সাত কোটি টাকা খরচ দেখিয়ে মদ বিক্রির বারের লাইসেন্স হাতে পাওয়ার কয়েক মাস অতিক্রান্ত হলেও সদস্যদের প্রবল আপত্তির মুখে বারের মদ বেচাকেনা এখনো চালু করতে পারেনি সমবায়ভিত্তিক ক্রেডিট ইউনিয়নগুলোর শীর্ষ প্রতিষ্ঠান দি কো-অপারেটিভ ক্রেডিট ইউনিয়ন লিগ অব বাংলাদেশ লিমিটেড (কালব)। তহবিল তছরূপ ও অপবিনিয়োগের কারণে কয়েক শত কোটি টাকা লোকশানের মুখে পড়েছে সমবায় ভিত্তিক শীর্ষ আর্থিক প্রতিষ্ঠানটি অসৎ নেতৃত্বের কারণে বর্তমানে প্রতি মাসে এ প্রতিষ্ঠানের লোকশানের পরিমাণ প্রায় তিন কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। এ ব্যাপারে সমবায় অধিদফতর নির্বিকার ভূমিকা পালন করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। জনগণের সঞ্চিত এ অর্থ তছরূপের লাগাম টেনে ধরেনি সমবায়বিষয়ক মন্ত্রণালয় কিংবা সমবায় অধিদফতর। কোনো ব্যবস্থা না নেয়ায় কালবের চেয়ারম্যান জোনাস ঢাকী, সেক্রেটারি আরিফ মিয়া, ট্রেজারার এম জয়নাল আবেদিনসহ ১২ জন বোর্ড সদস্য ও হিসাব বিভাগের কর্মকর্তা ফিরোজ আলমসহ তাদের সহযোগীরা জিম্মি করে রাখে প্রতিষ্ঠানের সদস্যদের।
কেবল মাদক লাইসেন্সই নয়, কুচিলাবাড়ি রিসোর্ট সংস্কারের নামে যে ৪১ কোটি টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে তারও বেশির ভাগ পকেটস্থ হয়েছে কালব পরিচালনা পরিষদ সদস্যদের। ফলে রিসোর্টটি এখন কালবের শ্বেতহস্তিতে পরিণত হয়েছে। এটিতে সংস্কারের নামে এ পর্যন্ত দুই মেয়াদে ৪১ কোটি টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে। এর মধ্যে চেয়ারম্যান জোনাস ঢাকী এবং সেক্রেটারি এমদাদ হোসেন মালেক পরিষদ ক্ষমতায় থাকাকালীন ১৫ কোটি এবং সদ্য বিদায়ী কমিটির হাত দিয়ে ২৬ কোটি মোট ৪১ কোটি টাকার সংস্কার কাজে ব্যয় দেখানো হয়েছে। পূর্ববর্তী পরিচালনা কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ এবং কয়েকজন ডিরেক্টর এই খরচের হিসাব নিয়ে প্রকাশ্যেই আপত্তি তুলেছিলেন। তাদের বক্তব্য ছিল বিনিয়োগের আগে প্রকল্পের ফিজিবিলিটি যাচাই করে নেয়া হোক। কিন্তু চেয়ারম্যান জোনাস ঢাকী কারো কোনো কথাই শুনতে চাননি। ফিজিবিলিটি যাচাইয়ের জন্য কোনো কন্সালট্যান্সি প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব না দিয়ে বরং তার একান্ত পকেটের লোক কালবের তৎকালীন ডিরেক্টর অমূল্য চন্দ্র দাস এবং হিসাবরক্ষক ফিরোজ আলমের পরামর্শে নিম্নমানের কাজের মাধ্যমে অবাধ দুর্নীতি ও অর্থ আত্মসাৎ চালিয়ে যান। তবে এত টাকা খরচ দেখানো হলেও বাণিজ্যিক রিসোর্ট হিসেবে