অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে হাসিনা সরকারের সময় গত কয়েক মাসে প্রায় প্রতি সপ্তাহে আদালতে হাজিরা দিতে হয়। আদালতে লোহার তৈরি খাঁচার কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হতো। ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর গত ৭ আগস্ট শ্রম আইন লঙ্ঘনের মামলায় ড. ইউনূসসহ চারজনকে শ্রম আদালতের দেয়া ছয় মাসের সাজা বাতিল করেন ঢাকার শ্রম আপিল ট্রাইব্যুনাল। তবে তার বিরুদ্ধে গ্রামীণ টেলিকমের শ্রমিক-কর্মচারীদের কল্যাণ তহবিলের ২৬ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলা এখনো সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য রয়েছে।
গত ৫ আগস্ট ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৪ এর বিচারক সৈয়দ আরাফাত হোসেনের আদালতে ড. ইউনূসসহ ১৪ জনের বিরুদ্ধে দুদকের মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণের দিন ধার্য ছিল। কিন্তু একই দিন গণ-অভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে ভারতে পালিয়ে যান। এ কারণে আর এ আদালত বসেনি এবং মামলার শুনানি হয়নি। আগামী ৫ সেপ্টেম্বর এ মামলার পরবর্তী সাক্ষ্যগ্রহণের দিন রাখা হয়েছে।
দুদকের এ মামলা ছাড়াও ড. মুহাম্মদ ইউনূস যেসব প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান বা শীর্ষ পদে রয়েছেন এমন প্রায় শতাধিক কোম্পানির বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে বলে জানা গেছে।
এ বিষয়ে ড. ইউনূসের আইনজীবী ব্যারিস্টার আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, দুর্নীতি দমন কমিশনের মামলা বাতিলের আবেদন হাইকোর্ট খারিজ করলেও এটার বিরুদ্ধে আমরা আপিল বিভাগে যেতে পারি। আবার হাইকোর্ট আদেশ রিকলও করতে পারেন। তিনি আরো বলেন, ব্যক্তি হিসেবে তার বিরুদ্ধে অন্য কোনো মামলা নেই। তবে তিনি যেসব প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান বা এমডি এমন প্রায় শতাধিক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে।
‘অভিশপ্ত জীবনের একটা বড় পর্যায়ে পৌঁছে গেছি’: গত ২ জুন ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৪ আদালতে লোহার খাঁচার তৈরি কাঠগড়ায় দাঁড়ান ড. ইউনূস। আদালত থেকে বের হয়ে এ বিষয়ে ড. ইউনূস সাংবাদিকদের বলেন, অভিশপ্ত জীবনের একটা বড় পর্যায়ে পৌঁছে গেছি। সেটা বুঝলাম যে এই অভিশাপ অনেক উপরে নিয়ে গেছে। তিনি বলেন, অভিশপ্ত জীবনেও একটি শীর্ষ বিন্দু আছে। আজ সে রকম একটা শীর্ষ বিন্দুতে। এই প্রথম লোহার খাঁচায় কাঠগড়াতে দাঁড়ানো। এটা একটা দেখার মতো দৃশ্য। এটা আমার জীবনের একটা স্মরণীয় ঘটনা যে লোহার খাঁচার ভেতরে দাঁড়িয়ে আছি আদালতের কাঠগড়ায়। এ অভিশপ্ত জীবনের একটা অংশ।
গত ১২ জুন ড. মুহাম্মদ ইউনূসসহ ১৪ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরু করার আদেশ দেন আদালত। ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৪ এর বিচারক সৈয়দ আরাফাত হোসেনের আদালত এ আদেশ দেন।
গ্রামীণ টেলিকমের কর্মীদের লভ্যাংশের ২৫ কোটি ২২ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে করা এই মামলায় গত ১ ফেব্রুয়ারি ঢাকার সিনিয়র স্পেশাল জজ আছাদুজ্জামানের আদালতে চার্জশিট দাখিল করেছেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা। গত ২৯ জানুয়ারি দুদকের প্রধান কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত কমিশন বৈঠকে ড. ইউনূসসহ ১৪ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট অনুমোদন দেয়া হয়।
