ভোগ্যপণ্যের বাজারে গেলে স্বস্তি মেলে না। এমন কোনো পণ্য নেই যার দাম আকাশ ছোঁয়া নয়। এমন চড়া পণ্যমূল্যে আঁতকে উঠছে সাধারণ মানুষ। এর পরও দফায় দফায় বাড়ানো হচ্ছে গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম। পোশাক-আশাক কিংবা খাদ্যবহির্ভূত পণ্য থেকে শুরু করে চিকিৎসা ব্যয় কোথায় গিয়ে স্বস্তি পাবেন?
মূল্য বৃদ্ধির চাপ সবার আগে এসে পড়ে দেশের মধ্যবিত্ত, নিম্ন মধ্যবিত্ত ও খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষের ওপর। কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফের সাধারণ মানুষ এখন আর এই চাপ সইতে পারছে না। খারাপ থেকে আরো খারাপের দিকে চলে যাচ্ছে তাদের জীবনযাপনের রূপরেখা। উখিয়া-টেকনাফের ৩৩টি ক্যাম্পে বারো লাখ রোহিঙ্গার বসবাস। পণ্যমূল্যসহ অন্যান্য নানাবিধ চাপে একেবারেই দিশেহারা হয়ে পড়েছেন এই গরিব জনতা। তবে এখানে যারা ইয়াবা ব্যবসায় জড়িত তারা লাখোপতি থেকে কোটিপতি বা বিলিয়নপতি হয়ে যাচ্ছে।
উখিয়া-টেকনাফে শ্রম বাজার দখল করে আছে রোহিঙ্গারা। রোহিঙ্গাদের কারণে এখানকার শ্রমজীবী মানুষের আয় আরো কমেছে যাচ্ছে। আগে যারা বাসাবাড়ি ও কৃষি জমিতে কাজ করতেন, এমন স্থানীয়রা এখন আর কাজ পান না। রোহিঙ্গারাই কম দামে শ্রম বিক্রি করছে। সুতরাং এক দিকে সবকিছুর দাম বৃদ্ধি, অন্য দিকে আয় কমে যাওয়ায় জীবনের চাকা যেন আর চলছে না সাধারণ মানুষের। খুবই নাজুক অবস্থা তাদের। না পারছে তারা কারো কাছে কইতে, না পারছে সইতে।
সচেতন মহল মনে করছেন, সাধারণ মানুষের পিঠ একেবারে দেয়ালে ঠেকে গেছে। পালংখালী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান এম গফুর উদ্দিন চৌধুরী বলেন, দেশের মানুষ যে চরম দ্রব্যমূল্যে চাপে রয়েছে সেটা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। চারদিকের সঙ্কটে তাদের ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা। সরকার হয়তো চেষ্টা করছে মানুষকে কিছুটা কম দামে পণ্য বা সেবা দিতে। সরকার বিভিন্ন খাতে ভর্তুকি দিচ্ছে কিন্তু কোনো অবস্থাতেই দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। ভোগ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধিতে দেশের মানুষ কতটা কষ্টে আছে তা গত পাঁচ বছরের পণ্যমূল্য পরিস্থিতি পর্যালোচনা করলেই বোঝা যায়।
এই পাঁচ বছরে যে কয়টি ভোগ্যপণ্যের দাম সবচেয়ে বেশি বেড়েছে তার মধ্যে সবার ওপরে আছে সয়াবিন ও পামওয়েল তেল। ২০১৯ সালে দেশের বাজারে প্রতি লিটার বোতলজাত সয়াবিনের দাম ছিল ১০৪ টাকা। ২০২০ সালে সেটি বেড়ে হয় ১১৩ টাকা। ২০২১ সালে বেড়ে হয় ১৩০ টাকা। ২০২২ সালে এসে হয় ১৬৮ টাকা থেকে ১৭০ টাকা। ৫ লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম ২০১৯ সালে ছিল ৪৫০ টাকা, ২০২০ সালে হয় ৪৮০ টাকা, ২০২১ সালে ৫৮০ টাকা, ২০২২ সালে হয় ৭৯৫ থেকে ৮০০ টাকা। এ ছাড়া পামওয়েলের লিটার (খোলা) ২০১৯ সালে ছিল ৫৮ টাকা, ২০২০ সালে বেড়ে হয় ৭৮ টাকা, ২০২১ সালে ১০৭ টাকা, ২০২২ সালে হয় ১৫০ টাকা। ২০২৩ সালে এসেও দামের এই ঊর্ধ্বগতি থামানো যায়নি।
