কুষ্টিয়ার কুারখালীতে বিশ্বাস ফাউন্ডেশনের আওতায় বিশ্বাস সঞ্চয় ঋণদান সমবায়সমিতি লিমিটেডসহ ৯টি জেলার ৫৮টি শাখা থেকে শতকোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ১৭৫টি মামলা হয়েছে প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান আনিসুর রহমান বিশ্বাসের বিরুদ্ধে।
বুধবার নন্দলালপুর ইউনিয়নের সদরপুর তার বাড়িতে গেলে দেখা যায় ঘরবাড়ি তালাবদ্ধ, সপরিবারে পলাতক রয়েছেন বলে জানান স্থানীয়রা।
স্থানীয়রা জানান, কুমারখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে একসময় কর্মরত সামান্য অফিস সহায়ক মৃত ইব্রাহিম বিশ্বাসের ছেলে আনিসুর রহমান বিশ্বাস (আনিস) ২০০৬ সালে বিশ্বাস সঞ্চয় ঋণদান সমবায়সমিতি লিমিটেড নামে এনজিও চালু করেন।
এরপর বিভিন্ন আর্থিক সুবিধা দেবার আশ্বাসে সমিতির সদস্য সংগ্রহ শুরু করেন এই (আনিস) প্রতারক। এনজিওর সদস্যরা লাখে ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার টাকা মাসিক লভ্যাংশের আশায় লাখ লাখ টাকা লগ্নি করতে থাকেন বিশ্বাস ফাউন্ডেশনে।
এভাবেই বাংলাদেশের ৯টি জেলায় বিভিন্ন নামে ৫৮টি এনজিওর শাখা তৈরি করা হয়। ৫৮টি শাখায় প্রায় ১৫৩ জন কর্মী নিয়োগ দেয়া হয় এবং কর্মচারীদের কাছে থেকে একাধিক ফাঁকা চেক ও ষ্ট্যাম্প নেয়া হয় প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তার কথা বলে।
এসব কর্মীদের দিয়ে তাদের আত্মীয়-স্বজনদের বিভিন্নভাবে প্রলোভন দেখিয়ে কোটি কোটি টাকা বিশ্বাস ফাউন্ডেশনে লগ্নি করানো হয়। প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান আনিসুর রহমান বিশ্বাস ও তার ভাই প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং ডিরেক্টর আবু সাঈদ বিশ্বাস দু'জনের ২টি প্রাইভেট কার ছাড়াও অন্যান্য পদস্থ কর্মকর্তাদের জন্য আরো তিনটি প্রাইভেট কার কেনা হয়।
কুষ্টিয়ার কুমারখালীসহ বেশ কয়েকটি উপজেলায় মোট ৬টি টিভি ফ্রিজ ও নিত্য ব্যবহার্যের শোরুম চালু করা হয় এবং এসব শোরুমে মালামাল পরিবহনের জন্য দু’টি কাভার্ড ভ্যান কেনা হয়।
গ্রামে পরিপাটি করে বাড়িঘর নির্মাণ ছাড়াও কুষ্টিয়া-৩ আসনের সংসদ সদস্য মাহাবুব উল আলম হানিফের বাড়ি সংলগ্ন ৭ তলা ভবন ছাড়াও ৪ শতাংশ জমি ক্রয়, কুমারখালী কাজীপাড়া মেইন রোডের সাথে ১৯ শতাংশ মুল্যবান জমি ক্রয় ও ঢাকা বিভিন্ন এলাকায় ৩/৪ টি ফ্ল্যাট কিনে বিলাসী জীবন যাপন করতে থাকেন আনিসুর রহমান ও তার ভাই বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।
