মিয়ানমারের রাখাইন থেকে নিপীড়নের শিকার হয়ে বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের সে দেশে ফেরানো আরো জটিল হয়ে পড়েছে। এই বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গার প্রত্যাবাসনে নানামুখী তৎপরতা আর বন্ধুপ্রতিম দু’টি দেশের ওপর ভরসা করেও এই সঙ্কট নিরসনে গতি আসেনি। তার ওপর রোহিঙ্গাদের কয়েকটি গ্রুপ ও কয়েকটি এনজিওর নেতিবাচক আচরণ এই সঙ্কটকে আরো ঘনীভূত করে তুলেছে। রোহিঙ্গা শরণার্থীদের প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু করতে মরিয়া বাংলাদেশ। এ নিয়ে গত ছয় বছর ধরে অব্যাহত প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে ঢাকা। কিন্তু কিছুতেই কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছানো যাচ্ছে না। রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান নিয়ে শুরু থেকে বলা হচ্ছে- মিয়ানমারের বন্ধু দেশ চীন ও ভারতের হস্তেক্ষেপ ছাড়া এ সমস্যার সমাধান মিলবে না। সেই উপলব্ধি থেকে বেইজিং ও নয়াদিল্লির দরজায় অনবরত কড়া নেড়ে যাচ্ছে ঢাকা; কিন্তু ওপরে ওপরে ঢাকাকে পাশে আছি মর্মে আশ্বস্ত করা হলেও বেইজিং ও নয়াদিল্লির রোহিঙ্গা ইস্যুতে আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে বারংবার। উখিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও রাজাপালং ইউনিয়নের চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর কবির চৌধুরী বলেন, আমরা যত দ্রুত সম্ভব রোহিঙ্গাদের বিদায় করতে চাই। বর্তমান সরকারের মূল লক্ষ্য রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন। রোহিঙ্গাদের অবশ্যই ফিরে যেতে হবে উল্লেখ করে তিনি আরো বলেন, আমাদের মূল লক্ষ্য রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন।
এটা বিশ্বের দায়িত্ব। রোহিঙ্গাদের অবশ্যই ফিরে যেতে হবে। রোহিঙ্গারা চলে গেলে বাংলাদেশ খুশি। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন কমিটির মহাসচিব ও পালংখালী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান এম গফুর উদ্দিন চৌধুরী বলেন, মিয়ানমারের সাথে ভারতের সম্পর্ক বিবেচনা করলে দেখা যাচ্ছে, ভারত তাদের অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক স্বার্থ; সেটিই তারা মাথায় রাখবে। রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের কথায় কিছু কিছু ব্যাপারে ভারতের অবস্থানের পরিবর্তন হয়েছে; কিন্তু সেটি কার্যকর কোনো পরিবর্তন নয়। রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভারত কোনো বড় ধরনের স্যাক্রিফাইস করতে রাজি আছে সেটি আমরা এ পর্যন্ত দেখিনি আর ভবিষ্যতেও খুব বেশি কিছু করবে সেটিও মনে হয় না। কারণ মিয়ানমারে ভারতের স্বার্থের জায়গাটা অনেক গভীর। তিনি আরো বলেন, ভারত-চীন ও মিয়ানমারের ভেতরে যদি মোরাল (নৈতিক) জায়গা তৈরি না হয় ততদিন পর্যন্ত বাংলাদেশ বা অন্য দেশগুলোর চাপ সেভাবে কার্যকর উপলব্ধি হবে না। এ সমস্যা সমাধানে আমাদের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। ঠিক ছয় বছর আগে; ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নারকীয় নির্যাতনের হাত থেকে রক্ষা পেতে রাখাইন রাজ্য থেকে লাখ লাখ রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ ও শিশুদের ঢল নেমেছিল বাংলাদেশে। এই দিনটিকে স্মরণ করতে গত শুক্রবার কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের ৩৩টি ক্যাম্পে সমাবেশ করেছে হাজার হাজার রোহিঙ্গা। সমাবেশ থেকে রোহিঙ্গা গণহত্যার বিচার এবং দ্রুত প্রত্যাবাসন না হলে একযোগে বারো লাখ রোহিঙ্গা স্বদেশে ফিরে যাবে বলে মিয়ানমার সরকারকে হুঁশিয়ারি দেয় তারা।