সরকারিভাব কালব রিসোর্টের কোনো লাইসেন্স বা অনুমোদন এখনো পর্যন্ত নেই। স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের একটি ট্রেড লাইসেন্স ছাড়া আর কোনো অনুমোদন কালব কর্তৃপক্ষ নিতে পারেনি। সদ্য বিদায়ী কমিটি এটিকে আন্তর্জাতিক মানের রিসোর্ট দাবি করলেও একটি পুকুর ও একটি সাধারণ মানের সুইমিংপুল আর কিছু ঝোপঝাড় ছাড়া উল্লেখযোগ্য তেমন কিছুই নেই কালব রিসোর্টে। এটিকে ট্রেনিং সেন্টার হিসেবে গড়ে তোলার কথা থাকলেও তা এখন কেবলই বিনোদনকেন্দ্র।
অন্য দিকে মদ বিক্রির লাইসেন্সের বিষয়টি অনুমোদনের জন্য কয়েকবার সাধারণ সভায় উপস্থাপন করা হলেও বেশির ভাগ সদস্যের প্রবল আপত্তির মুখে তা অনুমোদন করানো সম্ভব হয়নি বরং অভিযোগ রয়েছে যে, মদের লাইসেন্স বাবদ খরচকৃত সাত কোটি টাকা কালব তহবিলে ফেরৎ দেয়ার অঙ্গীকার করে উপস্থিত সদস্যদের প্রতিবাদ শান্ত করার পরও তা আর কালব তহবিলে ফেরৎ দেননি কালবের সাবেক চেয়ারম্যান জোনাস ঢাকী।
জানা যায়, সম্প্রতি গাজীপুরের কুচিলাবাড়ী নামক স্থানে কালব রিসোর্ট অ্যান্ড ট্রেনিং সেন্টারে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে মদের বার স্থাপনের অনৈতিক সিদ্ধান্ত নেয় কালবের চেয়ারম্যান জোনাস ঢাকীর নেতৃত্বে চলমান ব্যবস্থাপনা কমিটি। কালব অন্তর্ভুক্ত প্রাথমিক সমিতির মধ্যে কয়েক শত সমবায়ভিত্তিক শিক্ষক সমিতি রয়েছে, যেসব সমিতির সব সদস্যই স্কুল-কলেজের সম্মানিত শিক্ষক। তারা সমবায় প্রতিষ্ঠানে মাদক ব্যবসাকে কিছুতেই মেনে নিতে পারছেন না।
২০২১ সালের ৬ জানুয়ারি কালবের ষষ্ঠ বোর্ড সভায় বারের লাইসেন্স প্রাপ্তির জন্য সরকারি পর্যায়ে সম্ভাব্য তদবির ব্যয় প্রদান বাবদ ৭ থেকে ১০ কোটি টাকার বাজেট অনুমোদন করা হয়।
অনুসন্ধান করে দেখা গেছে, মদের জন্য ঢাকার পুরানা পল্টনের ৫৫/এ এইচ সিদ্দিক ম্যানশন, পঞ্চম তলায় এন সরকার অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটস নামে যে প্রতিষ্ঠানের সাথে কালব চেয়ারম্যান জোনাস ঢাকী চুক্তি স্বাক্ষর করেছিলেন সেই ঠিকানায় ওই প্রতিষ্ঠানের কোনো অস্তিত্বই নেই।
বারের লাইসেন্স সংক্রান্ত কালব ব্যবস্থাপনা কমিটির দুর্নীতির তদন্ত চেয়ে ইতোমধ্যেই দেশের বিভিন্ন জেলা উপজেলায় কালব সদস্যভুক্ত সমিতির নেতৃবৃন্দ সোচ্চার হয়ে উঠেছেন। কিন্তু সমবায়বিষয়ক মন্ত্রণালয় বা সমবায় অধিদফতর তহবিল তছরূপের এত বড় ঘটনাকেও অজ্ঞাত কারণে আমলে নিচ্ছে না।