২০২২ সালে সারা বাংলাদেশে ঋণ কার্যক্রম পরিচালনার উদ্দেশ্যে মালঞ্চ ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশ নামের এমআরএ সনদ ৪৫ লাখ টাকায় ক্রয় করেন বলেও বিশ্বস্থ্য সূত্রে জানা যায়।
এছাড়াও তার বিদেশ ভ্রমন, দুই ছেলের রাজকীয় ভাবে বিয়ে, উপহার, ব্যায়বহুল প্রতিষ্ঠানে সন্তানদেও পড়াশোনাসহ বিভিন্ন ভাবে খরচ করে ফেলেন সিংহভাগ টাকা বলে জানা যায়।
২০২৩ সালের শুরুতেই ধ্স নামে বিশ্বাস ফাউন্ডেশনের। সদস্যরা বিষয়টি অনুমান করতে পেরে তাদের লগ্নিকৃত টাকা ফেরত চাইলে শুরু হয় নানা টাল বাহানা। একাধিকবার সময় দিয়েও টাকা ফেরত না দিলে সদস্যদের চাপে আলাউদ্দিন নগরের বিশ্বাস ফাউন্ডেশন এর মূল অফিসে তালা ঝুলিয়ে লাপাত্তা হয়ে যায় এনজিও কর্তৃপক্ষ।
ওই নিয়ে ২০২৩ সালের নভেম্বরে টাকা ফেরত ও অভিযুক্তদের শাস্তির দাবিতে সদরপুর গ্রামে আনিসুর রহমানের বাড়ি ঘেরাও এবং মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করে শত শত সদস্য। এরপর থেকেই অভিযুক্ত আনিস সম্পূর্ণভাবে গা ঢাকা দিয়েছে। এর আগে বিদেশ পালিয়ে যাওয়ার গুঞ্জন উঠলে স্থানীয় ছাত্রলীগ নেতা তার পাসপোর্ট কেড়ে নেয়। পাসপোর্ট হারিয়ে গেছে বলে সাধারণ ডায়েরি করে নতুন পাসপোর্ট সংগ্রহ করে যেকোনোভাবে আনিস বিদেশে পালিয়ে যেতে পারে বলে জানান তারা।
ভুক্তভোগী সরোয়ার আলম জানান, বিশ্বাস ফাউন্ডেশনে আমার জমা আছে ৬০ লাখ টাকা। তিনি ও তার আত্মীয়-স্বজন সব মিলিয়ে প্রায় দুই কোটি টাকা বিভিন্নভাবে প্রলোভন দেখিয়ে লগ্নি করানো হয় বলে জানান।
আরেক ভুক্তভোগী আব্দুল্লাহ আল মামুন (মিলন) জানান, তার ১৯ লাখ টাকা লগ্নি করা ছিল। কোনোভাবেই তিনি তার টাকা উদ্ধার করতে পারেননি। আনিসসহ সকলে গা ঢাকা দেয়ায় গ্রাহকরা ইতোমধ্যেই ১৭৫টি মামলা করেছেন আদালতে। এ বিষয়ে আনিস নিজেই তার ফেজবুকে পোস্ট করে জানান দেন।
আরেক ভুক্তভোগী লিয়াকত আলী বিশ্বাস জানান, আমার প্রায় ১ কোটি টাকা বিভিন্ন কৌশলে নিয়েছে প্রতারক আনিস। আমি কোটে মামলাও করেছি। আমি সঠিক বিচার চাই। তবে আনিস যেন কৌশলে দেশ ছেড়ে পালাতে না পারে সেজন্য প্রশাসনের আসু হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত আনিসের সাথে মোবাইলফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে নাম্বার বন্ধ পাওয়া যায়।
কুমারখালী উপজেলা নিবার্হী কর্মকর্তা মাহবুবুল হক বলেন, বিশ্বাস ফাউন্ডেশন নামে একটি এনজিও গ্রাহকদের টাকা নিয়ে আত্মগোপন করেছে এমন তথ্য পেয়েছি। এ ব্যাপারে গ্রাহকরা মামলাও করেছেন। আদালত দোষীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিবেন।





