‘আমাদের জাহাজ জলদস্যুদের কবলে পড়েছে। আমাদের ইঞ্জিন বন্ধ করে দিতে হইছে। ক্যাপ্টেন স্যারকে ক্যাপচার করে নিছে। দোয়া করো, আমাকে মাফ করে দিও’। পরে বিকেল ৫টায় আবার ফোন দিয়ে বলেছে, ‘আমাদের সোমালিয়ায় যেতে বাধ্য করা হচ্ছে। এখন আমরা সোমালিয়ার উদ্দেশে রওনা দিচ্ছি। যেতে তিন দিন লাগবে। তারপর থেকে আর যোগাযোগ নেই।’

অঝোরে কাঁদতে কাঁদতে এভাবে সাংবাদিকদের সামনে কথাগুলো বলছিলেন খুলনার তৌফিকুলের (জলদস্যুদের হাতে বন্দী) স্ত্রী জোবাইদা নোমান।

জলদস্যুদের হাতে বন্দী বাংলাদেশী জাহাজ ‘এমভি আবদুল্লাহ’র সেকেন্ড ইঞ্জিনিয়ার (দ্বিতীয় প্রকৌশলী) মো: তৌফিকুল ইসলাম খুলনা মহানগরীর সোনাডাঙ্গা থানার ২০/১ করিমনগর এলাকার মো: ইকবাল এবং দিল আফরোজা দম্পতির ছেলে। তিন ভাইয়ের মধ্যে তিনি সবার ছোট। এ ঘটনায় পরিবারের সদস্যরা উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার দিন কাটাচ্ছেন। গত মঙ্গলবার বিকেলে জিম্মি হওয়ার ঘটনা জানার পর থেকে দুশ্চিন্তা কাটছে না তাদের।

তৌফিকের ৭ বছর বয়সী মেয়ে তাসফিয়া তাহসিনা ও ৫ বছর বয়সী ছেলে আহমদ মুসাফি বাবার বন্দী হওয়ার খবর শোনার পর থেকেই অঝোরে কাঁদছে। পরিবারের দাবি, তৌফিকুলসহ দ্রত সবাইকে ভালোভাবে ফিরিয়ে আনার।

বুধবার দুপুরে তৌফিকের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, তার বাবা মো: ইকবাল বাড়িতে নেই। বাড়ির ভেতরে ঢুকতেই কানে আসে কান্নার আওয়াজ। দুই সন্তানকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছিলেন তৌফিকুলের স্ত্রী জোবাইদা নোমান। পাশে বসে শাড়ির আঁচল দিয়ে চোখ মুছছেন ৭২ বছরের বৃদ্ধা শাশুড়ি দিল আফরোজা।

জোবাইদা নোমান বলেন, মঙ্গলবার বিকেলে শাশুড়ি মায়ের সাথে কথা বলার আগে বেলা ২টার দিকে তার সাথে যোগাযোগ হয় তার স্বামীর। এ সময় তৌফিক জলদস্যুদের কবলে পড়ার বিষয়টি মা-বাবাকে জানাতে নিষেধ করেন। একই সাথে তার জন্য দোয়া করার কথাও বলেন তিনি।

সে কিভাবে আছে জানি না। ২০০৮ সাল থেকে আমার স্বামী জাহাজে চাকরি করলেও এ ধরনের বিপদে এই প্রথমবার পড়েছে। তিনি বলেন, ওরা (জলদস্যুরা) এখনো কোনো দাবি জানায়নি। এ বিষয়ে কোনো সংবাদও আমরা পাইনি।

জোবাইদা নোমান আরো বলেন, এখনো সরকারের পক্ষ থেকে আমাদের সাথে যোগাযোগ করা হয়নি। সরকারের কাছে আমাদের দাবি যেকোনো মূল্যে, যত দ্রুত সম্ভব তাদেরকে সুস্থভাবে আমাদের কাছে ফিরিয়ে আনা হোক। সরকার ও সংশ্লিষ্ট কোম্পানি যেন তাদের দ্রুত ফিরিয়ে আনে।

