গ্রামের নিম্ন আয়ের লোকদের নিয়ে ভেজালমুক্ত সূর্যমুখী চাষ এবং তা থেকে তেল উৎপাদন করে সফল হয়েছেন ‘আমাদের পথচলা’ নামের একটি পল্লী সংগঠন। কৃষকদের কাছ থেকে দৈনিক ১০ টাকা সঞ্চয় নিয়ে খাঁটি তেল সরবরাহের উদ্যোগ নিয়েছে এই সংগঠনের সদস্যরা। সঞ্চয়ের সেই টাকায় ২০২২ সালে ১ লাখ ৬৫ হাজার টাকায় একটি বীজ ভাঙ্গার মেশিন কেনেন। ওই বছরই ২০ মন সরিষা কিনে তৈরি করা হয় খাঁটি সরিষার তৈল। এ বছর ৬ হেক্টর জমিতে আড়াই লাখ টাকা ব্যয়ে সূর্যমুখীর চাষ করে প্রায় ১০০ মন বীজ উৎপাদন করেন কৃষকরা। তা নিজস্ব মেশিনে ভাঙিয়ে খাঁটি সরিষার তেল ৩২০ টাকা কেজি আর সূর্যমুখী তেল ৩৫০ টাকা কেজি দরে সদস্যদের মাঝে বিক্রি করা হচ্ছে। এ ছাড়াও এর খৈল গোখাদ্য ও জমি চাষে ব্যবহার করেন চাষিরা।
পিরোজপুরের ভাণ্ডারিয়া উপজেলার ভিটাবাড়িয়া ইউনিয়নের উত্তর শিয়ালকাঠি প্রত্যন্ত গ্রামের শতকরা ৮৫ ভাগ মানুষ কৃষিকাজের সাথে জড়িত। মহামারী করোনার সময় মানুষের দেহে নানা রোগ ব্যাধি দেখা দেয়। আর ঠিক তখনই এলাকার ভাণ্ডারিয়া ফ্রেন্স মেডিক্যাল হলের পরিচালক রফিকুল ইসলাম মিলন সিকদার গবেষণা করে দেখেন ভেজাল তেল সেবনেই এসব রোগ দেখা দিচ্ছে। তাই তিনি ২০২১ সালে এলাকার কৃষকদের নিয়ে গঠন করেন ‘আমাদের পথচলা’ নামক সংগঠন। ভারতের জীবনধারা ও স্বাস্থ্যবিষয়ক ওয়েবসাইট বোল্ডস্কাইর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হাজারো রোগের মহৌষধ সূর্যমুখী তৈল। মিষ্টি বাদাম জাতীয় এ বীজে খনিজ পদার্থ, ভিটামিন এ, ডি ও ই ও ফ্যাটি এসিড রয়েছে। ১৯৭৫ সাল থেকে সূর্যমুখী একটি তেল ফসল হিসেবে বাংলাদেশে চাষাবাদ হচ্ছে। এ তেলে কোলেস্টেরলের মাত্রা অত্যন্ত কম, তাই হৃদরোগীদের জন্য বেশ উপকারী।
গবেষণায় আরো জানা যায়, সূর্যমুখীর বীজে রয়েছে উন্নতমানের ভিটামিন ই, যা নিয়মিত খেলে অস্টিওআর্থারাইটিস, অ্যাজমা ও বাতরোগ নিরাময় হয়। উচ্চমানের ফাইটোস্টেরল ও লিগন্যানস থাকায় ক্যান্সার কোষ প্রতিরোধ করে। আরো রয়েছে ভিটামিন বি-৬ যাতে মাথার চুল পড়া কমে ও নতুন চুল জন্মায়।
বাংলাদেশ পরিবেশ বাঁচাও অন্দোলনের (পবা) এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলছে, শুধু ভেজাল খাদ্য গ্রহণে প্রতি বছর দেশে তিন লাখ লোক ক্যান্সারে, ২ লাখ কিডনি ও দেড় লাখ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হয়। এ ছাড়া ১৫ লাখ বিকলাঙ্গ শিশু জন্ম নেয়। হেপাটাইটিস, কিডনি, লিভার ও ফুসফুস সংক্রমিত রোগীর সংখ্যাও বাড়ছে। দেশে নিম্নমানের ভোজ্যতেলে বাজার সয়লাব।
সংগঠনের উদ্যোক্তা রফিকুল ইসলাম মিলন সিকদার বলেন, আমার পেশা ওষুধের ব্যবসা। আমি ছোটবেলা থেকেই কৃষি নিয়ে কাজ করি। কৃষকদের সাথে কাজ করতে সংগঠনটি করেছি। আমাদের উৎপাদিত কৃষিপণ্যগুলো বিষমুক্ত।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নজরুল ইসলাম বলেন, ভাণ্ডারিয়ায় সূর্যমুখী চাষের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। অন্য ফসলের তুলনায় এটা খুব লাভজনক। ‘আমাদের পথচলা’ সংগঠনের মাধ্যমে কৃষকেরা ১০ টাকা সঞ্চয় করে ছয় একর জমিতে সূর্যমুখীর চাষ করে খাঁটি তেল উৎপাদন করছেন। এটা একটি ভালো উদ্যোগ। কৃষি অফিসের পক্ষ থেকে কৃষকদের প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা হবে।