চার্জশিটভুক্ত ১৪ আসামি হলেন- গ্রামীণ টেলিকমের চেয়ারম্যান ড. মুহাম্মদ ইউনূস, ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাজমুল ইসলাম, পরিচালক ও সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক আশরাফুল হাসান, পরিচালক পারভীন মাহমুদ, নাজনীন সুলতানা, মো: শাহজাহান, নূরজাহান বেগম ও পরিচালক এস এম হাজ্জাতুল ইসলাম লতিফী, অ্যাডভোকেট ইউসুফ আলী, অ্যাডভোকেট জাফরুল হাসান শরীফ, গ্রামীণ টেলিকম শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়নের সভাপতি মো: কামরুজ্জামান, সাধারণ সম্পাদক ফিরোজ মাহমুদ হাসান, শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়নের দফতর সম্পাদক কামরুল হাসান ও প্রতিনিধি মো: মাইনুল ইসলাম।
শ্রম আইন লঙ্ঘনের মামলা বাতিল : গণ-অভ্যুত্থানের পর গত ৭ আগস্ট শ্রম আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে মামলায় ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে দেয়া ছয় মাসের সাজা বাতিল করেন আদালত। একই সাথে এ মামলায় ড. ইউনূসসহ চারজনের আপিল মঞ্জুর করে তাদেরকে মামলা থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়। ঢাকার শ্রম আপিল ট্রাইব্যুনালের সদস্য জেলা ও দায়রা জজ এম এ আউয়ালের আদালতে এ রায় দেন।
হাইকোর্টে অনুনয় করেও একটি রুল পাননি : গ্রমীণ টেলিকমের শ্রমিক-কর্মচারীদের কল্যাণ তহবিলের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে দুদক মামলায় অভিযোগ গঠনের আদেশ বাতিল চেয়ে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের আবেদন গত ২৪ জুলাই খারিজ করেন হাইকোর্টের একটি হাইকোর্ট। একই সাথে আগামী এক বছরের মধ্যে এ মামলার বিচারকাজ সম্পন্ন করতে বলেন আদালত। বিচারপতি মো: নজরুল ইসলাম তালুকদার ও বিচারপতি কাজী ইবাদত হোসেনের হাইকোর্ট বেঞ্চ এ আদেশ দেন।
এই মামলায় আইনগত বিষয় উত্থাপন করে ড. ইউনূসের আইনজীবী ব্যারিস্টার আবদুল্লাহ আল মামুন একটি রুল ইস্যু করার জন্য অনুনয়বিনয় করে ব্যর্থ হন। আদেশের পর তিনি বলেছিলেন, ড. ইউনূসের ভাগ্য এতটাই খারাপ, অবহেলিত যে তিন দিন শুনানি করে মামলাটিতে রুল পর্যন্ত ইস্যু না করে আজকে এটা খারিজ করে দিয়েছেন।
আজকের ছবিটি তুলে রাখুন : গত ২ মার্চ দুদকের মামলায় ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতে জামিন নিতে যান ড. মুহাম্মদ ইউনূস। জামিন পেয়ে ওই দিন তিনি আদালতের সামনে অপেক্ষমাণ সাংবাদিকদের বলেছিলেন, এটা ঐতিহাসিক একটি সময়। আজকের ছবিটি তুলে রাখুন। আপনারা ইতিহাসের সাক্ষী। এটা একটা ঐতিহাসিক ঘটনা। যেহেতু একজন নোবেলজয়ীকে অর্থ আত্মসাৎ, জালিয়াতি ও মানিলন্ডারিংয়ের অভিযোগ দেয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, আমি একা নই আমরা আরো সাতজন। যারা সারা জীবন কঠোর পরিশ্রম করেছি গরিব মানুষের জন্য। যারা চাকরি করতে এখানে আসেননি। তারা তাদের জীবন দানের জন্য এখানে এসেছেন। তারা এই অর্থ আত্মসাৎ, জালিয়াতি এবং মানিলন্ডারিংয়ের জন্য অপেক্ষা করছে। কাজেই এই ছবিটা একটা গুরুত্বপূর্ণ ছবি হবে। তারা এখানে উপস্থিত আছেন। তারা জন্ম জন্মান্তরে বলতে পারবেন তারা এখানে উপস্থিত ছিলেন।
