সকাল ৯টা ৩৭ মিনিট। কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলার ভোটকেন্দ্র। সাংবাদিকদের গাড়ি এসে থামল গেটের সামনে। ভেতরে অলস দাঁড়িয়ে আনসার ও পুলিশ। ভোটারের অপেক্ষায় পায়চারি করছেন প্রিজাইডিং অফিসার। তবে কেন্দ্রের সামনে একজন ভোটারও নেই। এতে সাংবাদিকদের সামনে অনেকটা বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে গেলেন আনসার সদস্যরা। ব্যস্ত হয়ে ভোটার খুঁজতে শুরু করলেন তারা।

কেন্দ্রের সামনের সড়কে বিপুল কৌতুহল নিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন পাঁচ-সাতজন নারী। আনসার সদস্যরা ডেকে আনলেন তাদের। আনসারদের অনুরোধে অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে লাইনে দাঁড়িয়ে গেলেন নারীরা। আরো ভোটারের খোঁজে বেরিয়ে এলেন 'দায়িত্বরত' আনসাররা। এই সুযোগে মাথায় ঘোমটা টেনে লাইন থেকে সটকে গেলেন নারীরা।

উপজেলার হোসেন্দি ইউনিয়নের হোসেন্দি আদর্শ ডিগ্রি কলেজের চিত্র এটি। কলেজটিতে পুরুষ ও নারীদের আলাদা দু’টি ভোটকেন্দ্র রয়েছে। পুরুষ কেন্দ্রে ভোটার সংখ্যা ২০৮১ ও নারী ভোটকেন্দ্রে ভোটার সংখ্যা ২৩০০। সকাল সাড়ে ৯টা পর্যন্ত পুরুষ কেন্দ্রে ৯৩ ভোট পড়েছে বলে জানিয়েছেন প্রিজাইডিং অফিসার আমিনুল হক। নারীকেন্দ্রের প্রিজাইডিং অফিসার শহীদুল হক এ পর্যন্ত ৫০ ভোট নিয়েছেন।

গতরাতে এই কেন্দ্রের সামনে ভোট বর্জনের প্রচারে একটি মশাল মিছিল হওয়ায় ভোটার উপস্থিতি কম বলে জানিয়েছেন আমিনুল হক।

কটিয়াদি ও পাকুন্দিয়া উপজেলা নিয়ে গঠিত কিশোরগঞ্জ-২ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন সাত প্রার্থী। এ আসনে প্রথমবারের মতো নৌকা নিয়ে লড়াই করছেন পুলিশের সাবেক ডিআইজি আবদুল কাহার আকন্দ। তিনি বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলাসহ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ছিলেন।
ঈগল প্রতীক নিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে লড়াই করছেন দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নৌকা নিয়ে জয় পাওয়া সোহরাব উদ্দিন। ট্রাক প্রতীক নিয়ে নির্বাচনী লড়াইয়ে আছেন বিএনপির বহিষ্কৃত নেতা মেজর (অব) আখতারুজ্জামান। তাকে সমর্থন করেছেন সরকারদলীয় বর্তমান সংসদ সদস্য সাবেক আইজিপি নূর মোহাম্মদ। মেজর রঞ্জনের ভূমিকায় এ আসনটি নিয়ে সারাদেশের মানুষের কৌতুহল থাকলেও ভোটারদের মধ্যে উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা যায়নি।

সকাল ১০টায় একই চিত্র দেখা গেছে পাকুন্দিয়া পৌরসভার সাত নাম্বার ওয়ার্ডের লখিয়া উচ্চবিদ্যালয়ে। এই কেন্দ্রে ওই সময়ে একজন ভোটারের উপস্থিতিও দেখা যায়নি। সাংবাদিকদের দেখে এগিয়ে এলেন প্রিজাইডিং অফিসার মোহাম্মদ সাইফুল্লাহ। এলেন নৌকার অ্যাজেন্ট দেওয়ান আলী হোসেন। এ সময় ফাঁকা ভোটকেন্দ্রের ছবি তুলছিলেন সাংবাদিকেরা।

