গ্রামবাংলায় একটা সময় বেশির ভাগ বাড়িতে পারিবারিকভাবে মহিষ পালন করতে দেখা যেত। বর্ষা মৌসুমে গ্রামাঞ্চলের বিলের দিকে তাকালে দেখা যেত মহিষের পাল। দল বেঁধে খাওয়া আর বিলকে মাতিয়ে রাখাই ছিল মহিষের কাজ। গ্রামের মধ্যে যাদের বেশি পরিমাণে জমি থাকত তাদের মহিষের সংখ্যাও বেশি থাকত। মহিষের মাংস আর দুধের জন্য লালন-পালন করত তখনকার কৃষকরা। হালচাষের জন্য ছিল মহিষের আলাদা কদর।
সময়ের বিবর্তনে এখন আর তেমনটি চোখে পড়ে না। দলবেঁধে ঘুরতে দেখা যায় না বিলে ঝিলে। বর্ষা মৌসুমে হালচাষে নেই মহিষের উপস্থিতি। দুধ আর মাংসের জন্য বিখ্যাত হলো এখন আর মাঠে ঘাটে কিংবা বিলে মহিষের বিচরণ চোখে পড়ে না। অনেকে বলছেন, খাবার সঙ্কটে বিলুপ্তির পথে ঐতিহ্যবাহী মহিষ পালন।
পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে দেখা গেছে, হাতেগোনা কয়েকটি পরিবারে বাপ-দাদার পারিবারিক ঐতিহ্য ধরে রেখে মহিষ পালন করছেন কেউ কেউ। একদিকে মহিষের খাদ্য সঙ্কট, অন্যদিকে গ্রামগঞ্জের খালনালা দখল হয়ে যাওয়ায় এবং পানি না থাকায় হারিয়ে যেতে বসেছে মহিষ পালনের সেই ঐতিহ্য।
স্থানীয় এক মহিষ পালনকারী বলেন, একটা সময় আমরা বিলে মহিষ ছেড়ে দিয়ে দাঁড়িয়াবন্দা কিংবা হা-ডু-ডু খেলতাম। এখন পুরো খালে কিংবা বিলের কোথাও পানি নেই। ঘাসও তেমন জন্মায় না। মহিষের খাবারের বড় অভাব। তা ছাড়া রোগ বালাই পেয়ে বসে মহিষদের।
আগের দিনে বিশেষ করে হাল চাষ করার প্রধান মাধ্যম ছিল মহিষ। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত টানা হালচাষ করা যেত মহিষ দিয়ে। তখনকার সময়ে পাওয়ার টিলার ছিল না। খরচ লাগত কম হালচাষে। এখন আর মহিষ দিয়ে কেউ চাষাবাদ করে না। আমরা যারা মহিষ লালন পালন করি, বড় কষ্ট করতে হয় মহিষদের জন্য। ওদের খাবার জোগাড় করা, পানির ব্যবস্থা করা এবং চিকিৎসা সেবা দেয়া- সব কিছুতেই সঙ্কট দেখা দেয়। হয়তো কয়েক বছর পর কেউ মহিষ পালন একেবারেই ছেড়ে দিবে।
নীলগঞ্জ ইউনিয়নের দৌলতপুর গ্রামের বাসিন্দা জাকির হাওলাদার বলেন, আমাদের একটা সময় ৬০-৭০টি মহিষ ছিল। এ গ্রামের অনেকেই মহিষ পালন করত। এখন আমাদের পরিবারে ২০টির মতো মহিষ আছে। খাবার ও পানির অভাবে মহিষ পালন করা যায় না। মহিষের খাবার কিনে খাওয়ানোও সম্ভব নয়। প্রতিদিন দুই মণ খাবার ও এক মণ পানির প্রয়োজন হয়। এখন আর মহিষ দিয়ে হাল চাষও হয় না। সব মিলিয়ে মহিষ এখন বিলুপ্ত প্রায়।
একই এলাকার বাসিন্দা হানিফ শরীফ বলেন, মহিষ পালনে লাভবান হওয়া যায়। এক বছর বয়সী একটি মহিষের বাচ্চা ৫০-৬০ হাজার টাকায় বিক্রি করা যায়। প্রতিদিন ৫-৬ কেজি দুধ দোহন করা যায়। একটা মহিষ জবাই করলে প্রায় ছয় মণ গোশত পাওয়া যায়। এসবের পরও খাবার, ওষুধ ও পানি সঙ্কটে অনেক কৃষক মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে মহিষ পালনে।
পশু চিকিৎসক আবু সাঈদ জানান, নীলগঞ্জ ইউনিয়নে হাতেগোনা তিন-চারটি পরিবার মহিষ পালন করে। তবে খাদ্য ও চিকিৎসা ব্যবস্থা সহজলভ্য হলে অনেকেরই আগ্রহ তৈরি হতো মহিষ পালনে।
জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা: ফজলুল হক সরদার বলেন, মহিষ পালন একেবারে কমে যাচ্ছে-এমন ধারণা ভুল। কলাপাড়া উপজেলায় দুটি উৎপাদন গ্রুপ আছে। প্রত্যেক গ্রুপে ৪০ জন সদস্য আছে। কলাপাড়া উপজেলায় প্রায় ১৩ হাজার মহিষ আছে যা পারিবারিক খামারে বেড়ে উঠছে। তবে মহিষের খাদ্য সঙ্কট আছে। আমরা মুজিব কিল্লায় এবং পরিত্যক্ত জঙ্গলে ঘাস উৎপাদন করা যায় কি না এ ব্যাপারে পদক্ষেপ নিতে চেষ্টা করছি।
খাবার সঙ্কটে বিলুপ্তির পথে মহিষ পালন
গ্রামবাংলায় একটা সময় বেশির ভাগ বাড়িতে পারিবারিকভাবে মহিষ পালন করতে দেখা যেত। বর্ষা মৌসুমে গ্রামাঞ্চলের বিলের দিকে তাকালে দেখা যেত মহিষের পাল। দল বেঁধে খাওয়া...





