমার ভাই কয়েক বছর ধরেই সাগরে মাছ শিকার করে আসছে। কয়েক দিন আগেও একটি ট্রলারে মাছ শিকার করতে সাগরে গেছে। এর পর থেকেই আর তার কোনো খোঁজ পাই না। মোবাইলেও তাকে পাওয়া যাচ্ছে না। ধারণা করছি সাগরে বন্যায় ট্রলার ডুবে গেছে। সরকারের কাছে আমাদের আবেদন যাতে আমার ভাইকে খুঁজে পেতে সহযোগিতা করেন।’ এভাবে আকুতি জানিয়েছেন নিখোঁজ জেলে কবির মাঝির ভাই জাকির হোসেন।

বঙ্গোপসাগরে হঠাৎ নিম্নচাপ। গভীরে সমুদ্রে মাছ শিকার করতে গিয়ে নিখোঁজ হয় বরগুনা পাথর ঘাটার প্রায় ৪০০ জেলে। তাদের মধ্যেই অনেকের সন্ধান পাওয়া গেলেও এখনো নিখোঁজ রয়েছে দুই শতাধিক জেলে। এমন প্রেক্ষাপটে স্বজনদের কান্নায় আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে বরগুনায়। বাড়িতে-বাড়িতে, পাড়ায়-পাড়ায় চলছে কান্নার রোল।

সম্প্রতি বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট নিম্নচাপের প্রভাবে নিখোঁজ বরগুনার ৩১টি এবং মহিপুরের ১০টি ট্রলার নিখোঁজ ছিল। এর মধ্যে বরগুনা জেলার ১৯টি ট্রলার উদ্ধার হয়েছে। ডুবে গেছে ৮টি ট্রলার, এখনো নিখোঁজ রয়েছে ৪টি। উদ্ধার হওয়া ১৯টি ট্রলারে ২০০ জেলেকে উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধারকৃত জেলেদের বেশির ভাগই নিরাপদ আশ্রয়ে রয়েছে। ১৭ জেলে ভারতের দক্ষিণ ২৪ পরগনার কাকদ্বীপ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ও বুদ্ধপুর এলাকায় স্থানীয়দের আশ্রয় শিবিরে রয়েছে ২৩ জন জেলে। তাদের মধ্যে বেশির ভাগ জেলে বরগুনা জেলার। এছাড়াও নিখোঁজ চারটি ট্রলারে স্বজনদের দিন কাটছে উদ্বেগ উৎকণ্ঠায়।

বরগুনা জেলা মৎস্যজীবী ট্রলার মালিক সমিতির তথ্য মতে, এখনো নিখোঁজ রয়েছে ৪টি ট্রলার এবং ডুবে গেছে ৮টি। এর মধ্যে নিখোঁজ হওয়া ট্রলারগুলো হলো বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার সদর ইউনিয়নের ছগির আলমের মালিকানাধীন ‘এফবি সিরাজুল হক’, চরদুয়ানী ইউনিয়নের ইউনুছ মিয়ার মালিকানাধীন ‘এফবি ভাই ভাই’, বরগুনা সদর উপজেলার নলী এলাকার জাহাঙ্গীর মোল্লার ‘এফবি ভাই ভাই’।

তবে এ রির্পোট লেখা পর্যন্ত শানু মিয়ার ট্রলারের নাম জানা যায়নি। ডুবে যাওয়া ট্রলার গুলো হলো, পাথরঘাটা উপজেলার নুর আলমের মালিকানাধীন ‘এফবি মনোয়ারা’, সুজন হাওলাদারের ‘এফবি হওলাদার’, ফারুক খানের ‘এফবি মা বাবার দোয়া’, শানু মুসুল্লীর ‘এফবি সৈকত’, বাদশা মিয়ার ‘এফবি ভাই ভাই’, বরগুনা সদর উপজেলার ছাত্তার মাস্টারের ‘এফবি আল মাহাদী’, আবুল কালামের ‘এফবি কয়া’, হানিফ মিয়ার ‘এফবি জুনায়েদ’।

নিখোঁজ ‘এফবি সিরাজুল হক’ ট্রলারের মালিক ছগির আলম জানান, আমার ট্রলারটি গত মঙ্গলবার দিবাগত রাতে সাগরের উদ্যেশ্যে মাছ শিকারের জন্য ঘাট থেকে ছেরে যায়। এর পরে বৃহস্পতিবার সাগরে নিম্নচাপ শুরু হলে সেই থেকে মাঝি বা জেলেদের সাথে কোনো যোগাযোগ করতে পারিনি। যাতে আমার জেলেদের সন্ধান পাই সেই বিষয়ে সরকারের সার্বিক সহযোগিতা কামনা করছি।

কোস্টগার্ড দক্ষিণ জোনের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কেএম সাফিউল কিঞ্জল জানান, নিম্নচাপের পর থেকেই আমাদের উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রয়েছে। এজন্য কোস্টগার্ডের পক্ষ থেকে কয়েকটি টিম গভীর সমুদ্রে জেলেদের উদ্ধার অভিযানে কাজ করে যাচ্ছে।

বরগুনা জেলা মৎস্যজীবী ট্রলার মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো: মাসুম মিয়া জানান, নিম্নচাপের কারণে সাগর উত্তাল হয়ে পড়ায় গত বৃহস্পতিবার থেকে এ পর্যন্ত ৮টি ট্রলারডুবির ঘটনা ঘটেছে এবং নিখোঁজ রয়েছে ৮টি ট্রলারসহ দুই শতাধিক জেলে। ঘটনার শুরু থেকেই কোস্টগার্ডসহ সরকারি দফতরগুলোকে খোঁজ খবর জানাচ্ছি।

বরগুনা জেলা মৎস্যজীবী ট্রলার মালিক সমিতির পক্ষ থেকে জেলেদের সন্ধানে বেশ কয়েকটি ট্রলার উদ্ধার অভিযানে কাজ করে যাচ্ছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করছি, যাদের খোঁজ পাচ্ছি না তাদের মধ্যে বেশির ভাগ জেলে বেঁচে নেই। তবে তাদের উদ্ধারের জন্য কাজ করে যাচ্ছি।