কাঁদতে কাঁদতে তৌফিকের মা দিল আফরোজা বলেন, ছেলেকে জিম্মি করার কথা শোনার পর তাকে কয়েকটি দোয়া পড়ার কথা বলি। তখন সে আমাদের সবার কাছে ক্ষমা চেয়ে নেয়। কথা বলার একপর্যায়ে জলদস্যুরা তার ফোন কেড়ে নেয়।

তিনি বলেন, ‘মঙ্গলবার বিকেল ৫টায় ফোন করে প্রথমে বলে আম্মা কেমন আছেন। তুমি কেমন আছো সেটা বলো। শুনলাম তোমাদের নাকি আটকায় রাখছে। বলল, ভালো আছি। ভালো আছো, তার পরেও একটি দোয়ার কথা বলে তাকে পড়তে বললাম। বললাম, দোয়াটি তোমাদের সবার কাজে লাগবে। এরপর সে আম্মা বলল, আর তখনই মোবাইলটি কেড়ে নিছে। তারপর থেকে তার সাথে আর কথা বলতে পারিনি। ছেলের সাথে যোগাযোগ থাকলে অন্তত স্বস্তিতে থাকতে পারতাম। গত ২৫ নভেম্বর সে বাড়ি থেকে চট্টগ্রামে ওই জাহাজে গিয়েছিল।’

তিনি বলেন, সরকারের কাছে এটাই আমাদের দাবি, সবাই যাতে নিরাপদে মা, বাবা, স্ত্রী, সন্তানের কাছে ফিরে আসতে পারে।’

‘ছেলের সাথে যোগাযোগ করতে পারছি না। জানি না সে কী অবস্থায় আছে। আমাদের দাবি, শুধু আমার ছেলে না, সবাইকে দ্রুত সুস্থভাবে-ভালোভাবে উদ্ধারের ব্যবস্থা করা হোক’, বলেন তিনি।

এদিকে জাহাজটি এখন কোথায় আছে আর কেমন আছে বন্দী ২৩ নাবিক? এ বিষয়ে মালিকানা প্রতিষ্ঠান কেএসআরএম’র মিডিয়া অ্যাডভাইজার মিজানুল ইসলাম বিবিসি বাংলাকে বলেন, ‘একটি গোপন ডিভাইসের মাধ্যমে আমরা গভীর রাতে একজন বন্দী নাবিকের সাথে কথা বলেছি। তারা সবাই সুস্থ আছে। তবে এখনো কোন ধরনের মুক্তিপণ দাবি করেনি।’

নাবিকরা বন্দী হওয়ার পর থেকে উদ্বেগ উৎকণ্ঠা বাড়ছে পরিবারে। এই অবস্থা থেকে তারা কবে মুক্তি পাবে জানতে পরিবার ভিড় করছে চট্টগ্রামের আগ্রাবাদে কেএসআরএম’র অফিসের সামনে।

এমন পরিস্থিতিতে মঙ্গলবার দুপুরে সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘জাহাজটি এখনো জলদস্যুদের নিয়ন্ত্রণেই আছে। ২৩ জন বন্দী নাবিকের জীবন রক্ষা করে নিরাপদে নিয়ে আসা আমাদের প্রথম কাজ। আমরা সেই কাজটি করার চেষ্টা করছি।’

দখলে নেয়ার পর গতকাল সন্ধ্যা থেকে জাহাজটি সোমালিয়া উপকূলের দিকে নিয়ে যাচ্ছিলো জলদস্যুরা।

বাংলাদেশ নৌপরিবহন অধিদপ্তরে মহাপরিচালক কমোডোর এম মাকসুদ আলম বিবিসি বাংলাকে বলেন, ‘সোমালিয়ার রাজধানী মোগাদিসু থেকে বতর্মানে ৪৮০ নটিক্যাল মাইল দূরত্বে অবস্থান করছে জাহাজটি। গতিপথ দেখে মনে হচ্ছে জলদস্যুরা এটিকে সোমালিয়া উপকূলের দিকে নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে।’