দুর্নীতি, অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ কি আমার গায়ে লাগানোর মতো : গত ২ মে ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৪ এর আদালতে জামিনের মেয়াদ বৃদ্ধি করতে এসে ড. মুহাম্মদ ইউনূস সাংবাদিকদের বলেন, দুঃখভারাক্রান্ত হৃদয়ে বলছি, আমার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ আনা হয়েছে। জালিয়াতির অভিযোগ আনা হয়েছে। অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়েছে। আনা হয়েছে অর্থ পাচারের অভিযোগ। আপনারা আমাকে বহুদিন থেকে চিনছেন। এই অপরাধগুলো আমার গায়ে লাগানোর মতো অপরাধ কি না, সেটা আপনারা বিবেচনা করবেন। আগে যে রকম বিবেচনা করেছেন।
ন্যায়বিচার পাচ্ছি না, এটার ব্যাকগ্রাউন্ডে কী আছে দেশের মানুষ বোঝে : শ্রমিক-কর্মচারীদের কল্যাণ তহবিলের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে দুদকের মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণের দিন ধার্য থাকায় গত ১৫ জুলাই আদালতে হাজিরা দেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস। ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৪ এর বিচারক সৈয়দ আরাফাত হোসেনের আদালতে মামলাটি উচ্চ আদালতে বিচারাধীন রয়েছে উল্লেখ করে সময় আবেদন করেন। তবে প্রথমে আদালত সাত দিন সময় দিয়ে আগামী ২৩ জুলাই সাক্ষ্য গ্রহণের দিন ধার্য করেন। এরপর ড. ইউনূসের আইনজীবী অনেক অনুনয়বিনয় করার পর ৫ আগস্ট দিন ধার্য করেন।
ওই দিন আদালতের কার্যক্রম শেষ হলে সাংবাদিকরা তাকে প্রশ্ন করেন তিনি কি ন্যায়বিচার পাচ্ছেন। জবাবে ড. ইউনূস বলেন, না না পাচ্ছি না। কেন বিচার পাচ্ছেন না, কেন মনে করছেন বিচারটা পাচ্ছেন না? এই প্রশ্নের জবাবে ড. ইউনূস বলেন, আমরা দেখছি যে পাচ্ছি না। এটার ব্যাকগ্রাউন্ডে কী আছে। কিভাবে আছে দেশের মানুষ সবাই বোঝে। তারা বুঝে নেবেন। ড. ইউনূস বলেন, তারিখ নিয়ে যে রকম ধস্তাধস্তি করতে হলো, মনটা খারাপ হয়ে গেল। তবে একটা ভালো লাগলো যে আজকে ওই খাঁচার ভেতরে আমাদেরকে ঢোকায়নি। খাঁচার বিষয়টি আমি বারবার বলতে থাকব, কারণ এটা জাতির প্রতি মস্ত বড় অপমান। এই অপমান আমাদের সহ্য করা উচিত না। এর ব্যবহার থেকে আমরা মুক্তি পেতে চাই। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ড. ইউনূস বলেন, লোহার খাঁচা মানবতার প্রতি অপমান। কেন পশুর মতো একজন মানুষকে খাঁচার ভেতর ভরে রাখবে? এটা সরিয়ে ফেলা উচিত।
আপিল বিভাগেও আদেশ পাননি ড. ইউনূস : গত বছরের ৩ আগস্ট ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে শ্রম আদালতে অভিযোগ গঠনর আদেশ কেন বাতিল হবে না মর্মে হাইকোর্টের জারি করা রুল শুনানির জন্য আদালত পরিবর্তন করে দেন আপিল বিভাগ। বিচারপতি এস এম কুদ্দুস জামান ও বিচারপতি ফাহমিদা কাদেরের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চে দুই সপ্তাহের মধ্যে রুল শুনানি করতে আদেশ দেন আপিল বিভাগ। তৎকালীন প্রধান বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকীর নেতৃত্বাধীন ছয় বিচারপতির আপিল বিভাগের বেঞ্চ এ আদেশ দেন।
এর আগে একই বছরের গত ২৩ জুলাই ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বিরুদ্ধে শ্রম আদালতে অভিযোগ গঠনের আদেশ কেন বাতিল হবে না তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেন বিচারপতি মো: রুহুল কুদ্দুসের নেতৃত্বাধীন হাইকোর্ট বেঞ্চ।