ইতোমধ্যে সরকার বারের লাইসেন্স প্রদানের বিষয়ে বেশ শিথিলতা আরোপ করায় চলতি বছরের এপ্রিল মাসে স্বাভাবিক প্রক্রিয়াতেই কালব বারের লাইসেন্সটি হাতে পেয়ে যায়। কিন্তু এন সরকার অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটসের সাথে কথিত চুক্তির কারণে উল্লেখিত সাত কোটি টাকার পুরোটাই কালব পরিচালনা কমিটির সদস্যরা নিজেদের মধ্যে ভাগ বাটোয়ারা করে নিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এত কিছুর পরেও সদস্য সমিতিগুলোর প্রবল আপত্তির কারণে কালব রিসোর্টে এখনো পর্যন্ত বার চালু করা সম্ভব হয়নি।
কেবল বারের লাইসেন্স নয়, বিভিন্ন প্রকল্প দেখিয়ে অর্থ বরাদ্দ এবং তা নয়-ছয়ের মাধ্যমে চলমান ব্যবস্থাপনা কমিটি সমবায়ভিত্তিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান দি কো-অপারেটিভ ক্রেডিট ইউনিয়ন লিগ অব বাংলাদেশ লিমিটেডকে (কালব) দেউলিয়ার দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছে। এই মুহূর্তে সদস্য সমিতিগুলো তাদের গচ্ছিত অর্থ ফেরৎ চাইলে কালবের পক্ষে তা ফেরৎ দেয়া একেবারেই অসম্ভব বলে জানিয়েছেন অনেকে। এমন একটি চলমান লোকসানি প্রতিষ্ঠান থেকে অপ্রয়োজন অনুষ্ঠানে যোগদানের জন্য কালবের সদ্য বিদায়ী চেয়ারম্যান এবং সেক্রেটারি দুইজন একসাথে দরিদ্র সদস্যদের সঞ্চিত অর্থ খরচ করে ১৬ জুলাই স্কটল্যান্ড সফরে গমন করেন।
ইতঃপূর্বেও কালবের প্রাক্তন চেয়ারম্যান সায়মন এ পেরেরা একইভাবে আরিয়ান কেমিক্যাল নামের একটি ভুয়া প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগের নামে ৭৭ কোটি টাকা যা সুদে-আসলে ১০০ কোটি টাকার ওপরে তহবিল তছরূপ ও আত্মসাৎ করে যুক্তরাষ্ট্রে পালিয়ে যান বলে কালবের কয়েকজন সদস্য অভিযোগ করেন। অভিযোগ রয়েছে, সাবেক সেক্রেটারি মৃত আলফ্রেড রায়ও তার ভাগের টাকায় আমেরিকায় একাধিক ফ্ল্যাট কিনেছেন, যেখানে তার বিধবা স্ত্রী এবং সন্তানেরা এখন তা ভোগ দখল করছে।
সদস্যরা বলেন, কালবের তহবিলের উৎস হলো সদস্যদের কষ্টার্জিত সঞ্চিত অর্থ। অথচ সদস্যদের সেই সঞ্চিত অর্থ নিয়ে নিজেদের ইচ্ছামতো তছরূপ করে চলেছেন অসৎ কিছু লোক।
এ দিকে ঘটনার ব্যাপারে জোসান ঢাকীর সাথে কথা বললে তিনি নিজেকে এখনো কালবের চেয়ারম্যান পরিচয় দিয়ে বলেন, এ ব্যাপারে তিনি কিছুই বলবেন না। নিউজ করতে চাইলে নিউজ করতে পারেন। আরিফ মিয়া বলেন, মদের বারটি এখনো চালু করা যায়নি। সাত কোটি টাকা লোপাটের ব্যাপারে তিনি বলেন, ওই সময় তিনি সেক্রেটারি ছিলেন না। অর্থ লোপাটের বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না। জয়নালের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করে তাকে পাওয়া যায়নি।





