কিশোরগঞ্জে চলমান ট্রাক থেকে মাটি পড়েছে পাকা সড়কে। গত দু’দিন গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টির কারণে সড়কের মাটি এখন কাদায় পরিণত হয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে চাকা পিছলে যানবাহনের দুর্ঘটনা তো ঘটছেই, সাধারণ মানুষও পায়ে হেঁটে চলাচল করতে পারছে না।
কিশোরগঞ্জ-ছয়না ডিসিসি সড়কের সাদকখালি মোড় থেকে মরিচখালি বাজার পর্যন্ত এবং আব্দুল হামিদ সড়কের নিকলী থেকে করিমগঞ্জের খয়রত মোড় পর্যন্ত দুই সড়কের ১৫ কিলোমিটারে এই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।
শুক্রবার (২৩ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে সরেজমিনে দেখা যায়, খয়রতের মোড় থেকে পূর্ব দিকে এক কিলোমিটার এবং পশ্চিম দিকে ডিসিসি রোডে মদন গুণধরসহ জয়কা ইউনিয়ন পার হয়ে সাদকখালি পর্যন্ত আট কিলোমিটার সড়ক কাদাপানিতে একাকার।
এদিকে খয়রত মোড় থেকে নিকলী উপজেলা সদর পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদ সড়কেরও একই অবস্থা। কাদার কারণে যানবাহন চলাচল করতে পারছে না। বিশেষত দুর্ভোগের মুখে পড়েছেন মোটরসাইকেলের চালকেরা। দুর্ঘটনার ঝুঁকি নিয়ে তারা সড়কে বের হলেও হাত পা ছিলে ঘরে ফিরতে হচ্ছে। কারো ঠাঁই হচ্ছে হাসপাতালে।
কাদার কারণে সড়কের পাশের লোকজন ও ব্যবসায়ীদেরও পড়তে হয়েছে চরম ভোগান্তিতে। খয়রতের মোড় এলাকার কয়েকজন দোকানদারকে কোদাল দিয়ে সড়কের কাদা সরাতে দেখা গেছে।
লোকজনের সাথে কথা বলে জানা যায়, এই এলাকার বড় হাওরের ফসলি জমির উপরিভাগের মাটি কৃষকেরা অবৈধভাবে বিক্রি করে দিচ্ছে ইট ভাটায়।
কিশোরগঞ্জ ও ময়মনসিংহ জেলার অন্তত ৪০টি ইটভাটায় এসব মাটি যাচ্ছে। ভাটায় মাটি নেয়ার জন্য এই দুই সড়ক দিয়ে দিনরাত চলাচল করে ট্রাক ও ট্রলি। পরিবহনের সময় খোলা ট্রাক ও ট্রলি থেকে মাটি পড়ে সড়কে। গত বৃহস্পতিবার থেকে গতকাল পর্যন্ত কয়েক দফা গুঁড়িগুঁড়ি ও হালকা বৃষ্টি হয়েছে। ফলে সড়কে কাদাপানির সৃষ্টি হয়েছে। পিচ্ছিল হয়ে গেছে সড়ক।
শুক্রবার বিকেলে কয়েক দফা হালকা বৃষ্টি হওয়ায় পরিস্থিতি আরো খারাপ হয়েছে। ফলে গত দুই দিনে দুটি সড়কে যানবাহন চলাচল সীমিত হয়ে পড়েছে। বৃহস্পতিবার দুপুর থেকে গতকাল দুপুর পর্যন্ত সড়ক দুটিতে অন্তত ৬০ থেকে ৭০টি মোটরসাইকেল কাদায় পিছলে দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে।
খয়রত মোড় এলাকার বাসিন্দা আবু সজিব(৩৫) বলেন, 'ভাটার ট্রাকের জন্য বিপদে আছি। এত দিন ধুলার মধ্যে ছিলাম। এখন কাদার মধ্যে আছাড় খেতে হচ্ছে। বৃহস্পতিবার বিকেলে মোটরসাইকেল নিয়ে বের হয়েছিলাম, আল্লাহ রক্ষা করেছে, কাদায় পড়ে গিয়ে হাত পা ছিলে ঘরে ফিরেছি।'
মোড়ের মিষ্টান্ন ব্যবসায়ী জামাল উদ্দিন (৩১) বলেন, ‘এখানে দিনরাত ২৪ ঘণ্টা মাটি বহনকারী ট্রাক যাওয়া–আসা করে। ট্রাকের ধুলাবালি ও কাদা দোকানের ভেতরে আইসা পড়ে। আমরা বড় বিপদের মধ্যে আছি।’
আব্দুল হামিদ সড়কের ভাটি নানশ্রী বাজারের মনোহারী ব্যবসায়ী মোহাম্মদ নাঈম (২৫) বলেন, ‘দোকানে এক দণ্ড বইসা থাকার উপায় নাই। আগে ধুলা খাইতাম। এখন খাচ্ছি কাদা। কার কাছে গেলে যে এর সমাধান পাব, জানি না।’
কিশোরগঞ্জ শহর থেকে এ দুটি সড়ক হয়ে প্রতিদিন মোটরসাইকেলে বাড়িতে যাওয়া-আসা করেন নিকলীর কারপাশা ইউপি চেয়ারম্যান তাকি আমান খান।
তিনি বলেন, ‘আমাদের এলাকায় এই সমস্যাটি দীর্ঘ দিনের। প্রশাসনকে জানালেও বিষয়টি তারা দেখছে না।’
গুনধর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো: আবু ছায়েম রাসেল ভূঁইয়া বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে এ এলাকায় ট্রাক দিয়ে মাটি কাটা হচ্ছে। ট্রাক যাওয়ার সময় মাটি সড়কে পড়ছে। করিমগঞ্জের ইউএনওকে আমি একাধিকবার বিষয়টি জানিয়েছি। এখন কার কাছে গেলে যে এর সমাধান পাব, জানি না।’
করিমগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারহানা আলী নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘করিমগঞ্জে আমি নতুন এসেছি। বিষয়টি আমার জানা নেই। এ বিষয়ে আমি খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা নেব।’
কিশোরগঞ্জ সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী রিতেশ বড়ুয়া বলেন, ‘সমস্যাটি আমাদের নজরে রয়েছে। ইটভাটার মালিকদের এ বিষয়ে একাধিকবার আমরা সতর্ক করেছি। মাঝেমধ্যে কয়েকটি ট্রলিকে আটক করে জরিমানাও করা হয়েছে। এরপরেও ট্রাক ট্রলিগুলোর দাপট থামছে না। প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ছাড়া এ সমস্যার সমাধান হবে বলে মনে হয় না। আগামী জেলা সমন্বয় কমিটির মাসিক সভায় বিষয়টি উপস্থাপন করা হবে।’





