বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশির ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় অনুষ্ঠানে শ্লোগানের ভাষা নিয়ে বিরোধের জেরে আওয়ামী লীগের দুই গ্রুপের সংঘর্ষে কৃষক সোনা মিয়া খুনের ঘটনায় ৭৬ জনের নাম উল্লেখ করে আরো ১৫-২০ জন অজ্ঞাতনামাকে আসামি করে হত্যা মামলা হয়েছে। মামলায় উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগ সদস্য আব্দুর রাজ্জাককে ১ নম্বর ও তার বড় ভাই হারাগাছ ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান রাজু আহমেদকে ২ নম্বর আসামি করা হয়েছে। এ মামলায় বুধবার বিকেল সাড়ে ৩টা পর্যন্ত গ্রেফতার করা হয়েছে ছয়জনকে।

রংপুর জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোঃ কামরুজ্জামান পিপিএম জানিয়েছেন, এ ঘটনায় সোনামিয়ার পুত্র আখতারুজ্জামান সোহেল
হত্যা মামলা করেছেন। মামলায় ৭৬ জনের নাম উল্লেখ করা ছাড়াও ১৫-২০ জনকে আসামি করা হয়েছে। মামলায় হত্যার কারণ হিসেবে রাজনৈতিক বিরোধ ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে পূর্ব পরিকল্পনার অভিযোগ আনা হয়েছে। এরই মধ্যে ছয়জনকে আটক করা হয়েছে। অন্যান্য জাড়িতদের গ্রেফতারে সাঁড়াশি অভিযান অব্যাহত আছে। ঘটনাস্থলসহ আশেপাশের এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।

পুলিশের এই কর্মকর্তা আরো জানান, মামলার প্রধান আসামি আব্দুর রাজ্জাক এবং রাজুকে গ্রেফতারে পুলিশের পাশাপাশি ডিবি এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অন্য সদস্যরাও মাঠে কাজ করছেন। প্রযুক্তি ব্যবহার ছাড়াও সম্ভাব্য সব জায়গায় সাঁড়াশী অভিযান চলছে।

বুধবার দুপুর ১২টা পর্যন্ত আটকরা হলেন, হারাগাছ ইউনিয়নের ৮নং ওয়ার্ড সদস্য মোজাম্মেল হক, ৯নং ওয়ার্ড সদস্য মকবুল সালাম, উপজেলা আওয়মী লীগের বহিস্কৃত সদস্য হাবিবুর রহমান হাবিব, খানসামা হাটের বিকাশ দোকানদার মাইদুল ইসলাম, আব্দুল গাফফার এবং আব্দুল জলিল।

আটকদের ওই মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে বিকেল সাড়ে ৩টায় কাউনিয়া থানা থেকে আদালতে নিয়ে যাওয়া হয় প্রিজনভ্যানে। এ সময় সেখানে উপস্থিত তাদের স্বজনরা কান্নায় ভেঙে পড়েন। গ্রেফতার ইউপি সদস্য মকবুল সালামের কন্যা মৌসুমী আক্তার বললেন, আমার বাবা নির্দোষ। ঘটনার সময় তিনি একটি বিয়ে বাড়িতে ছিলেন। কিন্তু রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। আমি আমার বাবার নিঃশর্ত মুক্তি চাই।

থানায় উপস্থিত আব্দুল গাফফারের মা এবং বোন বলেন, আব্দুল গাফফার নির্দোষ। ঘটনার সময় তিনি হাটের মধ্যে ছিলেন। কিন্তু পুলিশ তাকে মসজিদ থেকে নামাজ পড়ে বের হওয়ার সময় গ্রেফতার করে নিয়ে গেছে। তারাও মুক্তি দাবি করেছেন আব্দুল গাফফারের।

এ ঘটনায় জড়িতদের গ্রেফতার এবং সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবিতে রংপুর মহানগরীর একটি কমিউনিটি সেন্টারে সাংবাদিক সম্মেলন করেছে উপজেলা আওয়ামী লীগ।

এর আগে মঙ্গলবার বাদ আসর স্থানীয় ঈমামগঞ্জ স্কুল অ্যান্ড কলেজ মাঠে নামাজে জানাজা শেষে সোনা মিয়াকে পারিবারিক কবরস্থনে দাফন করা হয়। দাফনের পর এলাকাবাসী স্থানীয় খানসামাহাট ও বকুলতলা বাজারে মানববন্ধন, রাস্তা অবরোধ ও সমাবেশ করে জড়িতদের ফাঁসির দাবি জানায়।

এ ঘটনায় জানাজা নামাজে উপজেলা চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ সভাপতি আনোয়ারুল ইসলাম মায়ার পক্ষ থেকে নিহত কৃষক সোনা মিয়ার পরিবারকে ৫ লাখ টাকা অনুদান দেয়ার ঘোষণা দেয়া হয়েছে।

সোমবার বিকেল ৪টার দিকে খানসামা হাট এলাকায় স্থানীয় এমপি ও বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশির ঈদ শুভেচ্ছা অনুষ্ঠানে শ্লোগানের ভাষা নিয়ে কাউনিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও উপজেলা চেয়ারম্যান আনোয়ারুল ইসলাম মায়া এবং উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান আব্দুর রাজ্জাক ও ইউনিয়ন চেয়ারম্যান রাজু আহমেদের গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। বাণিজ্যমন্ত্রী চলে যাওয়ার পর সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় খানসামা হাটে দ্বিতীয় দফার সংঘর্ষে স্থানীয় ৪নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মোখলেছুর রহমান মুকুলের চাচাতো ভাই কৃষক সোনা মিয়াকে চাপাতি ও চাকু দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করে রাজ্জাক-রাজু গ্রুপ। সোনা মিয়া মেয়ের বাড়ি থেকে ঈদের দাওয়াত খেয়ে ওই বাজারে তার নাতনি আরশি মনিকে নিয়ে চা খেয়ে ওষুধ নিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন। এ ঘটনায় ওই এলাকায় থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে।

রংপুর পুলিশ সুপার ফেরদৌস আলী চৌধুরী জানিয়েছেন, পুলিশের পক্ষ থেকে জিরো টলারেন্স নীতিতে এ ঘটনায় জড়িতদের গ্রেফতারে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। পাশাপাশি তদন্ত কার্যক্রম এগিয়ে যাচ্ছে। প্রকৃত অপরাধীদের শীঘ্রই আইনের আওতায় আসবে।

নিহত সোনা মিয়া একজন কৃষক। তার দুই ছেলে ও দুই মেয়ে রয়েছে। কৃষি জমি দেখার পাশাপাশি বাড়িতে গবাদিপশুর খামার দেখাশুনা করতেন তিনি।

কাউনিয়া উপজেলা চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ সভাপতি আনোয়ারুল ইসলাম মায়া জানিয়েছেন, এ ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়ার বিষয়ে জেলা ও কেন্দ্রে জানানো হয়েছে। এ ঘটনায় জড়িতরা দলের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করেছেন। তাদেরকে অবিলম্বে গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি।