রাজধানীর শনির আখড়া ইটালি খালপাড় এলাকায় দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে স্ত্রী আয়েশা বেগমসহ, তিন মেয়ে আর এক ছেলে নিয়ে সুখের সংসার ছিল সিএনজি চালক মো: হাবিব মিয়ার (৪৫)।
দ্বীপ জেলা ভোলার লালমোহন উপজেলার ধলীগৌরনগর ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের চরমোল্লাজী গ্রামের কাদির মৌলভী বাড়ির মো: সফিউল্লাহ মিয়ার ছেলে মো: হাবিব মিয়া পেশায় সিএনজিচালক। তিনি বিভিন্ন সময় অটোরিকশা কখনো সিএনজি চালিয়ে পরিবারের পাঁচ সদস্যের ভরনপোষণ ও পড়া লেখার খরচ যোগাতেন। তিনি জীবনের বেশিরভাগ সময় অসুস্থ থেকে ও কঠোর পরিশ্রম করতেন। ছোট বেলায় তার বাবা সফিউল্লাহ মিয়া মারা গেলে জমি জমা না থাকায় অসহায় হয়ে পড়লে ঢাকায় চলে আসেন এবং রিকশা চালিয়ে আয় রোজগার করতেন, অসহায় হাবিবের পরিবারে পাঁচ সদস্যের মধ্যে স্ত্রী আয়েশা বেগম গৃহিনী, বড় মেয়ে ফাতেমা (১৯) বর্তমানে রাজধানীর কমলাপুর শেরেবাংলা রেলওয়ে কলেজে থেকে এ বছর এইচএসসি পরীক্ষা দিচ্ছেন, এবং মোঃ জিহাদ (১৬) একটি কারখানায় কাজ করেন, হাবিবা (৬) ও বিবি হুমায়ারা নামের দেড় বছর বয়সী মেয়েকে নিয়ে মোটামুটি সুখেই কাটিয়ে ছিলেন সংসার। তিনি যতই পরিশ্রম করতেন স্ত্রী ও সন্তানদের বুঝতে দিতেন না। তার উদ্দেশ্য ছিল ছেলেমেয়েদের উপযুক্ত মানুষ করে গড়ে তোলা । কিন্তু সব শেষ হয়ে যায় গত ২০ জুলাই শনিবার।
হাবিবের স্ত্রী আয়েশা বেগম জানান, ‘দীর্ঘ এক মাস অসুস্থ থাকার পর বাসায় খাওয়ার মতো কোনো খাদ্য এবং চলার মতো কোনো টাকা পয়সা না থাকায় (স্ত্রীর) আমার অনুরোধে ২০ জুলাই শনিবার সকাল বেলায় গাড়ি চালাতে (সিএনজি) বাসা থেকে বের হন। সেদিন রাস্তা যে উত্তপ্ত ছিল তা হাবিব মিয়ার জানা থাকলেও পেটের দায়ে ও জীবিকার তাগিদে গাড়ি চালাতে বের হলেন। কিন্তু ওই দিন বিকেলে স্ত্রীর মোবাইলে কল আসে আপনার স্বামী যাত্রাবাড়ি এলাকায় বুকে গুলিবিদ্ধ হয়ে রাস্তায় পড়ে আছে। এ খবর শুনে মূহুর্তে যেন আকাশ ভেঙ্গে মাথায় চাঁপা দিয়েছে, সেখানে ছুটে গিয়ে লাশ না দেখে ঢাকা মেডিকেল হাসপাতালে আমার মেয়ে সহ যাই, সেখানে গিয়ে আমার মেয়ে ও আমি অনেক খোঁজাখুঁজির পর লাশ ফ্লোরে পড়ে থাকতে দেখি, আমাদের কে তখন লাশ দেয়নি আনতে । স্ত্রী আয়েশা বলেন আমরা গরীব ও নিরীহ খেটে খাওয়া মানুষ আমার স্বামীর তো কোন দোষ নেই কি কারনে পুলিশ আমার পরিবারের আয় রোজগার ও উপার্জনের একমাত্র বাহক মানুষটাকে বুকে গুলি করে বুক ঝাঁঝরা করে দিল। আমার স্বামীর লাশটা দুইদিন পর রাতে ঢাকা মেডিকেলের মর্গে পড়ে আছে শুনে সারিসারি লাশের স্তুপ থেকে বেঁচে বের করি আমার স্বামীকে । লাশের বিকৃত অবস্থায় নরম হয়ে যাওয়ায় আনতে পারিনি পরদিন জুরাইন কবরস্থানে দাফন করি। এখন আমার চার সন্তানের ভরনপোষণ ও পড়ালেখা কে করাবে আমি দুই চোখে এখন শুধু ধোঁয়া দেখছি।
হাবিবের বড় মেয়ে কলেজছাত্রী ফাতেমা বেগম বলেন, ‘ওরা আমাদেরকে এতিম করে কেন আমার অসহায় বাবাকে গুলি করে মেরে ফেললো। আমাদের এখন কী উপায় হবে।
একমাত্র ছেলে মো: জিহাদ (১৬) ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলে, ‘আমার বাবারতো কোনো দোষ নেই, তিনি কোনো রাজনীতির সাথেও কখনো জড়িত ছিলেন না। রিকশা চালিয়ে আমাদের সংসার চালাতেন। আমার বাবার ধ্যান-জ্ঞান সবই ছিল আমাদের মা, তিন বোন ও এক ভাইকে ঘিরে। কিন্তু খেটে খাওয়া আমার এই বাবাটাকেই কেন গুলিতে নিহত হতে হলো?’
জিহাদ আরো জানায়, ‘বাবাকে হারিয়ে আমরা এখন চোখে অন্ধকার দেখছি। আমার বড় বোনটি আইএ পরীক্ষা দিতেছে পাঁচ বিষয় পরীক্ষা শেষ হয়েছে। বাবা তার স্বপ্ন পূরণ করতে পারেননি। আমার আরো ছোট দুই বোন রয়েছে। আমি সামান্য আয় করি যাহা আমার পড়ালেখার খরচ হয় না। আমাদের কথা চিন্তা করে আমার মায়ের এখন রাতে ঘুম হয় না।
উল্লেখ্য, গত ৩ আগস্ট দৈনিক নয়া দিগন্ত দেড় বছরের মেয়েসহ ৪ সন্তানের ভবিষ্যৎ কেড়ে নিলেন বুলেট সহযোগিতা কামনা শিরোনামে সংবাদটি প্রকাশিত হয়। সংবাটি প্রকাশিত হওয়ার পর লালমোহন-তজুমদ্দীন আসনের সাবেক ছয় বারের সংসদ সদস্য ও মন্ত্রী মেজর (অবঃ) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীরবিক্রম এর নজরে এলে তিনি আজ বৃহস্পতিবার সকালে লালমোহনে নিজ বাসভবনে নিহত হাবিব উল্যাহর স্ত্রী আয়েশা বেগমের হাতে আর্থিক অনুদান তুলে দেন।
এ সময় উপজেলার বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের বিভিন্ন স্তরের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।





