৪র্থ দিনে পাটুরিয়ায় তলা ফেটে ডুবে যাওয়া ইউটিলিটি ফেরি রজনীগন্ধা উদ্ধারে উদ্ধাকারী জাহাজ হামজা, রুস্তম ও প্রত্যয় মিলেও উদ্ধার করতে বা উত্তোলন করতে পারেনি। প্রশ্ন উঠেছে নৌ পরিবাহন বিভাগের সক্ষমতা নিয়ে। সন্ধান মেলেনি ফেরি ডুবির ঘটনায় নিখোঁজ জাহাজের সহকারী মাস্টার হুমায়ন কবিরের।

শনিবার সকাল সাড়ে ৯টা থেকে একসাথে মিলে উদ্ধারকার্যক্রমে ফেরি তুলার জন্য তিনটি হুকের মধ্যে দু’টি পরানো হয়েছে। বাকি একটি পরানোর কাজ চলছে। এরপর ওপর হওয়া ফেরিটি টেনে তুলা হবে বলে জানিয়েছেন কর্তৃপক্ষ।

তিনটি উদ্ধারকারী জাহাজ একসাথে মিলে উদ্ধার কার্যক্রম শুরু করলেও ডুবে যাওয়া উল্টো হয়ে যাওয়া ফেরিটি এখনো সোজা করতে পারেনি তবে সোজা করার জন্য প্রক্রিয়া করা হচ্ছে।

উদ্ধারকারী জাহাজ রুস্তম ও হামজা মিলে ডুবে যাওয়া ৯টি মালবাহী ট্রাকের মধ্যে ৩টি ট্রাক উদ্ধার হয়েছে।

পাটুরিয়ার ফেরিঘাটের অদূরে পদ্মা নদীতে ডুবে যাওয়া ইউটিলিটি ফেরি রজনীগন্ধা উদ্ধারে বুধবার দুপুর থেকে কাজ করছে বিআইডব্রিউটিএ উদ্ধারকারী জাহাজ হামজা। যে ফেরিটি ডুবে গেছে সেটি উদ্ধারে সক্ষমতা নেই হামজা ও রুস্তমের। কারণ ডুবন্ত ফেরিটির ওজন ২৫০ টনের বেশি।

বিআইডব্লিউটিএ-এর নৌ সংরক্ষণ ও পরিচালন বিভাগের পরিচালক মো: শাহ জাহান জানান, উদ্ধারকারী জাহাজ হামজা ও রুস্তমের সক্ষমতা প্রতিটির ৬০ টন করে।

নারায়নগঞ্জ থেকে আসা প্রত্যয়ের সক্ষমতা ২৫০ টন। সেক্ষেত্রে তিন জাহাজ একত্রে চেষ্টা করলে ডুবে যাওয়া ফেরিটি উদ্ধার করা সম্ভব। ডুবন্ত রজনীগন্ধা ফেরিটির যে পরিমাণ ওজন তা উদ্ধার করা উদ্ধারকারী জাহাজ হামজা ও রুস্তমের সক্ষমতায় নেই। তবে তারা ঘটনাস্থলে ডুবে যাওয়া ট্রাক উদ্ধারের কাজ চালাচ্ছে।

বিআইডব্লিউটিসির আরিচা কার্যালয়ের উপমহাব্যবস্থাপক শাহ মো: খালেদ নেওয়াজ বলেন, আজ ঘাটে থাকা তিনটি উদ্ধারকারী জাহাজ মিলে উদ্ধার কার্যক্রম সকাল সাড়ে ৯টায় শুরু করেছে। আশা করছি উদ্ধার কার্যক্রমে ভালো অগ্রগতি আসবে।

বিআইডব্লিউটিএ-এর চেয়ারম্যান কমডোর আরিফ আহমেদ মোস্তফা বলেন, ডুবে যাওয়া ফেরিটি সোজা করতে তিনটি হুক পরানো হচ্ছে। এর মধ্যে দু’টি হুক পরানো হয়েছে। বাকিটাও ২/৩ ঘণ্টার মধ্যে পরানো হবে। এরপর ফেরিটি তুলার কার্যক্রম শুরু করা হবে।

ইতোপূর্বে এই পাটুরিয়া ঘাটেরই ৫ নম্বর ঘাটে ডুবে যায় রো রো ফেরি আমানত শাহ। তখনই কেন কর্তৃপক্ষ সচেতন হলো না ? কেন চলাচলে আনফিট ফেরি চালানো হচ্ছে ? ইত্যাদি প্রশ্ন অভিঞ্জ মহলের।