নৌকার অ্যাজেন্ট দেওয়ান আলী হোসেন কেন্দ্রের ছবি না নেয়ার অনুরোধ করে বলেন, 'ভাই, শরম। ছবি তুইলেন না। ভোটার আসে নাই। আমাদের মান-ইজ্জতের ব্যাপার'। পরে ভোটকেন্দ্রের বাইরে থেকে দশ-বারোজনকে এনে লাইনে দাঁড় করানোর চেষ্টা করেন তিনি। এদের মধ্যে দেখা যায় মারুফ নামের এক কিশোরকে। দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী। 'তুমিতো ভোটার না কেন এসেছো? জিজ্ঞেস করতেই সে বলল, 'আমাকে ওরা লাইনে এসে দাঁড়াতে বলেছে।'

লখিয়া উচ্চবিদ্যালয় কেন্দ্রে বুথ সংখ্যা সাতটি। ভোটার রয়েছেন ৩২৬। সকাল ১০টা পর্যন্ত এ কেন্দ্র ভোট পড়েছিল ১৫৮টি। স্থানীয় একজন জানান, সকাল থেকে কোনো ভোটার ভোট দিতে আসেনি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক পোলিং কর্মকর্তা বলেন, 'যে কয়টা ভোট পড়েছে এগুলো আওয়ামী লীগের অ্যাজেন্টরাই দিয়ে দিয়েছে।'

তবে সকাল পৌনে ৯টার দিকে পাটুয়াভাঙ্গা ইউনিয়নে চকদিয়া ইসলামিয়া দাখিল মাদরাসায় দেখা যায় ভিন্ন চিত্র। কেন্দ্রটিতে কিছু ভোটারের উপস্থিতি দেখা গেছে। এই কেন্দ্রের পাশেই স্বতন্ত্র প্রার্থী সোহরাব উদ্দিনের বাড়ি। সকাল পৌনে ৯টার দিকে ভোট দিতে কেন্দ্রে আসেন তিনি। ভোট দেয়ার পর তিনি মন্তব্য করেন, 'এখন পর্যন্ত নির্বাচনের পরিবেশ ভালো দেখছি। মানুষ ভোট দিতে আসছে। কোনো সমস্যা দেখছি না। শেষ পর্যন্ত পরিবেশ ঠিক থাকলে আমিই জয় পাবো।'

কেন্দ্রটিতে কত ভোট পড়েছে সে তথ্য দিতে পারেননি প্রিজাইডিং অফিসার মোহাম্মদ সাদ্দাম হোসেন। তিনি বলেন, 'কিছু ভোটার এসেছে। বেলা বাড়ার সাথে সাথে আশা করি আরো ভোট পড়বে।' তার কেন্দ্রে ভোটার সংখ্যা ২৭৭৩।

সাড়ে ১০টায় উপজেলার মির্জাপুর ইউনিয়নের শহীদ আলাউদ্দীন উচ্চবিদ্যালয়ে ভোটারদের কোনো লাইন দেখা যায়নি। তবে কেন্দ্রের মাঠে নৌকার লোকজনের সঙ্গে ঈগল প্রতীকের সমর্থকদের মধ্যে উত্তেজনা চলছিল। কেন্দ্রটিতে পুরুষ ও মহলিাদের জন্য আলাদা দু’টি কেন্দ্র রয়েছে।

বেলা সাড়ে ১১টায় পাকুন্দিয়া পৌরসভার চালিয়াগোপ ১নং সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নৌকা ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর সমর্থকদের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। কেন্দ্রে এসে ভোটকেন্দ্র ফাঁকা দেখা গেছে।

প্রিজাইডিং অফিসার হারুন অর রশিদ বলেন, 'কেন্দ্রের বাইরে লাঠিসোটা নিয়ে দুইপক্ষ জড়ো হয়েছিল। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহনী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে। ভোট নিতে কোনো সমস্যা হয়নি।'

পৌনে ১২টার দিকে বিজিবির একটি দলকে অস্ত্র তাক করে কেন্দ্র পাহারা দিতে দেখা যায়।