রোহিঙ্গা এফডিএমএন রিপ্রেজেনটেটিভ কমিটি বোর্ড মেম্বার মাস্টার ছৈয়দ উল্লাহ বলেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে আমরা আরো জোর দাবি জানাব। এরপরও যদি আমাদেরকে না নিয়ে যায় তখন আমরা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহযোগিতা নিয়ে বর্ডার ভেঙে আমাদের দেশ মিয়ানমারে ঢুকে যাবো।
২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট। মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নৃশংস নির্যাতনের শিকার হয়ে লাখ লাখ রোহিঙ্গা কক্সবাজারমুখী হয়। তারা দিনটাকে গণহত্যা দিবস হিসেবে গণ্য করে। তাই একই সাথে দিনটিকে স্মরণ করতে এবং স্বদেশে ফিরে যেতে আয়োজন করে সমাবেশ। শুক্রবার সকাল ৯টায় কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফে ৩৩টি ক্যাম্পে একযোগে শুরু হয় সমাবেশ। মূল আয়োজন হয় উখিয়ার লম্বাশিয়া ক্যাম্পে, তবে বৃষ্টির কারণে সমাবেশ শুরু হয় সাড়ে ১০টায়। এরপর বৃষ্টি উপেক্ষা করে দলে দলে সমাবেশস্থলে আসতে শুরু করে রোহিঙ্গা নারী, পুরুষ ও শিশু।
সমাবেশে ব্যানার, ফেস্টুন প্রদর্শনের পাশাপাশি বক্তারা বলেন, জন্মগত মিয়ানমারে রোহিঙ্গা নাগরিক আমরা, গণহত্যা, জাতিগত নিধনযজ্ঞ থেকে বাঁচতে বাংলাদেশ পালিয়ে এসে আশ্রয় নিয়েছি। এটা শরণার্থী জীবন। আমরা এমন জীবন চাই না, স্বদেশ মিয়ানমারে দ্রুত ফিরতে চাই। এর জন্য আন্তর্জাতিক সব মহলের সহযোগিতা চেয়েছেন রোহিঙ্গারা। উখিয়ার কুতুপালংস্থ লম্বাশিয়া ১ নম্বর ক্যাম্পে এ সমাবেশে হাজার হাজার রোহিঙ্গা স্লোগান দেয় স্বদেশে ফিরতে চাই, বাড়ি যাবো-বাড়ি যাবো। একই সাথে গণহত্যার ঘটনায় আন্তর্জাতিক আদালতে বিচার দ্রুত শেষ করার স্লোগানও দেয়া হয়।
মাস্টার মোহাম্মদ জোবায়ের বলেন, বিশ্বকে আবারো অনুরোধ করছি- বাংলাদেশকে সহায়তা করো এবং মিয়ানমারকে চাপ প্রয়োগ করো। মিয়ানমারের সংসদে সবকিছু ঠিক করে রোহিঙ্গাদের যাতে পূর্ণ নাগরিকত্ব, জানমালের নিরাপত্তা ও অধিকার নিয়ে দ্রুত প্রত্যাবাসন করে। যতদিন প্রত্যাবাসন করবে না ততদিন রোহিঙ্গাদের পাশে থেকে মিয়ানমারের ওপর চাপ প্রয়োগের জন্য বিশ্বকে অনুরোধ করছি।
এ দিকে উখিয়ার পালংখালীর জামতলী, ময়নারঘোনা, টেকনাফের লেদা ক্যাম্পে বড় সমাবেশ হয়েছে। এ সময় তাদের নিরাপদ আশ্রয় দেয়ায় বাংলাদেশ সরকারের প্রতি ধন্যবাদ জানান। শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যবাসন কমিশনার মো: মিজানুর রহমান বলেন, রোহিঙ্গারা হত্যাযজ্ঞের শিকার হয়েছে, তাদের বিচার পাওয়ার অধিকার রয়েছে। সমাবেশের শেষপর্যায়ে মুনাজাত অনুষ্ঠিত হয়। এতে কান্নায় ভেঙে পড়েন রোহিঙ্গারা। আর নিজেদের দেশে ফিরে যেতে আল্লাহর কাছে মুনাজাত করেন।
উল্লেখ্য, ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট থেকে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে নির্যাতন ও গণহত্যার শিকার হয়ে রোহিঙ্গারা দেশছাড়া হবার ছয় বছর পূর্তি উপলক্ষে সমাবেশের আয়োজন। এর আগে ২০১৯ সালের ২৫ আগস্ট ক্যাম্পে প্রথম বড় সমাবেশ করা হয়, যার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন মাস্টার মুহিবুল্লাহ। পরে তিনি মিয়ানমারের সন্ত্রাসী গ্রুপ আরসার সন্ত্রাসীদের হাতে নিহত হন।