বিআইডব্লিউটিএ-এর আরিচা অঞ্চলের সহকারী পরিচালক ৯ (এসিপিএস) নৌ সংরক্ষণ ও পরিচালন তত্ত্বাবধায়ক শেখ রবিউল ইসলাম জানান, সারা বাংলাদেশে মোট ৪টি উদ্ধার জাহাজ আছে। এদের মধ্যে রুস্তম-৫০টন (নতুন কালে ছিল ৬০ টন ), হামজা-৫০ টন (নতুন কালে ছিল ৬০টন ), প্রত্যয়-২৫০ টন এবং দুবার-২৫০ টন উদ্ধার ক্ষমতা আছে। অপর দিকে রো রো ফেরির ওজন ৭৫০ টন।পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া নৌরুটে ৯টি এবং কাজিরহাট রুটে চলে ২টি এই মোট ১১টি রো রো ফেরি চলাচল করে এই রুট দুটিতে।

বর্তমানে ২৫০ টনের ডুবন্তফেরি রজনীগন্ধা উদ্ধারের জন্যে নিয়োজিত করা হয়েছে ৩টি ফেরির মোট ৩৫০ টন সক্ষমতা সম্পন্ন ৩টি উদ্ধারকারী জাহাজ। দেশের মোট ৪টি নৌযান উদ্ধারকারী জাহাজের মোট উদ্ধার সক্ষমতা ৬০০ টন।

বিআইডব্রিউটিএ-এর সাবেক এক কর্মকর্তা নাম না প্রকাশ করার শর্তে বলেন, আসলে এই বিভাগে চলে লুটপাটের উৎসব। সারা বাংলাদেশের নৌযান উদ্ধারের মোট ৪টি জাহারের যৌথ ক্ষমতা হচ্ছে মাত্র ৬০০ টন। কোনো রো রো ফেরি যদি মাঝ নদীতে কোনো দুর্ঘটনায় পতিত হয় তাহলে আসলে উদ্ধারের নাটক করা ছাড়া কোনোভাবেই উদ্ধার করা সম্ভব নয়। যে কোনো রো রো ফেরি উদ্ধার করতে এই চারটি উদ্ধারকারী জাহাজকেই আনতে হবে এবং তা কখনই দু’দিনের মধ্যে সম্ভব নয়।

বিআইডব্রিউটিএ-এর এসিপিএস শেখ রবিউল ইসলাম জানায়, বর্তমানে দুর্বার অবস্থান করছে বরিশালে। পদ্মায় ডুবে যাওয়া ফেরি রজনীগন্ধা উদ্ধারেই দেশের প্রায় সমস্ত উদ্ধার শক্তি নিয়োজিত করা হয়েছে তার কাজ হচ্ছে না। তাহলে ৭৫০ টন ওজনের কোনো রো রো ফেরি দুর্ঘটনায় পতিত হলে দেশের সর্ব্বোচ উদ্ধার শক্তি ৬০০ দিয়ে কিভাবে উদ্ধার করা সম্ভব।

রজনীগন্ধা দুর্ঘটনার সাথে সাথে কর্তৃপক্ষের লোকজন কোনো তথ্য-প্রমাণ ছাড়াই মিডিয়ার কাছে বলতে শুরু করল কোন এক অজানা বাল্কহেডের ধাক্কায় ফেরি ডুবে গেছে। অথচ ফেরিতে থাকা যাত্রীরা মিডিয়ায় সাক্ষাতকার দিয়ে বললো কারো সাথেই ধাক্কা লাগে নাই। মূলত তলা ফেটে ফেরি ডুবে গেছে। তাহলে এই ডাহা মিথ্যা কেন এবং কার স্বার্থে বলা হলো? এমন প্রশ্ন অভিজ্ঞ মহলের।

ইতোপূর্বে সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ারিং কোরের লোকজন ফেরির তেল নিয়ে অনুসন্ধান করলে ফেরি কর্তৃপক্ষের অতিরিক্ত জ্বালানি খরচ দেখানোর বিষয়টি ধরা পড়ে। তখন ফেরি কর্তৃপক্ষ নদীতে তেল ফেলে দেয় এবং সেনাবাহিনীর লোকদের কাছে ধরা পড়ে। বিষয়টি নিয়ে তখন মিডিয়ার ব্যাপক প্রচার হয়, কিন্তু অজ্ঞাত কারণে সেই বিষয়টি আর আলোর মুখ দেখেনি।
ফেরি মেরামতের নামে লুটপাট, নিয়মিত তেল চুরি, যানবাহন পারাপারে অনিয়ম, ড্রেজিং এর নামে নদীর মাটি নদীতেই ফেলা ও মাটির ব্যবসাসহ কোটি কোটি টাকার দুর্নীতি, প্রতিটা ক্ষেত্রে ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতিতে ভরে গেছে দেশের নৌবিভাগ এমন দাবি ওই অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তার।

সব মিলিয়ে এ রুটে চলাচলকারী যাত্রী ও দুর্ঘটনায় পতিত গাড়ির মালিকদের দাবি সুষ্ঠু বিচার বিভাগীত তদন্ত করে এসব দুর্ঘটনার জন্যে দায়ী ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও প্রকৃত কারণগুলো নির্ণয়করে সমাধানের ব্যবস্থা করা হোক।