এমনি করে দেখা যায়, দেশের মানুষের প্রধান খাদ্যপণ্য চালের দামও বেড়েছে অস্বাভাবিক হারে। পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৯ সালে চিকন চালের কেজি ছিল ৫৩ টাকা, ২০২০ সালে হয় ৬৫ টাকা, ২০২১ সালে হয় ৬৯ টাকা, ২০২২ সালে হয় ৭৫ টাকা। ২০২৩ সালে ৯০ টাকা। প্রতি কেজি মোটা চালের দাম ২০১৯ সালে ছিল ৩৪ টাকা, ২০২০ সালে হয় ৪২ টাকা, ২০২১ সালে হয় ৪৬ টাকা, ২০২২ সালে হয় ৫২ টাকা এবং ২০২৩ সালে হয় ৫৮ টাকা। আরেক প্রধান খাদ্যপণ্য আটার দামও বেড়েছে অস্বাভাবিক হারে। ২০১৯ সালে প্যাকেটজাত আটার কেজি ছিল ৩২ টাকা, ২০২০ সালে হয় ৩৬ টাকা, ২০২১ সালে ৩৮ টাকা, ২০২২ সালে হয় ৫২ টাকা এবং ২০২৩ সালে এসে দাঁড়িয়েছে ৫৫ টাকায়।
আরেক নিত্যপণ্য চিনির দাম গত পাঁচ বছরে বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে। ২০১৯ সালে বাজারে এক কেজি চিনি মিলত ৫২ টাকায়। ২০২০ সালে দাম বেড়ে হয় ৬০ টাকা, ২০২১ সালে ৬৫ টাকা, ২০২২ সালে ৮০ টাকা এবং এখন ২০২৩ সালে এসে চিনির দাম ১৪০ টাকায় এসে ঠেকেছে। দাম বৃদ্ধির দৌড়ে থেমে নেই শিশু খাদ্যও। শিশু খাদ্য গুঁড়ো দুধ প্রতি কেজির দাম ২০১৯ সালে ছিল ৫৭০ টাকা, ২০২০ সালে হয় ৬০০ টাকা, ২০২১ সালে ৬৩০ টাকা, ২০২২ সালে ৬৯০ টাকা এবং ২০২৩ সালে এসে হয় ৭৫০ টাকা।
মুরগি ও গোশতের বাজারও বেজায় বেসামাল। বাজারে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হওয়া সোনালি মুরগির কেজি ২০১৯ সালে ছিল ২২০ টাকা, ২০২০ সালে হয় ২৫০ টাকা, ২০২১ সালে ২৭০ টাকা, ২০২২ সালে ৩০০ টাকা এবং ২০২৩ সালে দাম বেড়ে হয়েছে ৩২০ টাকা। এ ছাড়া গরুর গোশতের কেজি ২০১৯ সালে ছিল ৫৪০ টাকা, ২০২০ সালে ৫৮০ টাকা, ২০২১ সালে ৬০০ টাকা, ২০২২ সালে ৬৫০ টাকা এবং ২০২৩ সালে এসে এখন বিক্রি হচ্ছে ৭০০ টাকায়।
এসব পণ্যের বাইরে মসুর ডাল, আদা, রসুন, লবণসহ সব ধরনের মসলা, সব ধরনের মাছ ও সব ধরনের সবজির দামও অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। পণ্যমূল্য বৃদ্ধি এবং সেবা খাতে সেবার মূল্য বৃদ্ধিতে দেশের মানুষ নিদারুণ কষ্টে আছে। স্থানীয় রাজাপালং এলাকার মোহাম্মদ ইসলাম বলেন, শিগগিরই দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধিতে মানুষের কষ্ট লাগব হওয়ার কোনো সম্ভাবনাও দেখতে পাচ্ছি না। বেঁচে থাকাটাই এখন কঠিন হয়ে যাচ্ছে।





