যশোরের যশ খেজুরের রস সংগ্রহের জন্য গাছ প্রস্তুত করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ছেন যশোরের চৌগাছার গাছিরা। রাতের শেষে হালকা কুয়াশা জানান দিচ্ছে শীতের আগমনী বার্তা। আবহমান গ্রাম-বাংলার ঐতিহ্য খেজুর রস সংগ্রহে চৌগাছা উপজেলার মাঠে মাঠে খেজুর রস সংগ্রহের জন্য গাছিরা বেশ তৎপর হয়ে উঠছেন। যশোরের এ ঐতিহ্য ধরে রাখতে উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে গাছি সমাবেশ, খেজুর গুড়ের মেলা ও পাঁচ লাখ খেজুর গাছা রোপণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
অল্প ক’দিনের মধ্যে উত্তরি বাতাসে চিরসবুজের অপরূপ সৌন্দর্যের মাঝে সকলের মন মাতিয়ে তুলবে মিষ্টিঘ্রাণের খেজুর রস ও খেজুর গুড়। কাক ডাকা ভোর থেকে চলবে রস সংগ্রহ। সন্ধ্যায় চলবে গাছ পরিচর্যার কাজ। চলতি মৌসুমে কিছুটা আগেই উপজেলার প্রান্তিক গাছিরা প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এ জনপদের গ্রামে গ্রামে সকালের শিশিরের সাথে এখনই অনুভূত হচ্ছে মৃদু শীতের শিহরণ।
সরেজমিন উপজেলার যাত্রাপুর এলাকায় গেলে চোখে পড়ে গাছিদের গাছ প্রস্তুতির চিত্র। এ সময় কথা হয় গাছি আজিজুর রহমান, মোহাম্মদ বাবু, নুর হোসেন নুরো, নাজিম উদ্দীন ও গেসু মিয়ার সাথে। তারা জানান, আগাম খেজুরের গুড় পেতে শীত মৌসুমের শুরুতেই গাছ প্রস্তুতির কাজ শুরু করতে হয়। একটি গাছ প্রস্তুত করতে মজুরি পাওয়া যায় ১০০ টাকা। দিনে ১৫-১৬টি গাছ প্রস্তুত করতে পারেন একেক জন গাছি।
খেজুর গাছ থেকে রস সংগ্রহের প্রস্তুতি উপজলার প্রতিটি গ্রামেই চোখে পড়ছে। খেজুর রস ও গুড়ের জন্য চৌগাছির খ্যাতি রয়েছে দেশজুড়ে। এক দশক আগেও এলাকার অধিকাংশ পতিত জমিতে, ক্ষেতের আইলে, ঝোপঝাড়ের পাশে ও রাস্তার দুই ধার অসংখ্য খেজুর গাছ ছিল। সেসব খেজুর গাছ যেন হারিয়ে যেতে বসেছে। অথচ এখনো শীতকালে শহর থেকে মানুষ দলে দলে গ্রামে ছুটে আসে খেজুর রস ও খেজর গুড় খেতে। এককালে গাছিদের দেখলে ছোট্ট শিশুরা ছড়া কাটতো ‘ঠিলে ধুয়ে দে বৌ গাছ কাটতে যাবো/ খেজুর গাছে চুমর বেড়েছে তোরে এনে দেব/ সন্ধ্যে-রস পেড়ে এনে জাও রেনদে খাবো’।
গ্রামের বাড়িগুলোতে সকাল বেলায় রস জ্বালিয়ে পাতলা ঝোলা গুড়, দানা গুড় ও পাটালি তৈরি হতো। নলেন গুড়ের মন মতানো স্বাদ ও ঘ্রাণ ছিল অমৃতের মতো। নতুন প্রজন্মের কাছে এসব এখন রূপকথার মতো শোনায়। যত বেশি শীত পড়ে, খেজুর গাছের রস তত বেশি মিষ্টি হয়।
উপজেলার নারায়ণপুর ইউনিয়নের পেটভরা গ্রামের গাছি আব্দার রহমান বলেন, শীতের পুরো মৌসুমে চলে রস, গুড়, পিঠা, পুলি ও পায়েস খাওয়ার উৎসব। এখন নতুন করে কেউ আর খেজুর গাছ কাটার কাজ করতে চান না। প্রচণ্ড কষ্টের কাজ। সবাই এখন আরামের কাজ খোঁজে। তবে খেজুর গাছ আমাদের অর্থনীতি, সংস্কৃতি, সাহিত্য ও জীবনধারায় মিশে আছে। আমাদের উচিত এই ঐতিহ্যকে যেকোনো মূল্যে রক্ষা করা। একটি খেজুর গাছ ১৫ থেকে ২০ বছর পর্যন্ত রস দেয়। এটাই তার বৈশিষ্ট্য। এছাড়া খেজুর পাতার পাটি বেশ কাজের। জ্বালানি হিসেবেও খেজুরপাতা ব্যবহৃত হয়। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন, কালের বিবর্তন এবং বন বিভাগের নজরদারি না থাকায় বাংলার ঐতিহ্যবাহী খেজুর গাছ এখন প্রায় বিলুপ্তির পথে।
এ ব্যাপারে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মুসাব্বির হুসাইন বলেন, গাছিদের খেজুর গাছ কাটার কাজ একটি শিল্প। এর জন্য দক্ষতা ও প্রশিক্ষণের প্রয়োজন হয়। গাছের চূড়ায় উঠে ডাল কেটে গাছের শুভ্র বুক বের করার মধ্যে রয়েছে কৌশল, রয়েছে ধৈর্য্য ও অপেক্ষার পালা। এ জন্য মৌসুম আসার সাথে সাথে দক্ষ গাছিদের কদর বাড়ে। আমরা উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের গাছিদের এ পেশায় টিকে থাকার জন্য প্রশিক্ষণ, উঠান বৈঠক ও সমাবেশ করেছি।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইরুফা সুলতানা বলেন, এ পেশার সাথে জড়িত গাছিদের নিয়ে সমাবেশ করে প্রশাসনের মাধ্যমে তাদেরকে উৎসহ দিয়ে যাচ্ছি। চলতি বছরের ১৫ ও ১৬ জানুয়ারি দু’দিনব্যাপী উপজেলা চত্বরে খেজুর গুড়ের মেলার আয়োজন করা হয়। এবারো মেলা হবে।
চৌগাছায় খেজুর রস সংগ্রহের প্রস্তুতি শুরু
যশোরের যশ খেজুরের রস সংগ্রহের জন্য গাছ প্রস্তুত করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ছেন যশোরের চৌগাছার গাছিরা। রাতের শেষে হালকা কুয়াশা জানান দিচ্ছে শীতের আগমনী বার্তা। আবহমান...





